একেএম শামছুল হক রেনু    |    
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
হাসপাতালে অমানবিকতা ও দুর্ভোগের দৃশ্য আর দেখতে চাই না

কেবল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নয়, দেশের যে কোনো হাসপাতালে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা অত্যন্ত মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিবসহ অনেকেই দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করতে গিয়ে স্বচক্ষে অব্যবস্থাপনা, দোষত্র“টি দেখে তা নিয়ে কথা বলেছেন, বিভিন্ন পরামর্শ ও উপেদেশ দিয়েছেন। দুঃখজনক হল, ৪৪ বছরেও এসব সমস্যার সমাধান না হয়ে সমস্যা, অনিয়ম ও অব্যস্থাপনা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের যে দুর্ভোগ-দুর্দশা পোহাতে হয়, তা এক কথায় ভয়াবহ। বিষাদের এ যাতনা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কারও পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

ক্রমশ দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন নতুন রোগের আবির্ভাব ও রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিপরীতে হাসপাতালের সিট সমস্যা প্রকট হয়ে দাঁড়ালেও এর চেয়ে পীড়াদায়ক ডাক্তার ও নার্সদের দুঃখজনক কর্মকাণ্ড ও অমানবিকতা। তাদের আচার-ব্যবহার ও কর্মকাণ্ডের কথা শুনে কেবলই মনে হয়, মানবতা-মানবিকতা এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। অন্যদিকে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোর বার্ন ইউনিট বা পঙ্গুদের চিকিৎসার ব্যাপারে নির্ধারিত কোনো ইউনিট বা তেমন কোনো লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় রোগীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটসহ রাজধানীর স্পেশালাইজড হাসপাতালগুলোর শরণাপন্ন হয়। অগ্নিদগ্ধ রোগী ও নানারকম দুর্ঘটনা ও অন্যান্য কারণে পঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনাকাক্সিক্ষতভাবে বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও পঙ্গু হাসপাতালে রোগীর চাপ এত বেড়েছে, জায়গা সংকুলানই বড় সমস্যা। সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালের বার্ন ইউনিট ও পঙ্গু হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে রোগীদের অবর্ণনীয় দুর্দশা ও দুর্ভোগ চোখে পড়েছে। রোগীদের দুর্দশা, কান্নার সমান্তরালে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার-নার্সদের উদাসীনতা, অবহেলা ও অব্যবস্থাপনা দেখে কোনোমতেই অশ্রু সংবরণ করতে পারছিলাম না। এসব বিষয়ে প্রশ্ন করে ডাক্তার, নার্স ও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যেমন কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হল, প্রকাশ্যে দালালদের উৎপাত ও টাকা লেনদেনের দৃশ্য চোখে পড়েছে, যা কোনোমতেই কাম্য নয়। দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেক রোগী ‘চালান’ আশপাশের প্রাইভেট কোনো ক্লিনিক বা হাসপাতালে। এসব ক্লিনিক ও হাসপাতালের অধিকাংশই অবৈধ। এগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত ডাক্তার ও নার্সরাও ভুয়া- এ ধরনের খবর প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। কাজেই সেখানে যাওয়ার পর স্বল্পশিক্ষিত ও দরিদ্র রোগী এবং তার স্বজনদের দুঃখ-দুর্দশা ও আর্থিক ক্ষতি কী পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তা সহজেই অনুমেয়।

কয়েক মাস আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের বার্ন ইউনিট পরিদর্শন করতে গিয়ে অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। তিনি পঙ্গু হাসপাতাল পরিদর্শন করতে না গেলেও বার্ন ইউনিটের রোগীদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ডাক্তার ও কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়ে এসেছেন। দুটি হাসপাতালে রোগীদের অবস্থা দেখে মনে হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরেও অবস্থার তেমন অগ্রগতি হয়নি। মনে হয়েছে, যাদের রাশি রাশি টাকা আছে, যেন একমাত্র তাদেরই চিকিৎসা আছে। যাদের টাকা নেই, তাদের চিকিৎসা ও সেবা প্রদানের ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি নেই।

জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে আশার প্রদীপ হয়ে মানুষের মনে যে প্রতিষ্ঠানটির অধিষ্ঠান- তার নাম হাসপাতাল। দেশে সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি অনেক নামিদামি বেসরকারি হাসপাতালও গড়ে উঠেছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামসহ দক্ষ ও প্রথিতযশা চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাসেবা প্রদানের কথা শোনা যায়। এসব হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা আধুনিক হলেও তা যথেষ্ট ব্যয়বহুল। এ ব্যয়ভার বহন করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। সমাজের মুষ্টিমেয় কিছু লোক, যাদের অর্থ-বিত্ত ও প্রাচুর্যের কমতি নেই- সাধারণত তারাই এসব হাসপাতালের শরণাপন্ন হয়। বিত্তশালীদের মধ্যে কেউ কেউ উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরেও পাড়ি জমায়। সে ভিন্ন কথা। মোটের ওপর এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মধ্যবিত্ত, নিুমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের অসুখে-বিসুখে দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোই ভরসা। এসব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে তাই প্রতিদিন অসংখ্য রোগীর আগাগোনা লক্ষ্য করা যায়। দেশের রোগাক্রান্ত মানুষ রোগমুক্তির আশায় হাসপাতালগুলোয় ছুটে আসে- এ কথা বলাইবাহুল্য। মানুষের এ প্রত্যাশার বিপরীতে হাসপাতালের প্রতিটি ব্যবস্থা ও পদ্ধতি পূর্ণাঙ্গ বা কার্যকর থাকাটা সমীচীন।

রোগকাতর মানুষের মনে আশা জাগানিয়া হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসক-নার্সসহ অন্যদের আচার-ব্যবহার ও সেবা প্রদানে আন্তরিকতার অভাব যেমন থাকবে না, তেমনি সেখানকার চিকিৎসা-সহায়ক উপকরণ ও সাজ-সরঞ্জামগুলোর কার্যকারিতাও নিখুঁত ও প্রশ্নহীন হওয়া উচিত। কিন্তু এ ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট উদাসীন। এর ফলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ও দুর্ভোগের মুখোমুখি হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উদাসীনতা পরিহার করে রোগীদের দুর্ভোগ লাঘবে অন্তরিক ও সচেষ্ট হবেন- এটাই প্রত্যাশা।

কলাম লেখক


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত