যুগান্তর রিপোর্ট    |    
প্রকাশ : ০১ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বড় বন্যার কবলে দেশ
এ পর্যন্ত ৩৯ শিশুর মৃত্যু, পানির নিচে আড়াইশ’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান * ১৩ হাজার টন চাল ও সাড়ে ৫ কোটি টাকা নগদ ছাড় * বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর * ত্রাণ নিয়ে নয়ছয় সহ্য করা হবে না -ত্রাণমন্ত্রী
চীন, ভারত ও নেপাল থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর ও উত্তর-মধ্যাঞ্চলের ১৬টি জেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকার ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ডুবে গেছে। এ পর্যন্ত মারা গেছে ৩৯ শিশু। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ২০ লাখ মানুষ। বন্যার্তদের সহায়তা দিতে এ পর্যন্ত ১৩ হাজার টন চাল, নগদ সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। এর বাইরে ৮ হাজার প্যাকেট ত্রাণসামগ্রী ও পর্যাপ্ত পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে পাঠানো হয়েছে। বন্যার্তদের সাহায্যে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই আহ্বান জানিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেছেন, ত্রাণ নিয়ে নয়-ছয় সহ্য করা হবে না। ত্রাণ নিয়ে অনিয়ম ও সময়মতো না পৌঁছালে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খাবার ও ত্রাণসামগ্রী নিয়ে বন্যাকবলিত মানুষের পাশে ছুটে যেতে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। রোববার কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা-২০১৬’ এবং ‘জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০১৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিককালে একটু বন্যা শুরু হয়েছে। বন্যাটা খুবই স্বাভাবিক আমাদের দেশে। তবে মাঝে মাঝে বন্যা খুব বড় আকারে আসে। কাজেই বন্যাদুর্গত মানুষদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াবার জন্য সবার প্রতি আমি আহ্বান জানাচ্ছি।’ শেখ হাসিনা বলেন, বন্যার ফলে মানুষের যাতে ক্ষতি না হয় সে জন্য ‘যথাযথ’ পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী বলেন ‘সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমরা আমাদের নদীগুলো ড্রেজিং করা, পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা, তার প্রবাহ যাতে ঠিক থাকে সে ব্যবস্থা- এই ধরনের অনেক কর্মসূচি হাতে নিয়েছি এবং তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।’
একই দিনে বন্যাদুর্গতদের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণসামগ্রী নিয়ে অনিয়মকারীদের কোনো ক্ষমা নেই বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। ত্রাণ নিয়ে নয়-ছয় করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ‘উদ্ভাবনী মেলা-২০১৬’ উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। ত্রাণমন্ত্রী বলেন, দেশে প্রচুর খাদ্য মজুদ আছে, বন্যার্তদের প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য বিতরণ করা হবে। দেশের বিপদগ্রস্ত মানুষদের জানমালের নিরাপত্তা দেয়াই সরকারের প্রধান দায়িত্ব। ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম বা সময়মতো ত্রাণ বিতরণ করা না হলে সংশ্লিষ্টদের শাস্তি পেতে হবে। সরকারের পাশাপাশি দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে বন্যার্তদের সাহায্য করার আহ্বান জানান মন্ত্রী।
সরকারের বন্যা সতর্কীকরণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) তথ্য অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী, ধরলা, আত্রাই, শীতলক্ষ্যা, কালীগঙ্গা ও কংসসহ ১২টি নদীর পানি গত তিন দিন ধরে বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। রোববার পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কুড়িগ্রামের চিলমারী পয়েন্টে ৬৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। যমুনার পানিও বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে ১০৫ সেন্টিমিটার ও বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে বিপদসীমার ওপরে আছে। টাঙ্গাইল সদর উপজেলার এলাসিনে ধলেশ্বরীর পানি ১৪০ সেন্টিমিটার এবং গোয়ালন্দে পদ্মার পানি বিপদসীমার ১০১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া নাটোরের গুর নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে অবস্থান করছে।
ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স কো-অর্ডিনেশন সেন্টারের (এনডিআরসিসি) তথ্যমতে, দেশের ১৬টি জেলার ৫৯টি উপজেলায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৯ হাজার ৩১৪টি ঘরবাড়ি পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত ও ১২ হাজার ৩৭১টি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় আড়াইশ’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৬৯টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৭ হাজার ৩৭৫ জনকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। তাদের চিকিৎসায় ৩৪৬টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। এ পর্যন্ত বন্যায় ১৪ জন মারা গেছে। এর মধ্যে জামালপুরে সর্বোচ্চ সাতজন মারা গেছে। দেশের মোট এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। ফসলি জমির ক্ষতির পরিমাণ এখনও নির্ধারণ করতে পারেনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। তবে প্রাথমিকভাবে তারা জানিয়েছে, কুড়িগ্রামের ৭ হাজার ১২৩ হেক্টর জমি, জামালপুরে ৯ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমি, কুষ্টিয়ায় ৩০০ একর জমি এবং টাঙ্গাইলে ২ হাজার ১৪০ হেক্টর জমির ফসল বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও পানি বঙ্গোপসাগরে যাওয়ার সময় রাজবাড়ী, ফরিদুপর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, বরিশাল জেলা নতুন করে প্লাবিত হতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে ওইসব এলাকার লাখ লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি। ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ে উঁচু বাড়ি, বাঁধ, স্কুল-কলেজ ও আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁয় নিয়েছেন।
এফএফডব্লিউসির বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর অবস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র, যমুনা এবং সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। গঙ্গার পানি স্থিতিশীল থাকলেও পদ্মার পানি বাড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী রিপন কর্মকার জানিয়েছেন, আগামী ৭২ ঘণ্টা পর যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কমতে পারে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় পদ্মা নদীর পানি সমতলে বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুরের নিুাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। ঢাকার চারপাশে বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা প্রভৃতি নদীর পানি সমতলে বৃদ্ধি পাবে এবং তা আগামী ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে বলেও জানান এ প্রকৌশলী।
আবহাওয়া অধিদফতর (বিএমডি), পানি উন্নয়ন বোর্ড, বুয়েটের বন্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি বছর স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ৯ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। আর এটি হলে আগস্টে দেশে বড় ধরনের বন্যা হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে অতি বর্ষণের কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম রোববার যুগান্তরকে বলেন, এল-নিনো ও লা-নিনোর (প্রশান্ত মহাসাগরে পানির উষ্ণায়ন থেকে সৃষ্ট বিশেষ পরিস্থিতি) প্রভাবে সাধারণত বন্যা হওয়া ও না হওয়া নির্ভর করে। ২০১৪ সালে এল-নিনো শুরু হয়েছে। এর প্রভাবে ইতিমধ্যে ভারত, পাকিস্তান ও চীনে বন্যা হয়েছে। এল-নিনোর প্রভাবে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে সাধারণত বন্যা হয়ে থাকে। চলতি বছর স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ৯ শতাংশ বৃষ্টি বেশি হতে পারে। ইতিমধ্যে দেশের ১৬টি জেলায় বড় আকারে বন্যা দেখা দিয়েছে। আগস্টে এটি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। ইতিপূর্বে আবহাওয়া অধিদফতর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ এমনকি জাতিসংঘের আবহাওয়াবিষয়ক সংস্থা ডব্লিউএমওর রিপোর্টেও চলতি বছর বাংলাদেশে বন্যার আশংকা ব্যক্ত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি ৮ বছর পর পর বড় ধরনের বন্যার আশংকা থাকে। তবে ২০০৭ সালের পর এখন পর্যন্ত বড় ধরনের বন্যা দেখা যায়নি বাংলাদেশে। চলতি বছর বড় আকারের বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বড় বন্যা হলে দেশের ৪০টি জেলা আক্রান্ত হতে পারে বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বন্যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ২২ জুন এমন আগাম তথ্য প্রকাশ করা হয়।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত