ড. মুহ. আমিনুল ইসলাম আকন্দ    |    
প্রকাশ : ২৬ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
অর্থ পাচার রোধে সবার আগে প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা
সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশীদের আমানত বৃদ্ধির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর পুঁজি পাচার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় তিনগুণ হয়েছে। এ ব্যাপারে অবশ্য অর্থমন্ত্রীর তরফ থেকে ‘তেমন কিছু নয়’ বক্তব্য এসেছে। সুইস ব্যাংকগুলো বস্তুত কালো টাকার আধার হিসেবে পরিচিত। ব্যাংকগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই যে কোনো উৎসের অর্থ ‘কোডযুক্ত হিসাব নম্বরে’ জমা রেখে গ্রাহকের ব্যাপারে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে চলেছে। দেশে কোটিপতির সংখ্যা এখন আর গুটিকয়েক নয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে কালো অর্থনীতির বিস্তৃতি দেশজ উৎপাদনের ৮২ শতাংশ পর্যন্ত (দশ লাখ কোটি টাকার অধিক) হতে পারে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় সব বাজেটেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েও মূলধারায় সম্পৃক্ত করা যায়নি। বরং সুযোগ পেয়ে কালো অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে, সেইসঙ্গে পুঁজি পাচার বেড়েছে।
গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি’র তথ্যমতে, বৈশ্বিক অর্থ পাচারে বাংলাদেশ ২৬তম অবস্থানে রয়েছে। আমদানি পণ্যের অতিমূল্য ও রফতানি পণ্যের কম মূল্য দেখানোর মাধ্যমে ২০০৪ সালে বিদেশে পাচার হয়েছিল ৩৩৫ কোটি ডলার, ২০১৩ সালে যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৩৬ কোটি ডলারে। এর সঙ্গে অলিপিবদ্ধ লেনদেনজনিত ১৩১ কোটি ডলার পাচার যোগ হয়ে দেশীয় মুদ্রায় তা ৭৫ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। আরও আছে ব্যাগ-স্যুটকেস ভরে পাচার। পাশাপাশি মানুষের আয় ও সামর্থ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, চিকিৎসা ও ভ্রমণের জন্য বিদেশে অর্থ খরচের প্রবণতাও বাড়ছে। তবে বৈধপথে বৈদেশিক মুদ্রা নেয়ার আইনি ও পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে অবৈধ চ্যানেলের ব্যবহার বেড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে, গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড এবং ব্যাংকের মাধ্যমে পুঁজি পাচার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তাতে কী? সরকার প্রবাসীদের পাঠানো বিশাল অংকের রেমিটেন্স পেয়ে চাপমুক্ত রয়েছেন। তবে গত দু’বছর রেমিটেন্স প্রবাহে ভাটা যেন একটা সতর্ক সংকেত দিচ্ছে।
শুরুটা পুঁজিপতি ব্যবসায়ীদের দিয়ে হলেও পরে রাজনীতিক ও পেশাজীবীরা অবৈধভাবে বিদেশে অর্থ নিয়ে গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, আশির দশকে বেসরকারিকরণকৃত শিল্পকারখানার মালিকরা স্বল্পসুদে যে ঋণ পেয়েছিলেন, পরে অনেকে ‘রুগ্ন শিল্প’ দেখিয়ে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করে বিদেশে অর্থ পাচার করেছিলেন। ইতিমধ্যে অনেক পুঁজিপতি রাজনীতিতে নেমে ব্যবসাবান্ধব সরকারি নীতি করেছেন। অনেকে বেসরকারি ব্যাংকের মালিকও হয়েছেন। অথচ ব্যাংক আমানতের ৭০ ভাগ গ্রহণকারী বেসরকারি ব্যাংকগুলো পর্যন্ত আমানত রক্ষা করতে পারছে না। ঋণদান, সুদ মওকুফ, এমনকি ঋণ মওকুফের অনিয়ম নিয়ে অবিরত সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। হলমার্কসহ বড় বড় ঋণ জালিয়াতির বিচার না হওয়ায় ঋণ খেলাপি সংস্কৃতি কি সংক্রমিত হচ্ছে না? এরই মধ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় পরিবারতন্ত্র তৈরির সুযোগ যথেচ্ছ ঋণ জালিয়াতির সুযোগ দেবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন সত্যি করতে হলে অবৈধ উপার্জন ও পাচারের প্রক্রিয়া রোধ করে দেশের পুঁজিপতিদের বিনিয়োগ প্রতিযোগিতায় নামাতে হবে। এজন্য কাগুজে বিনিয়োগবান্ধব নীতি নয়, বরং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও বিনিয়োগ নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সুদহার কমানোর মুদ্রানীতি বাংলাদেশে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। পুঁজি পাচার রোধে সরকারি প্রচেষ্টার ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই- সরকারের সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া পুঁজি পাচার, কালো টাকার দৌরাত্ম্য ও বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা দূর করা যাবে না।
সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]




আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত