মিজান চৌধুরী    |    
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
খাদ্য নিরাপত্তা মজুদ নিয়ে বিভ্রান্তি
প্রকৃত মজুদ সীমা হবে ২৭ লাখ ৬০ হাজার টন : এফএও * গত ৫ বছরে ৯ লাখ টনের বেশি মজুদ সম্ভব হয়নি

দেশের খাদ্য নিরাপত্তা মজুদ নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। গত এক যুগ ধরেই সরকারের এ মজুদের সর্বনিন্ম সীমা ১০ থেকে ১২ লাখ মেট্রিক টন বলা হচ্ছে। কিন্তু তার প্রকৃত সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। দেশের জনসংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবছরই খাদ্য চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নির্ধারণ করা হয়নি খাদ্য নিরাপত্তা মজুদের প্রকৃত সীমা। ইতিমধ্যে খাদ্য নিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে একাধিক আইন ও বিধিমালা। কিন্তু কোথাও নিরাপত্তা মজুদের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের কেউ বলছেন, এ মজুদ ১০ লাখ। কেউ বলছেন ৭ লাখ টন।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, যে কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে কমপক্ষে ৬০ দিনের মজুদ থাকা প্রয়োজন। ওই হিসাবে দেশের বর্তমান জনসংখ্যা অনুযায়ী একদিনের খাদ্য চাহিদা হচ্ছে প্রায় ৪৬ হাজার মেট্রিক টন। এ হিসাবে ৬০ দিনের জন্য প্রয়োজন প্রায় ২৭ লাখ ৬০ হাজার টন। অথচ কোনোকালেই দেশের খাদ্য গুদামে ৬০ দিনের মজুদ ছিল না। যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ জনসংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। তাদের ঘর-বাড়ি রাস্তা-ঘাটের চাহিদা পূরণের পর আবাদি জমির পরিমাণও কমবে। ফলে খাদ্যের প্রকৃত নিরাপত্তার সিলিং ও পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। জানা গেছে, স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত খাদ্যের আপতকালীন বা নিরাপত্তা মজুদ সিলিং নির্ধারণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে আপতকালীন মজুদের পরিমাণ ৭ লাখ মেট্রিক টনের কথা বলা হয়। কিন্তু অফিসিয়ালের তথ্য কোথাও রেকর্ড নেই। ফলে এ নিয়ে কাটছে না বিভ্রান্তি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি নীতিমালা ও আইন হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় খাদ্যনীতি ২০১৬, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩, অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা ২০১০ এবং চাল সংগ্রহ ও নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৮ রয়েছে। কিন্তু এ সব আইন ও বিধিমালায় কোথায় দেশের নিরাপদ বা আপতকালীন মজুদের সিলিংয়ের কথা উল্লেখ করা হয়নি। সর্বশেষ ২০১১ সালে দ্য অ্যাসেন্সিয়াল কমিউডিটি অ্যাক্ট প্রণয়ন করা হয়। সেখানে বেসরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের মেয়াদ ও মজুদের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। ব্যক্তি পর্যায়ে এক মেট্রিক টনের বেশি কেউ চাল মজুদ করতে পারবে না বলে সেই আইনে উল্লেখ করা হয়। আর সরকারের লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীরা সর্বোচ্চ ৩০০ মেট্রিক টন চাল এক মাসের জন্য মজুদ করতে পারবেন। কিন্তু সেখানে সরকারিভাবে খাদ্যশস্য মজুদের পরিমাণের কথা বলা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এম কে মুজেরি যুগান্তরকে বলেন, সরকারের খাদ্যের মজুদ সিলিং না থাকায় বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ যে কোনো দুর্যোগ হলে খাদ্য নিয়ে সরকারকে বেকায়দায় পড়তে হবে এটাই স্বাভাবিক। এর বড় প্রমাণ হল সম্প্রতি দেশে একটি আগাম ও মৌসুমী বন্যায় খাদ্যের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার শেষ পর্যন্ত বিদেশ থেকে চাল আমদানি করতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, খাদ্যের আপতকালীন মজুদ নির্ধারণ করা দরকার। এ জন্য খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। আর উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষি খাতে আরও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। সূত্র মতে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সরকারের ‘খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ’ কমিটির বৈঠকে কয়েকটি সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে ভবিষ্যৎ নিরাপদ নিশ্চিত করতে খাদ্যের নিরাপত্তা মজুদের সিলিং ৭ লাখ মেট্রিক টন থেকে বাড়িয়ে ১০ থেকে ১১ লাখ টনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে অনুযায়ী পহেলা নভেম্বর পর্যন্ত সরকারি গুদামে খাদ্য মজুদ ছিল ৫ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৪ লাখ ১১ হাজার টন চাল এবং গম ১ লাখ ২৫ হাজার টন। এ ছাড়া ২০১৬ সালের মার্চের শুরুতে প্রায় ১১ লাখ টন খাদ্য মজুদ ছিল। ২০১৫ সালের মে মাসে মজুদ ছিল প্রায় ৮ লাখ টন। একইভাবে দেখা গেছে ২০১৪ সালের একই সময়ে চালের মজুদ ছিল সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন এবং ২০১৩ সালের মে মাসে মজুদ প্রায় ৭ লাখ টন। এর আগের বছরের একই সময়ে এ মজুদ ছিল প্রায় ১০ লাখ টন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিরাপদ খাদ্য মজুদসীমা নির্ধারণ না হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে সরকার চাপের মুখে পড়ছে। তবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্য নিরাপত্তা বিনিয়োগ ফোরাম একটি রূপরেখা ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু ওই ঘোষণার খুব বেশি বাস্তবায়ন হয়নি। ওই ফোরামের রূপরেখায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা মজুদসীমা নির্ধারণ করতে হবে। এ জন্য খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। ফোরাম হিসাবে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হবে কৃষি খাতে ৬২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা (৭৮০ কোটি মার্কিন ডলার)। এর মধ্যে সরকারের বিনিয়োগ হতে হবে ২২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা (২৮০ কোটি ডলার)। বাকি ৪০ হাজার কোটি টাকা (৫০০ কোটি ডলার) দাতাসংস্থার কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হবে। সেখানে বলা হয়, খাদ্য নিরাপত্তা মজুদের আগে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন কৃষি খাতে বিনিয়োগ। এ ছাড়া উৎপাদন বাড়লে সেখান থেকে খাদ্য নিরাপত্তা সিলিং নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী সংরক্ষণ করা যাবে। এই রূপরেখা ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত খুব বেশি তা কার্যকর হয়নি।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত