হামিদ বিশ্বাস    |    
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ
দুই কৃষি ব্যাংকের অবস্থা নাজুক
লোকসান, মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণের উচ্চহারসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক

ঋণ অনিয়ম ও নানা অব্যবস্থাপনায় ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বিশেষায়িত খাতের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। ব্যাংক দুটির লোকসান, মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণের উচ্চহার এবং প্রভিশন ঘাটতি কিছুতে কমছে না। উভয় ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। তাতে প্রায় ১০টি সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। যা উভয় ব্যাংককে বাস্তবায়ন করতে হবে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিদ্ধান্ত হল- উভয় ব্যাংককে নিজস্ব চেষ্টায় মূলধন ঘাটতি পূরণ করতে হবে। কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। ঋণ বিতরণে অনিয়ম করা যাবে না। এ ছাড়া ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। পুরনো খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার এবং নতুন কোনো ঋণ যেন খেলাপি না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। লোকসানি শাখাকে লাভজনক শাখায় উন্নীত করতে কার্যকর উদ্যোগ, নতুন শাখা খোলার ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই এবং অলাভজনক শাখা কমাতে হবে। পাশাপাশি উভয় ব্যাংকের সব ধরনের কার্যক্রম অনলাইনভিত্তিক করার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সূত্র জানায়, বর্তমানে বিকেবির প্রকৃত লোকসান হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। যদিও ব্যাংকটি তথ্য গোপনের মাধ্যমে লোকসান দেখিয়েছে ৫১১ কোটি টাকা। এ ছাড়া মূলধন ঘাটতি ৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ১৮ হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৪ হাজার কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকের আজকের পরিস্থিতির জন্য শুধু দুর্নীতি-ই দায়ী নয়, এর বাইরেও কিছু কারণ রয়েছে। যা ব্যাংকটিকে ধীরে ধীরে লোকসানি করে তুলছে। তাদের মতে, বিকেবির প্রায় ৯০ শতাংশ ঋণ যাচ্ছে কৃষকের কাছে। এখানে পরিচালন খরচ বেশি। সাধারণত এ ধরনের ঋণে কোনো লাভ করা যায় না। তবে ১০ শতাংশ বাণিজ্যিক ঋণে কিছুটা লাভ হয়। যেহেতু লাভের চেয়ে লোকসানি ঋণ বেশি তাই প্রতিবছর লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইসমাইল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। এ টাকা ফেরত পাওয়া অনেক কঠিন। কারণ তাদের পেটে ভাত নেই। ফসল উৎপাদন করবে কোথা থেকে? একইভাবে সিডরসহ প্রাকৃতিক সব দুর্যোগে বিকেবি কৃষকদের পাশে থেকে সাহায্য-সহযোগিতা করে যাচ্ছে। সে কারণে প্রতিবছরই একটু একটু করে লোকসান বাড়ছে। এ ছাড়া পুরনো কিছু ঋণ অনিয়ম রয়েছে। তবে অনিয়ম করা কর্মকর্তাদের কোনো ছাড় দেয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, কৃষি ব্যাংকে অপরাধ করে কারও বাঁচার উপায় নেই। ধারাবাহিকভাবে প্রত্যেককে শাস্তির আওতায় আনা অব্যাহত রয়েছে। ব্যাংকটির আরও কিছু সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষি ব্যাংকে দ্রুত এমডি পরিবর্তন হয়। ব্যাংকের উন্নয়নের জন্য এমডির ধারাবাহিকতা খুবই জরুরি। এ ছাড়া আইনি জটিলতায় ব্যাংকটি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারছে না। এটাও একটা সমস্যা হিসেবে দেখছেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংক সূত্র জানায়, রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য ব্যাংকের মতোই নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে কৃষি ব্যাংক। এ সব অনিয়মের ফলে চলতি বছরের জুন শেষে বিশেষায়িত খাতের এ ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের জুনে যার পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা আর প্রভিশন ঘাটতি ৯৩ কোটি টাকা। ব্যাংকটির নিট লোকসানের পরিমাণ ৯৮১ কোটি টাকা। এ ছাড়া ১ হাজার ৩১ শাখার মধ্যে ১৪৮টি শাখা লোসানে। সূত্র জানায়, কৃষি ব্যাংকের ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট ও ফেনীসহ বেশকিছু জেলার শাখাগুলোতে ঋণ অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। এ সব অনিয়মে প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তা সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি ব্যাংকের একজন মহাব্যবস্থাপক যুগান্তরকে বলেন, কৃষি ব্যাংকে কিছু দুর্নীতি হয়েছে। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে দুর্নীতির বাইরেও লোকসানের অনেক কারণ রয়েছে। তিনি বলেন, কৃষকদের দেয়া বেশি ঋণে লোকসান গুনতে হয়। তবে কিছুটা লাভ হয় বাণিজ্যিক ঋণে।

এ ছাড়া একই পরিস্থিতি রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকেও (রাকাব)। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাকাবের মূলধন ঘাটতি ৭১০ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের দিক থেকে সব চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে রাকাব। কারণ গত জুন পর্যন্ত বিকেবি খেলাপি ঋণ ৫২৫ কোটি টাকা কমাতে পারলেও রাকাবের বেড়েছে। ব্যাংকটির এ সময় খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২২৭ কোটি টাকা। সে কারণে সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক উভয় ব্যাংককে সতর্ক করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত