মতিন আব্দুল্লাহ    |    
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বাঁশের সাঁকোই একমাত্র ভরসা
ন্যূনতম সেবাবঞ্চিত নাসিরাবাদের বাসিন্দারা
রাজধানীর উপকণ্ঠের ইউনিয়নের হালচাল ৮
রাজধানীর খিলগাঁওয়ের নাসিরাবাদ ইউনিয়নে প্রতিদিন বাঁশের সাঁকো দিয়ে বাসিন্দাদের খাল পারাপার -যুগান্তর

মোট ৩১ কিলোমিটার সড়কের মাত্র ২ কিমি. পাকা, ১১ কিমি. আধা পাকা, বাকিটা কাঁচা। এসব সড়কের এমনই বেহাল দশা, কোনো রিকশা বা অটোরিকশা চালকই যেতে চান না। এলাকার বেশিরভাগ মানুষ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের খুঁটি ব্যবহার করে অবৈধ সংযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। এ ছাড়া বছরের অর্ধেক সময় বেশিরভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে থাকে। ফলে যোগাযোগের অন্যতম ভরসা বাঁশের সাঁকো কিংবা নৌকা। এ অবস্থা খিলগাঁও, সবুজবাগ ও ডেমরা থানার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত নাসিরাবাদ ইউনিয়নের। রাজধানীর এত কাছে থেকেও যার বাসিন্দারা ন্যূনতম নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত।

এ ইউনিয়নে রয়েছে ১২টি গ্রাম। এর উত্তরে বাড্ডা, দক্ষিণে মতিঝিল, সবুজবাগ ও ডেমরা, পূর্বে রূপগঞ্জ উপজেলা এবং পশ্চিমে রামপুরা। নাসিরাবাদের আয়তন ৮ দশমিক ৬২ বর্গমাইল। লোকসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার।

খাল ও নদী বেষ্টিত হওয়ায় এ ইউনিয়নের এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে নৌকা ব্যবহার করতে হয়। কিছু এলাকায় বাঁশের সাঁকো তৈরি করে নিয়েছেন এলাকাবাসী। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে যাতায়াতের সুব্যবস্থার দাবি জানিয়ে এলেও কাক্সিক্ষত কোনো অগ্রগতি হয়নি।

জানতে চাইলে নাসিরাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আকবর হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রয়োজনের তুলনায় উন্নয়নে বরাদ্দ কম। এ কারণে প্রয়োজন হলেও টাকার অভাবে কাজ করা যায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে এসব ব্যাপারে বহুবার কথা বলেও আশানুরূপ কোনো সাফল্য পাইনি। নিজেকে এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে খুবই হতভাগা মনে হয়। কেননা চেষ্টা করেও এ এলাকার মানুষের জন্য তেমন কিছুই করতে পারিনি আমি।’

সরেজমিনে দেখা যায়, নাসিরাবাদ ইউনিয়নের শতভাগ সড়কেরই করুণ দশা। কাঁচা, আধা পাকা কিংম্বা পাকা কোনো সড়কই চলাচলের উপযোগী নয়। রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা প্রাইভেট কার- কোনো পরিবহনের চালকই ওই এলাকায় যেতে চান না। ইউনিয়নের ফকিরখালী গ্রামের কৃষক আমজাদ আলী যুগান্তরকে বলেন, ‘রামপুরা-বনশ্রী থেকে আমাদের ইউনিয়নের দূরত্ব ২-৩ কিলোমিটার। অথচ আমাদের এলাকার কি করুণ দশা। চলাচলের মতো কোনো সড়ক নেই। আমরা রাজধানীর এত কাছে বাস করি- এটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়।’

ইউনিয়নের ১২টি গ্রামের মধ্যে গৌরনগর, নাসিরাবাদ, শেখের জায়গা, বাইগ দিয়া, নাগদার পাড় এলাকায় রয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট। নাসিরাবাদ গ্রামের মুদি দোকানদার আজহার আলী বলেন, সরকারের এ এলাকার প্রতি কোনো দৃষ্টিই নেই। তিনি বলেন, গ্যাস সংযোগ পেলেও বছরের বেশিরভাগ সময় নাসিরাবাদে থাকে তীব্র গ্যাস সংকট।

আবর্জনায় ভরাট হচ্ছে জলাধার : এখনও আবর্জনা ব্যবস্থাপনার কোনো সিস্টেম গড়ে না ওঠায় এলাকাবাসী যত্রতত্র গৃহস্থালিসহ সব ধরনের আর্বজনা ফেলছেন। বিশেষ করে নাসিরাবাদ এলাকা দিয়ে প্রবাহিত রামপুরা খাল, মাণ্ডা খাল এবং বালু নদে ফেলা হচ্ছে আবর্জনা। এতে ওই এলাকায় পানিদূষণ মারাÍক আকার ধারণ করেছে। ত্রিমোহনীর বাসিন্দা আয়নাল হক বলেন, এ ইউনিয়নের বাসিন্দাদের কষ্টের কথা বলে শেষ করা যাবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এলাকার মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি।

ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ : ইউনিয়নের যেসব এলাকায় সরকারিভাবে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি সেসব এলাকার বাসিন্দারা বাঁশের খুঁটি ব্যবহার করে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে অবৈধ সংযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। ইউনিয়নের পরিষদের তথ্যমতে, ফকিরখালী, ইদারকান্দি, বালুর পার, বাবুর জায়গা, দাশের কান্দি, ত্রিমোহনী, লায়নহাটি গ্রামের বিভিন্ন স্থানে এমন ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে সতর্ক করা হলেও তা মানছেন না বাসিন্দারা। জানতে চাইলে ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোহাম্মদ আলী যুগান্তরকে জানান, গ্রামগঞ্জে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। অথচ রাজধানীর আওতাভুক্ত এ ইউনিয়নের সব জায়গায় এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। এটাও মানুষকে বিশ্বাস করতে হচ্ছে। ওয়ার্ড সচিব সরকারের কাছে নাসিরাবাদ ইউনিয়নের মানুষের জন্য দ্রুত সব ধরনের নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

বাঁশের সাঁকোয় পারাপার : ত্রিমোহনী ব্রিজ হওয়ায় নাসিরাবাদ এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক উন্নয়ন ঘটেছে। তারপরও সমস্যা শেষ হয়নি। রামপুরা খালের কারণে দাশেরকান্দি, ফকিরখালী, ইদারকান্দি, বাবুর জায়গা, বালুরপাড় গ্রামগুলো এখনও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। বাঁশের সাঁকোই তাদের একমাত্র ভরসা। সাঁকো ব্যবহার করতে গিয়ে নারী ও শিশুদের নিদারুণ দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

ড্রেনেজ সিস্টেম নেই : রাজধানীর অতি কাছের এ ইউনিয়নে এখনও পানি বা পয়োনিষ্কাশনের কোনো সিস্টেম গড়ে ওঠেনি। যে যেভাবে পারছেন ময়লা-আবর্জনা যেখানে-সেখানে ফেলছেন। বেশিরভাগ আবর্জনা ফেলা হচ্ছে দুটি খাল এবং পাশ দিয়ে প্রবহমান বালু নদে। ফলে খালের পানির রং হয়ে গেছে কালো এবং তাতে তীব্র দুর্গন্ধ।

শেকের জায়গা গ্রামের কৃষক মো. গিয়াজ উদ্দিন জানান, এ এলাকার দিকে কখনও সরকার দৃষ্টি দেয়নি। ফলে এখানকার মানুষের দুঃখের শেষ নেই। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি সরকার এ এলাকাকে সিটি কর্পোরেশনভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আমি মনে করি, সিটি কর্পোরেশনভুক্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আগে উন্নয়ন করে তারপর সিটি কর্পোরেশনর্ভুক্ত করলে ভালো হয়। না হলে সেবা না পেলেও এলাকাবাসীকে বিপুল পরিমাণ ট্যাক্স গুনতে হবে।’


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত