সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী    |    
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
একুশের চেতনার শত্রু পুঁজিবাদ

অমর একুশের শহীদদের আকাক্সক্ষা ছিল এমন এক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের, যেখানে সব মানুষের মধ্যে অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। কেউ কারও অধিকার লংঘন করবে না, কাউকে বঞ্চিত করবে না। সেই সমাজ গঠন করা যায়নি। পুুঁজিবাদ একুশের সেই চেতনাকে বাস্তবায়িত হতে দেয়নি। একুশের শহীদদের আত্মদানের পথ বেয়ে দেশের রাজনৈতিক মুক্তি অর্জিত হলেও অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তি স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছর পেরিয়েও অর্জিত হল না। কারণ পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা সে চেতনার প্রধান শত্রুরূপে আবির্ভূত হল। ফলে সমাজে পরিবর্তন ঘটল, পরিবর্তন ঘটল না মানুষের ভাগ্যের। বিদেশী শাসক-শোষক গেল ঠিকই; কিন্তু বহাল রয়ে গেল পুঁজিবাদী শাসন ও শোষণ ব্যবস্থা। এই অভিজ্ঞতাকে একজন সহজ-সরল লেখাপড়া না জানা বীরাঙ্গনা বর্ণনা করেছেন এভাবে- ১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তারা শত্রু বলতে চিনতেন পাঞ্জাবিদের আর মিত্র বলতে মুক্তিদের; কিন্তু রাজাকারদের তারা আলাদাভাবে শনাক্ত করতে পারতেন না কারণ তাদের চেহারা তো সাধারণ বাঙালিদের মতোই। হ্যাঁ, সমাজের পরিস্থিতি স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছর পরও এমনই- রাজাকারদের চেনা যায় না, তারা মিশে আছে আমাদের ভেতরেই। এভাবে আমাদের সঙ্গে মিশে থেকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাও ওই একই কাজ করছে যা করেছিল রাজাকাররা একাত্তরে। তারা বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রত্যক্ষ ও বর্বর বিরোধিতা করেছে। আজ পুঁজিবাদ এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পক্ষের লোকজন সেই একই বিরোধিতা করছে। তারা দেশের মানুষের অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াইয়ের প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নয়নের নামে, বিনিয়োগের নামে মেহনতী মানুষকে ভূমিচ্যুত করে, সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে, দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে পুঁজিবাদী শ্রেণীর হাতে তুলে দেয়ার কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।

আক্রান্ত হচ্ছে সংস্কৃতি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে ঘটনা ঘটেছে তা বাঙালি সংস্কৃতির ওপর অব্যাহত ধারাবাহিক আক্রমণের পরিণতি। বাঙালির সংস্কৃতি আক্রান্ত হয়েছে রমনায় পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে, টিএসসির বর্ষবরণের উৎসবে এমনকি শহীদ মিনারের পাদদেশেও। একুশে ফেব্রুয়ারি হচ্ছে আমাদের শহীদ দিবস। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এক নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস অন্যদের জন্য, যেখানে মাতৃভাষার চর্চা হচ্ছে না কিংবা মাতৃভাষার চর্চা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তাদের জন্য। আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস। এটা আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত এবং আমাদের জাতীয়তাবাদের বিকাশ এই পথেই হয়েছে। জাতীয়তাবাদের প্রধান উপাদান হল ভাষা। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তার একটি পরিণতি ঘটল। কিন্তু বাংলা তো সর্বস্তরে প্রচলিত হল না। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হল সাংবিধানিকভাবে কিন্তু এটা রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হল না। উচ্চশিক্ষায় এটি ব্যবহৃত হচ্ছে না, উচ্চ আদালতেও ব্যবহৃত হচ্ছে না এবং সমাজের যারা উচ্চবিত্ত অংশ, সেই অংশেও ব্যবহৃত হচ্ছে না। তিন ধারায় বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চবিত্তের সন্তানরা ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত হচ্ছে। মধ্যবিত্ত পড়ছে বাংলা মাধ্যমে। কিন্তু তার আকাঙ্ক্ষা উচ্চবিত্তের অনুগামী। আর মাদ্রাসায় যাচ্ছে গরিব মানুষ। এর কারণটা কী? কারণ হচ্ছে যদিও আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি কিন্তু আমরা এই দেশে আমাদের যে স্বপ্ন ছিল একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে সব মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে- সেটা হয়নি। আমাদের সমাজ আগের মতোই শ্রেণীবিভক্ত রয়ে গেছে এবং এই শ্রেণী বিভাজন আরও পুষ্ট হচ্ছে একটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং একটা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে। এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও মতাদর্শ অভিন্ন সেটা হচ্ছে পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কারণে দেখা যাচ্ছে শতকরা কুড়িজন লোক সুবিধাপ্রাপ্ত, আর আশিজন লোক সুযোগবঞ্চিত। এই যে বৈষম্য, তা পুঁজিবাদী বৈষম্য। এই বৈষম্যকে দূর না করলে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎকে যথার্থ অর্থে উন্নত করতে পারব না।

অনুলিখন : শুচি সৈয়দ


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত