এস এম মুকুল    |    
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
পোলট্রি শিল্পের বিকাশে পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি
পোলট্রি শিল্প বাংলাদেশে দ্রুত বিকাশমান ও বহুমুখী সম্ভাবনাময় একটি শিল্প খাত। দেশীয় পুঁজি ও দেশীয় উদ্যোগে তিলে তিলে গড়ে ওঠা একটি নতুন শিল্প ইতিহাস। শিল্পটি একইসঙ্গে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি করছে। বিশেষত গ্রামীণ মানুষের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। এ শিল্প মাংস ও ডিম উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের বিপুল বর্ধিষ্ণু জনশক্তির পুষ্টি চাহিদা যেমন পূরণ করছে, তেমনি এর কল্যাণে গড়ে উঠেছে সহযোগী অনেক শিল্প-কারখানা। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে এ শিল্পের অবদান অসামান্য। বলা হয়ে থাকে, গার্মেন্টসের পর এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত। এ খাতে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত।
পোলট্রি শিল্প বড় হচ্ছে নীরবে-নিভৃতেই। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট মাংসের চাহিদার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশই এ শিল্প থেকে আসছে। বর্তমান বাজারে যে পরিমাণ ডিম, মুরগি, বাচ্চা ও ফিডের প্রয়োজন, তার শতভাগ এখন দেশীয়ভাবেই উৎপাদিত হচ্ছে। দেশে বর্তমানে মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। প্রতিদিন ডিম উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় দুই থেকে সোয়া দুই কোটি। একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চার সাপ্তাহিক উৎপাদন প্রায় এক কোটি। ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, পোলট্রি ফিডের বার্ষিক উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ফিড মিলে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ২৫ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টন এবং স্থানীয় উৎপাদন প্রায় ১ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টন। এছাড়া মুরগির বিষ্ঠা দিয়ে তৈরি হচ্ছে বায়োগ্যাস ও জৈব সার।
বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার ছোট-বড় পোলট্রি খামার রয়েছে। এছাড়াও আছে ব্রিডার ফার্ম, হ্যাচারি, মুরগির খাবার তৈরির কারখানা। পোলট্রি শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে লিংকেজ শিল্প, কাঁচামাল ও ওষুধ প্রস্তুতকারক এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। জাতীয় অর্থনীতিতে পোলট্রি শিল্পের অবদান প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ। তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, জাপানের মানুষ বছরে ডিম খায় গড়ে প্রায় ৬০০টি। বাংলাদেশের মানুষ খায় মাত্র ৪৫ থেকে ৫০টি ডিম। আমরা জানি, উন্নত দেশগুলোয় বছরে ডিম গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ৩৬০টি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, সুস্থ থাকার জন্য বছরে অন্তত ১০৪টি ডিম খাওয়া দরকার। মাংস খাওয়া উচিত ন্যূনতম ১৮ থেকে ২০ কেজি। দেশের মানুষ মুরগির মাংস খায় বছরে গড়ে মাত্র তিন দশমিক ৬৫ কেজি। অথচ আমেরিকায় মানুষ খায় বছরে গড়ে প্রায় ৫০ কেজি। সরকার ২০২১ সাল নাগাদ জনপ্রতি বার্ষিক ডিম খাওয়ার গড় পরিমাণ ১০৪টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে। প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে সরকারের এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে ২০২১ সাল নাগাদ দৈনিক প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ডিম এবং দৈনিক প্রায় ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টন মুরগির মাংস উৎপাদনের প্রয়োজন হবে এবং এজন্য বিনিয়োগ দরকার প্রায় ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকা।
পোলট্রি শিল্পের বিকাশ ও সফলতার পেছনের গল্পটি কষ্ট, সাধনা আর অসীম ত্যাগের। ২০০৭, ২০০৯ এবং ২০১১ সালে বার্ড-ফ্লু’র ভয়াবহ সংক্রমণে এ শিল্পের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রায় ৫০ শতাংশ খামার বন্ধ হওয়ার পরও এর অগ্রগতি থেমে থাকেনি। বস্তুত বেসরকারি পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের উদ্যোক্তাদের অক্লান্ত শ্রমে এসেছে সাফল্য, ঘটেছে নীরব বিপ্লব। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, বিপর্যয়, বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান, কঠোর পরিশ্রম, বিনিয়োগে উচ্চঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা পোলট্রি শিল্পের সফলতার অন্যতম কারণ। চাকরির বাজারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে দেশের যুবসমাজ স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও সীমিত পুঁজি নিয়ে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন এ শিল্প। বাংলাদেশ পোলট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের তথ্য মতে, ডিম ও মুরগির মাংস রফতানি করে বছরে অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্তরা। আশার খবর হল, দেশ এখন মুরগির ডিম ও মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে এখন বিদেশে রফতানির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
২০২১ সাল নাগাদ দেশে প্রতিদিন সাড়ে ৪ কোটি ডিম ও প্রায় ৪ হাজার টন মুরগির মাংসের প্রয়োজন হবে। চাহিদা পূরণে এ খাতে কমপক্ষে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে সিঙ্গেল ডিজিটে ব্যাংক ঋণের সুদ, বীমার আওতায় পোলট্রি খাতকে নিয়ে আসা ও সরকারি সহায়তা দেয়ার সুপারিশ করেছে খাত সংশ্লিষ্টরা। উদ্যোক্তাদের মতে, খামারিদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, বীমা প্রথা চালু ও পোলট্রি নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হলে ডিম ও মাংস রফতানি করে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। পোলট্রি শিল্পের উন্নয়ন সম্ভব হলে ২০২১ সালের মধ্যে প্রতিবছর দেশে ১ হাজার ২০০ কোটি ডিম ও ১০০ কোটিরও বেশি ব্রয়লার উৎপাদন করা সম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই সেক্টরে কর্মসংস্থান হবে অন্তত ১ কোটি মানুষের।
[email protected]



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত