মনির হোসেন    |    
প্রকাশ : ২১ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
কোরবানিতে চাঙ্গা হচ্ছে অর্থনীতি
শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই প্রস্তুতি

কোরবানিকে ঘিরে চাঙ্গা হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই কোরবানির প্রস্তুতি চলছে। চাহিদা মেটাতে কোরবানি সংশ্লিষ্ট পণ্য খাতগুলো এখন ব্যস্ত। রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকা, অর্থনৈতিক প্রবাহ বৃদ্ধি এবং কোরবানির চাহিদা বাড়ায় গতবারের চেয়ে এবার বিক্রি বাড়বে। পশুর সরবরাহ ও মজুদ ভালো থাকায় দাম গতবারের চেয়ে স্থিতিশীল হবে বলে খামারিরা জানান। এ ছাড়া কড়াকড়ি সত্ত্বেও ভারত ও মিয়ানমার থেকে গরু আসছে। এ জন্য গরুর প্রত্যাশিত বিক্রি নিয়ে আশান্বিত ব্যবসায়ীরা। সব মিলিয়ে সর্বত্রই এখন কোরবানিকে ঘিরেই চলছে অর্থনীতির নড়াচড়া।। যা গ্রামমুখী অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এ ছাড়া মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতাদের অধিকাংশই এবার নিজ নিজ এলাকায় কোরবানি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একজন নেতা ভোটারদের খুশি করতে একাধিক কোরবানি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। ফলে ঢাকার বাইরে গরু কেনাবেচা নিয়েও অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে।

ঈদ মৌসুমে গ্রামগুলোতে অর্থ প্রবাহ অনেক বেড়ে যাওয়ায় গ্রামেগঞ্জে নিত্যপণ্যের দামও বৃদ্ধি পায়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীতে নিয়মিত বসবাস করছেন এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। এদের মধ্যে প্রায় ৮০ লাখ মানুষই রাজধানী ছেড়ে গ্রামে ঈদ উদযাপন করতে ছুটে যান। এতে গ্রামে অর্থ সরবরাহ অনেক বেড়ে যায়।

কোরবানি ঘিরে গ্রামের হাটগুলোতে গরু তোলার এক ধরনের প্রস্তুতি চলছে। শহরের চেয়ে বেশি গরু বিক্রি হবে গ্রামে। ফলে ঈদে গ্রামীণ অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গরু বেচাকেনা। অনেক খামারি এ উপলক্ষে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন গরুর পেছনে। কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন হাই অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে প্রতি বছর প্রায় দেড় থেকে দু’হাজার কোটি টাকার কোরাবানির পশুর বাণিজ্য হয়। যার সিংহভাগ রয়েছে মফস্বল ঘিরে। আর এসব পশুর চামড়া সংগ্রহ করতে গ্রামে গ্রামে আগাম বিনিয়োগ করছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।

এ ছাড়া চামড়া, মশলা, দা, বঁটি, পরিবহন, পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বাড়ছে টাকা প্রবাহও। ইতিমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে রেমিট্যান্স (প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ)। চলতি সপ্তাহে বোনাস পাবেন সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন ব্যাংকের চাকরিজীবীরা। সবকিছু মিলে দেশের অর্থনীতিতে কোরবানির আমেজ শুরু হয়েছে। তবে এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। বাজারে বাড়তি টাকার প্রবাহের কারণে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে যাবে। শহর থেকে টাকা যাচ্ছে গ্রামে।

আগামী ১২ বা ১৩ সেপ্টেম্বর দেশে কোরবানির ঈদ উদযাপিত হতে পারে। এ হিসাবে কোরবানির বাকি মাত্র তিন সপ্তাহ। কোরবানিতে পশু জবাইকে কেন্দ্র করেই উদযাপিত হয় মূল উৎসব। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বর্তমানে দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা চার কোটি ৯০ লাখ। এর মধ্যে গরু ও মহিষ দুই কোটি ৩৫ লাখ এবং ছাগল ও ভেড়া দুই কোটি ৫৫ লাখ। এ বছর কোরবানির উপযোগী এক কোটি ৫ লাখ পশু রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩ লাখ গরু ও মহিষ এবং ৭২ লাখ ছাগল ও ভেড়া। গত বছর কোরবানি হয়েছিল ৯৬ লাখ ৩৫ হাজার পশু। অর্থাৎ মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে কোনো কারণে ভারত থেকে গরু আমদানি না হলেও এ বছর পশুর সংকট হবে না।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দুই ঈদেই বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যায়। শহর থেকে গ্রামমুখী হয় টাকা। অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক দিক হল, বণ্টন ব্যবস্থায় একটি পরিবর্তন হয়। এতে অধিকাংশ মানুষের কাছেই টাকা পৌঁছে যায়। আর নেতিবাচক দিক হল মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়।

জানা গেছে কোরবানিতে ব্যবহার হয় এমন পণ্যের মজুদও পর্যাপ্ত। প্রতি বছর দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ মেট্রিক টন। রসুনের চাহিদা ৫ লাখ মেট্রিক টন, আদা ৩ লাখ টন। এর উল্লেখযোগ্য অংশই কোরবানিতে ব্যবহার হয়। অন্যদিকে গরম মশলা বিশেষ করে এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা, তেজপাতার উল্লেখযোগ্য অংশ কোরবানিতে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে ২০১৪-১৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন এলাচ, ৭ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন দারুচিনি, ১৭০ মেট্রিক টন লবঙ্গ এবং ৩৭০ মেট্রিক টন জিরা আমদানি করা হয়েছে। কোরবানির বাজারে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হবে এসব পণ্যের। কোরবানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হল কামার আইটেম। ছুরি, বঁটি, দা, চাপাতি, কুড়াল, রামদা ছাড়া কোরবানিই সম্ভব নয়। সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোরবানিতে পণ্যটির বাজার এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

অন্যদিকে বাজারে বাড়ছে টাকার প্রবাহ। ঈদকে সামনে রেখে গত বছর প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিল ১১৯ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা ৯ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, এ বছর রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা বাড়ছে। ফলে এ বছর রেমিট্যান্স আরও বাড়বে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের এক সমীক্ষায় বলা হয়, ঈদে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত যাচ্ছে ৬০০ কোটি টাকা। এ উৎসবে ভ্রমণ ও বিনোদন বাবদ ব্যয় হয় ৪ হাজার কোটি টাকা। এসব খাতে নিয়মিত প্রবাহের বাইরে অতিরিক্ত যোগ হচ্ছে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।

এর বাইরে আরও কয়েকটি খাতের কর্মকাণ্ড অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সাড়ে ২০ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সম্ভাব্য বোনাস বাবদ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা, দেশব্যাপী ৬০ লাখ দোকান কর্মচারীর বোনাস ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, পোশাক ও বস্ত্র খাতের ৭০ লাখ শ্রমিকের সম্ভাব্য বোনাস ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ঈদ অর্থনীতিতে বাড়তি আসছে।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত