কবির হোসেন    |    
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
হাইকোর্টের আদেশের পর ২ বছর পার
সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের আদেশ উপেক্ষিত
মন থেকে না এলে এগুলো হবে না -অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
সাইনবোর্ড কিংবা বিলবোর্ড, নেম প্লেট, নম্বর প্লেট, মিডিয়ায় ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষা ব্যবহার বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণে হাইকোর্টের আদেশের পর ২ বছর পার হতে যাচ্ছে। কিন্তু ওই আদেশের দৃশ্যমান কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া বাংলা ভাষা প্রচল আইনও অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। সর্র্বস্তরে আজও বাংলা ভাষার প্রচলন সম্ভব হয়নি। প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাভাষীদের এ দেশে আজও যথেচ্ছভাবে বিদেশী ভাষার ব্যবহার চলছে। চলছে মিশ্র ও ভুলে ভরা ভাষার ব্যবহার।
কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ রয়েছে, যেসব ক্ষেত্রে ইংরেজি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, সে সব ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহারের পাশপাশি ইংরেজি সীমিত আকারে শুধু প্রয়োজনীয়তার লক্ষ্যে ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু এ আদেশ ২ বছর ধরে উপেক্ষিত রয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস যুগান্তরকে বলেন, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন শুধু মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। হাইকোর্টের আদেশের পর এ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো বারবার তাদের পদক্ষেপের কথা জানিয়ে আসছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে আদেশ বাস্তবায়নের দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের কোনো বক্তব্য আদালতের সামনে আসেনি। যার কারণে তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা জানা সম্ভব হয়নি।
এদিকে হাইকোর্টের আদেশ এবং বাংলা ভাষা প্রচলন আইন-১৯৮৭ এর লংঘনের ভূরিভূরি নজির দেখা যাচ্ছে প্রতিদিনই। অফিস-আদালত, গণমাধ্যম, বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড, নেমপ্লেট, নম্বর প্লেটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ নজির দেখা যায়।
সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন না হওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, মন থেকে না এলে এগুলো হবে না। বাংলা ভাষার জন্য যখন আন্দোলন হয়েছিল, তখন প্রাণের আবেগ থেকে হয়েছিল। সেই আবেগ আজ আর নেই। এ কারণে এটার বাস্তবায়নও নেই। তিনি আরও বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে দু-একজন বিচারপতি বাংলায় রায় লেখেন। অধিকাংশরাই রায় লেখেন ইংরেজিতে। তাই সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে হয়তো আরও সময় লাগবে।
১৯৮৭ সালের মার্চে পাস হয় বাংলা ভাষা প্রচলন আইন। এ আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন ছাড়া অন্যান্য সব ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহার করবে। নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগত কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লেখতে হবে। আইনে আরও বলা হয়েছে, ‘উল্লেখিত কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তা হলে সেটা বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। যদি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এ আইন অমান্য করেন তা হলে উক্ত কাজের জন্য তিনি সরকারি কর্মচারী শৃংখলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ করেছেন বলে গণ্য হবে এবং তার বিরুদ্ধে বিধি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কিন্তু দীর্ঘদিনেও এ আইন অকার্যকর অবস্থায় ছিল। এ অবস্থায় ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্টে একটি রিট করেন আইনজীবী ড. ইউনুস আলী আকন্দ। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে একই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ১৯৮৭ অনুযায়ী অফিস-আদালত, গণমাধ্যমসহ সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে একটি রুল জারি করেন। পাশাপাশি দূতাবাস ও বিদেশী প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের সব সাইনবোর্ড, নেমপ্লেট ও গাড়ির নম্বর প্লেট, বিলবোর্ড এবং ইলেকট্রনিকস মিডিয়ার বিজ্ঞাপন বাংলায় লেখা ও প্রচলনের নির্দেশ দেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব ও সংস্কৃতিক সচিবকে এ আদেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেন।
এরপর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একাধিকবার প্রতিবেদন দাখিল করা হয় হাইকোর্টে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে ওই আদেশ বাস্তবায়নের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ নিয়ে হাইকোর্ট ক্ষোভও প্রকাশ করেন। গত বছরের ১৮ আগস্ট হাইকোর্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দৃশ্যত কোনো ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় না। উপরন্তু ইলেকট্রনিকস মিডিয়াতে ইংরেজি ও মিশ্র ভাষায় বিজ্ঞাপন প্রচার বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এছাড়া কোনো সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইংরেজির স্থলে বাংলায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে বলে দৃশ্যত দেখা যায় না। যা বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ও অত্র আদালতের রুল ও আদেশের পরিপন্থী।’
হাইকোর্টের এ ক্ষোভ প্রকাশের পরও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে দৃশ্যত একই অবস্থা বিরাজ করছে। এ অবস্থায় ১৮ আগস্টে এ ক্ষোভের বিষয়টি উল্লেখ করে ২৮ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর একটি ডিও লেটার পাঠানো হয়েছে। এতে রিট মামলার আদেশ বাস্তবায়ন এবং বিশেষত সব সিটি কর্পোরেশন এলাকার সাইনবোর্ডগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলায় রূপান্তরে ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সচিবের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত