মিজান চৌধুরী    |    
প্রকাশ : ২৩ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বিদেশে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ
পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই হচ্ছে নীতিমালা
একজন উদ্যোক্তা বিদেশে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার বা ২৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে পারবেন

পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই প্রণয়ন হচ্ছে বিদেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ নীতিমালা। দেশে বর্তমানে সব ধরনের বিনিয়োগে মন্থর গতি। যে কারণে কর্মসংস্থানও আশানুরূপ সৃষ্টি হচ্ছে না। কিন্তু সে পরিবেশ উন্নয়ন না করে এবার বিদেশে বিনিয়োগের পথ খুলে দেয়া হচ্ছে। এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি এ নিয়ে একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে সরকারের উচ্চপর্যায়ে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়নের আগে ভবিষ্যতের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। তা না হলে শেষ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভের ওপর বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে।

বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রানীতি আইন-১৯৪৭ অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে বিদেশে বিনিয়োগ করা কার্যত নিষিদ্ধ। যে কারণে বৈধভাবে কোনো উদ্যোক্তা বিদেশের মাটিতে বিনিয়োগ করতে দেশ থেকে অর্থ নিতে পারবেন না। তবে কোনো ব্যবসায়ী বিশেষ প্রয়োজনে বিদেশে বিনিয়োগ করতে চাইলে তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ওই আবেদন অনুমোদন করলে তখন তিনি বিনিয়োগ করতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নীতিমালার আওতায় বছরে একজন উদ্যোক্তা (রফতানিকারক) বিদেশে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার বা ২৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে পারবেন। বিদেশের মাটিতে সংশ্লিষ্ট রফতানিকারক বা উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, ওয়ারহাউজ খোলা, প্রচার এসব কাজে ওই টাকা ব্যয় করা যাবে।

কিন্তু ওয়াশিংটনভিত্তিক অর্থপাচারবিরোধী সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানসিয়াল ইনটিগ্রিটি (জিএফআই) গত ১ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শুধু ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে আরও প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। আর ২৯ জুন সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ পাঁচ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছরই বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার বাড়ছে। এসব অর্থ পাচার করে বিদেশে বিনিয়োগ করছেন অনেক উদ্যোক্তা। তবে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার মাধ্যমে পাচার কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।

জানা গেছে, বিদেশে বাংলাদেশের বিনিয়োগের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন সংক্রান্ত একটি বৈঠক হয়েছে সম্প্রতি। নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ কমিটির সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সচিব অজিত কুমার পালের সভাপতিত্বে বৈঠকটি হয়। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ওই নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ করতে আলোচনার জন্য আরও তিন মাস সময় বাড়ানোসহ তিনটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বৈঠকে। অন্য সিদ্ধান্তগুলো হচ্ছে- নীতিমালা প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা এবং এর সম্ভাবনা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতার জন্য দেশ ভ্রমণের উদ্যোগ নেয়া।

বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে অজিত কুমার পাল বলেন, ‘নীতিমালা প্রণয়নের আগে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে দূরদৃষ্টি থাকা দরকার। সামনে আমাদের যে সুযোগ ও সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে তা গ্রহণ না করে ভবিষ্যতে যেন কোনো পরিতাপ না করি। এজন্য নীতিমালা প্রণয়নের আগে সব স্টেক হোল্ডাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তার সক্ষমতা আছে কিনা সে বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।’

বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধি বলেছেন, রিজার্ভ থেকে প্রতিবছর দুই বিলিয়ন ডলার নিয়ে পাঁচ বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার বা এক হাজার কোটি ডলারের বাংলাদেশ সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গঠনের প্রস্তাবে সরকার সম্মতি দিয়েছে। এছাড়া দেশব্যাপী ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে পারে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) জিডিপির কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ন্যূনতম স্থানীয় বিনিয়োগ জিডিপির ৩২ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। তাই এ পর্যায়ে স্থানীয় বিনিয়োগে উৎসাহিত না করে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া যথাযথ হবে কিনা- তা সতর্ক বিবেচনার দাবি রাখে।

বিদেশে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ উন্মুক্ত করার পক্ষে মত দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘আমরা একপর্যায়ে এলডিসি থেকে উন্নীত হব। সেক্ষেত্রে আমাদের অর্থনীতিকে বহুমুখী করতে হবে। আফ্রিকায় অনেক কাঁচামাল পাওয়া যাবে। এলডিসিতে না থাকলে জিএসপি কোটা থাকবে না। তখন এলডিসিতে বিনিয়োগ করলে লাভবান হওয়ার সুযোগ হবে। বিদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতা বাড়বে। সেখানে আমাদের শ্রমিকরাও কাজ করছে। তবে বিনিয়োগ করা অর্থ দেশে ফেরত আসছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। শুরুতে অপ্রদর্শিত অর্থকে করের আওতায় এনে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া যায়। তবে শুরুতেই পুরোটা উন্মুক্ত করে দেয়া ঠিক হবে না। আস্তে আস্তে এগোতে হবে।’

সম্প্রতি আকিজ জুটমিলস লিমিটেড মালয়েশিয়ায় রোবিনা রিসোর্সেস (মালয়েশিয়া) এসডিএন বিএইচডি ও রোবিনা ফ্লোরিং এসডিএন বিএইচডি নামের দুটি কোম্পানি অধিগ্রহণ করতে দুই কোটি ডলার (১৬১ কোটি টাকা), হা-মীম গ্রুপ হাইতিতে একটি গার্মেন্ট কারখানা স্থাপনের জন্য এক কোটি চার লাখ ৪০ হাজার ডলার (৮৪ কোটি টাকা) এবং নিটল-নিলয় গ্রুপ গাম্বিয়ায় ‘গাম্বিয়া কমার্স অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল ব্যাংক লিমিটেড’ নামের একটি ব্যাংক স্থাপনে ৭০ লাখ ডলারসহ (৫৬ কোটি টাকা) বিদেশে বিনিয়োগের আবেদন করে। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব আবেদন অনুমোদন করে মতামতের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে এ নিয়ে আলোচনার পর ওই নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত