শাহ আলম খান    |    
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
মাঠজুড়ে কাঁচা-পাকা ধানের ছড়াছড়ি
বাম্পার ফলন নিয়ে ধোঁয়াশা

কৃষকের গোলায় উঠতে শুরু করেছে বহুল প্রত্যাশিত আমন ধান। গ্রামবাংলার মাঠজুড়ে এখন কাঁচা-পাকা ধানের ছড়াছড়ি। আমন ধানের মৌ মৌ গন্ধ জানান দিচ্ছে নবান্নের। চলতি কার্তিক মাসের মধ্যবর্তী ও নভেম্বরের প্রথম দিন থেকেই পাকা ধান কাটা শুরু করেছে কৃষক। তবে পুরোদমে সোনালি আমন ধান কাটা শুরু হবে আরও কয়েকদিন পর। চলবে মধ্য জানুয়ারি পর্যন্ত। রাজশাহী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, রংপুর, ঝালকাঠি, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় আমন ধানের ভালো ফলন হয়েছে। তবে মৌসুম শেষ না হলে সারা দেশে ফলনের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে না। ফলে এবার আমনের বাম্পার ফলন হচ্ছে- তা এখনই জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। কারণ মৌসুমের শেষ সময়ে ধানের প্রত্যাশিত উৎপাদন নাও হতে পারে। এ সময় চিটা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তা ছাড়া ফলননির্ভর এলাকাগুলোয় এবার নভেম্বরের শেষদিকে ও ডিসেম্বরের প্রথম দিকে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে কৃষকের ঘরে পুরো ধান না ওঠা পর্যন্ত ধোঁয়াশা থেকে যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্র জানায়, ৯ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের মাত্র ৪ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। এটা মোট আমন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৯.৩ শতাংশ। তবে এখন পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে প্রতি হেক্টর জমিতে তিন থেকে সাড়ে তিন টন ধান পাওয়া গেছে। সাধারণত আমন মৌসুমে গড়ে তিন টন ধান পাওয়া গেলে বাম্পার ফলনের বিষয়টি দাবি করা হয়। এ মৌসুম থেকে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এক কোটি ৪০ লাখ টনের। এ পরিমাণ উৎপাদনের জন্য সারা দেশে ৫৪ লাখ হেক্টর জমিতে আমনের (রোপা, বোনা ও বাওয়া) চাষ করা হয়েছে। তবে এবার বৈরী আবহাওয়া ছিল বছরজুড়ে। দেশের ৩২ জেলায় বন্যা হয়েছে। এতে ফসলের ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় আমন রোপণেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পরবর্তী সময়ে আরও ৫ লাখ হেক্টর জমিতে আমনের চাষ করা হয়। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আমন চাষ ও বন্যায় জমিতে পলি পড়ায় উৎপাদনও ভালো হওয়ার কথা।

আমন ফলনের ইতিহাস বলছে, আগামজাতের আমনে উৎপাদন কম হয়। মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে কাটা ধানের উৎপাদন হয় বেশি। চলতি মৌসুমে আমনের সুখবর হল দেশের ৬ জেলায় আগাম জাতের আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলাগুলোতেও হেক্টরপ্রতি গড়ে ৩ টন করে আগাম আমনের উৎপাদন হয়েছে। কোনো কোনো জেলায় সাড়ে ৪ টনের ওপরেও ফলন পাওয়া গেছে। নীলফামারী ও দিনাজপুরে সাড়ে ৪ টনের ওপরে উৎপাদন হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। মানিকগঞ্জ ও কুড়িগ্রামেও আগাম আমন কাটা শুরু হয়। আগাম জাতের ধান হল- টিয়া, ময়না, স্বর্ণা, জাগরণ, ধানীগোল্ড, ইস্পাহানি, এসিআই, এসিআই-১, এসিআই-২, ব্রিধান-৩৩, ব্রিধান-৬২, হীরা-২ ও বিনা ধান-৭ প্রভৃতি। আমনের বাম্পার ফলন হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দিন আবদুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, সবেমাত্র আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। চলবে ডিসেম্বরজুড়ে। তাই মাঠের প্রকৃত উৎপাদন কত হয়েছে কিংবা সেটি বাম্পার ফলনে গড়াচ্ছে কিনা তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে এখন পর্যন্ত প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলন পাওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আমনের প্রকৃত ফলন কেমন হচ্ছে তা জানতে হলে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এদিকে অতিবৃষ্টিতে হাওরে বন্যা ও বাঁধ ধসে ফসল নষ্ট হওয়ায় আমনের অগ্রবর্তী বোরোর ফলন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। ফলে দেশে ধান সংকটের অজুহাতে বাজারে চাল নিয়ে নানা তেলেসমাতি কারবার শুরু হয়। কৃত্রিম মজুদ ও সরবরাহ সংকটের মাধ্যমে দফায় দফায় বাড়ানো হয় চালের দাম। যা স্বাধীনতা পরবর্তীকালে চালের দামে রেকর্ড তৈরি হয়। বাজারে চালের কোনো সংকট নেই। টাকা দিলেই মিলছে চাল। কিন্তু দাম রাখা হচ্ছে বেশি। অজুহাত একটাই ধানের সংকট। সরকার চাল আমদানি উন্মুক্ত এবং শুল্ক ২৬ শতাংশ থেকে ২৮ শতাংশ তুলে নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেও চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসেনি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম কতটা সহনীয় হবে সেটি নির্ভর করছে চলতি মৌসুমে আমনের ফলনের ওপর। ভোক্তারাও রয়েছেন সেই ভরসায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমনের ফলন ভালো হলেই বাজার স্থিতিশীল হবে না। এর পাশাপাশি সরকারকে আমন ধানের সংগ্রহ নীতির বিষয়ে দূরদর্শী সিদ্ধান্তও নিতে হবে। সাধারণত ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সরকারি পর্যায়ে আমন ধান-চাল সংগ্রহ করা হয়। চলতি আমন মৌসুমে চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩৩ টাকা। তবে এবার ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ আরও বেড়েছে। সে অনুযায়ী তারা ধানের মূল্য চাইবে বেশি। ফলে ধানের ফলনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সরকারকে ধান-চালের ক্রয়মূল্য বাড়াতে হবে। এর জন্য নভেম্বরের শেষ দিকে সরকার যে ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করবে তার ওপর বাজারের উঠানামা নির্ভর করবে। অন্যদিকে কৃষকের মূল্য নিশ্চিত করতে সরকার ক্রয়মূল্য বাড়ালে মিলারদের বেশি দামে কিনতে হবে। ফলে তারাও বেশি দামে বিক্রি করতে চাইবে। এতে আমনের ফলন ভোক্তা পর্যায়ে কতটা স্বস্তি দিতে পারবে সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ফেলো ও কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. এম আসাদুজ্জামানের মতে, আগাম জাতের আমন ধানে ভালো ফলন পাওয়া দেশের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত