প্রীতি রাহা    |    
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
পুলিশ কেন এমন হয়!

সেবাই পুলিশের ধর্ম- এই মূলমন্ত্র সামনে পুলিশ সপ্তাহ শুরু হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের মানুষের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব হচ্ছে পুলিশের। দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে পুলিশের সংখ্যা কম। বিভিন্ন মহল থেকে পুলিশ সদস্য বাড়ানোর কথা মাঝেমধ্যেই উঠে আসে। নিয়মানুসারে পুলিশ জনগণের বন্ধু হিসেবে পরিচিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। পুলিশকে বন্ধু ভাবা তো দূরে থাক, তাদের কাছাকাছি যেতেও দেশের মানুষ ইচ্ছুক নয়। এর পেছনে অবশ্যই কারণ রয়েছে।

কারণটা হল, কিছু কিছু পুলিশ সদস্যের বিপথগামিতা। কিছু পুলিশ সদস্য বিভিন্ন ধরনের অপরাধকর্মে নিজেদের জড়িয়ে ফেলছেন। মামলা তদন্তে ঘুষ নেয়া, গ্রেফতার বা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করার পাশাপাশি ছিনতাই-ডাকাতি, মাদক কেনাবেচা এবং ধর্ষণসহ বড় ধরনের অপরাধে পুলিশের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠছে। এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়া বন্ধ করতে পুলিশ প্রশাসন থেকে নানা পদক্ষেপ নেয়ার পরও তা খুব একটা কাজে আসছে না। একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যানুসারে, গত বছরের ২০ জুন ফেনীর লালপুর এলাকা থেকে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) একজন এএসআইকে ৬ লাখ ৮০ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব। ওই ইয়াবার মধ্যে কক্সবাজার পুলিশের জব্দ করা ১৩ পিস ইয়াবাও ছিল। অভিযুক্তকে আটকের পর র‌্যাব সদস্যরা জানতে পারেন, আরও ১০ পুলিশ সদস্য ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। পত্রিকাটিতে একজন অপরাধ বিশেষজ্ঞের মতামতও প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি বলেছেন, ‘পুলিশ আগে ঘুষ খেত, এখন ইয়াবা ব্যবসা করছে। দেখা যাচ্ছে, এখন শুধু ক্ষেত্র বদল হয়েছে, অপরাধে বৈচিত্র্য এসেছে।’ তার মতে, পুলিশে পরিবর্তন আনতে হলে সংস্কার প্রয়োজন।

পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, পুলিশের ডিসিপ্লিন অ্যান্ড প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড (ডিএপিএস) শাখা থেকে তারা জেনেছেন, বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৫ (জানুয়ারি থেকে জুন) এই সাড়ে তিন বছরে ৩১২ জন পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা এবং বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে। চাকরিচ্যুতি ছাড়া অন্য দণ্ডও প্রদান করা হচ্ছে। এর মধ্যে গুরুদণ্ড হল পদাবনতি, বার্ষিক প্রণোদনা (ইনক্রিমেন্ট) বাতিল ও বার্ষিক প্রতিবেদনে কালো দাগ। আর লঘুদণ্ড হল, কিছু সময়ের জন্য আটক রাখা, দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা, অতিরিক্ত প্যারেড করানো এবং তিরস্কার ও সতর্ক করা।

উল্লেখ্য, দেশের অন্যান্য স্থানের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর পুলিশের বিরুদ্ধেও ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং আটক করে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। বেশির ভাগ অভিযোগ এএসআই, এসআই ও পরিদর্শক পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। গত ৯ জানুয়ারি রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে মোহাম্মদপুর থানার একটি টহল দল। এ সময় তল্লাশির নামে গোলাম রাব্বীকে ৫ ঘণ্টা আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন করা হয়। এছাড়া দাবিকৃত ৫ লাখ টাকা না দিলে তাকে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকিও দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেন গোলাম রাব্বী। পরে অবশ্য ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীকে নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত মোহাম্মদপুর থানার এসআই মাসুদ শিকদারকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ে তদন্ত সম্পন্ন করে সুষ্ঠুভাবে এ অপরাধের বিচার সম্পন্ন হবে- এটাই প্রত্যাশা।

পুলিশের অপরাধ ও পাশবিকতার জ্বলন্ত উদাহরণ দিনাজপুরের কিশোরী ইয়াসমিন। ১৯৯৫ সালের ঘটনা। ১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্ট ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওগামী একটি নৈশকোচে ওঠে কিশোরী ইয়াসমিন। গন্তব্য দিনাজপুর, নিজের বাড়ি। বাসটি তাকে দিনাজপুরের দশমাইল এলাকায় নামিয়ে দেয়। ইয়াসমিন যখন সেখানে নামে, তখন ঘড়িতে রাত সাড়ে ৩টা বাজে। যাত্রাপথের সংযোগস্থল হওয়ায় এখানকার কিছু দোকান সারারাত খোলা থাকে। গাড়ির সুপারভাইজার একজন চা দোকানদারকে অনুরোধ করেন ইয়াসমিনকে দিনাজপুরের কোনো বাসে তুলে দেয়ার জন্য। কিছুক্ষণ পর সেখানে কোতোয়ালি পুলিশের একটি টহল দল আসে। তারা কিশোরীকে দিনাজপুর শহরের রামনগরে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের পিকআপে তুলে নেয়। এরপর ওই পুলিশরা ইয়াসমিনকে দশমাইলের আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে পুলিশ সদস্যদের দ্বারা কিশোরী ইয়াসমিন গণধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষণ শেষে তাকে হত্যা করে পাষণ্ডরা। পরে রংপুর বিশেষ আদালত ইয়াসমিন হত্যা মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ শেষে দোষী প্রমাণিত ৩ পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। এ রায় ঘোষণা করা হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসি কার্যকর হয় ২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও আসকের নিজস্ব সূত্রের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ২০১৫ সালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে মারা গেছেন ১৯২ জন। এর মধ্যে ক্রসফায়ারে মারা গেছেন ১৪৬ জন। এছাড়া বিভিন্ন বাহিনীর পরিচয়ে ৫৫ জনকে আটক করা হলেও কেউ তা স্বীকার করেননি।

বোঝাই যাচ্ছে, পুলিশ সদস্যদের বিপথগামিতা এবং আইনবহির্ভূত কার্যক্রমে তাদের সংশ্লিষ্টতা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। পুলিশ সদস্যদের অপরাধের বিচার পক্ষপাতবিহীনভাবে করা প্রয়োজন। অপরাধীর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা প্রয়োজন। তাদের বোঝানো উচিত, মূলত জনগণের জন্যই তারা। জনগণের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলে তাদের অবশ্যই জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে। বিপথগামী পুলিশ সদস্যদের আরও মনে করিয়ে দেয়া প্রয়োজন, অবশ্যই তারা আইনের ঊর্ধ্বে নন।

[email protected]




 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত