হারুন হাবীব    |    
প্রকাশ : ১১ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
এখনও যে লড়াই তার নেতৃত্বেও বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি এবং রাষ্ট্রপিতা। এই রাষ্ট্রের বয়স পঁয়তাল্লিশ পেরিয়েছে- আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪১তম শাহাদতবার্ষিকী পালন করছি। বিগত চার দশকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অনেক উত্থান-পতনের ঘটনা ঘটেছে। এই উত্থান-পতনের শুরু হয়েছে মূলত ’৬৯-৭০-এর সত্তরের সাধারণ নির্বাচন এবং তারপর ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণা এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে।

আমরা যখন সে সময়কার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং পরবর্তীকালে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি তখন আমরা লক্ষ্য করেছি এই প্রবল প্রতাপশালী মানুষটি কেবল রাজনীতিবিদই ছিলেন না, তার হাত দিয়ে এই বাংলাদেশে শতধা বিভক্ত মতবাদের বাংলাদেশে, একটি জাতীয়তাবাদী চেতনার ঐক্যের স্ফুরণ ঘটেছিল। যে জাতীয়তাবাদী চেতনার স্ফুরণ সম্ভব হয়েছিল একটি অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার পত্তনের মধ্য দিয়ে। সবাইকেই এ কথাটা স্বীকার করতে হবে যে, এই রাষ্ট্র, এই বঙ্গভূমিতে অনেক বড় রাজনীতিবিদ এসেছেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ষাট দশক থেকে শুরু করে সত্তর দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত যেভাবে গোটা জাতিকে মন-মনন এবং চেতনায় শাণিত করতে পেরেছিলেন, অধিকার সচেতন করতে পেরেছিলেন, একাত্ম করতে পেরেছিলেন- হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে- আর কোনো রাজনীতিবিদ তা পারেননি। আমাদের দুর্ভাগ্য যে মানুষ, যে নেতা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, যার হাত ধরে, যার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল ১৯৭১-এ। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রণাঙ্গনে উপস্থিত থাকতে পারেননি। স্বাধীনতা ঘোষণার প্রাক্কালেই ২৬ মার্চ রাতে তাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে কারারুদ্ধ করে এবং বিচারের সম্মুখীন করে। আমি বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে যদি প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত থেকে সশরীরে নেতৃত্ব দিতে পারতেন তাহলে হয়তো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অনেক অসম্পূর্ণ অধ্যায় সম্পূর্ণ করা সম্ভব ছিল। তারপরও মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের একজন সৈনিক হিসেবে আমি লক্ষ্য করেছি, সশরীরে না থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন মুক্তিবাহিনীর, মুক্তিযুদ্ধের প্রাণ-পুরুষ এবং তারই নেতৃত্বে তারই নির্দেশে সবকিছু সম্পন্ন হয়েছে। তারই চেতনায় সবকিছু সংগঠিত হয়েছে। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের মূলত নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার ‘জয় বাংলা’ স্লোগান- যা আমাদের আত্মাকে, চেতনাকে শাণিত করেছে।

আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ১৯৭৫ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি অর্থাৎ তখন যারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের বিরোধিতা করেছিল সেই বিশ্বশক্তি এবং পাকিস্তানিদের চক্রান্তে বঙ্গবন্ধু নিহত হন- মুক্তিযুদ্ধের সাড়ে তিন বছরের মাথায়। তার মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ডটি কোনো নিছক হত্যাকাণ্ড ছিল না; কারণ এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে তার স্বাভাবিক ইতিহাসের যাত্রাপথ থেকে বিচ্যুত করা হয়েছিল। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং এই পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ১৯৭৫-পরবর্তী দুই যুগ পরিচালিত করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধ আবহে অর্থাৎ পাকিস্তানপন্থী আবহে। শুধু তাই নয় তার হত্যাকাণ্ডের যাতে কখনোই বিচার করা না যায় তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। আমাদের সৌভাগ্য যে, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বকারী দল ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার গঠন করল তখন সেই কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হল এবং পর্যায়ক্রমে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার সম্পন্ন করা হল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই যে একটা পালাবদল, এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পুনর্জাগরিত একটি তারুণ্য শাক্তির অভ্যুদয় ঘটল। ১৯৭৫-এর পরবর্তী সময়ে যে ধারাবাহিকভাবে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাসে অভ্যস্ত করা হয়েছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় বীরদের প্রতি তাদের মধ্যে বিরাগ তৈরি করা হয়েছিল। আশার কথা, সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে একটা মনোজাগতিক বিপ্লব সাধিত হল- ফলে শুধু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচারই নয়, মুক্তিযুদ্ধের ঘাতক, দালাল, মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। আমি মনে করি, এই কাজগুলো করার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুধু রাজনৈতিক প্রাজ্ঞতা নয়, তার সাহস এবং বিচক্ষণতা উনি প্রদর্শন করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত পর্যায়ের সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। সেজন্য তিনি ধন্যবাদার্হ্য।

বর্তমান সময়ে দেশে যে জঙ্গিবাদের অর্থাৎ ধর্মীয় আগ্রাসী তত্ত্বের একটা স্ফুরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে কিছু বিভ্রান্ত তরুণের মধ্যে। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, এই ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থানের নেপথ্যে সুস্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির। আমরা জানি যে, এ দেশে আলবদর, আলশামস, রাজাকারদের জন্ম দিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের পর তাদের বিনাশ হয়েছে ভাবা হলেও আসলে তারা ঘাপটি মেরে ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন নামে আবির্ভূত হয়ে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষতি করতে চায়। আমি এখনও বিশ্বাস করি, এখন যে সময়, বর্তমানের যে লড়াই- এখনও তার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি টুঙ্গীপাড়া শুয়ে আছেন, কিন্তু আমাদের বুকের তেজ এখনও সেই ‘জয় বাংলা’- যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী করেছে। যা আমাদের শুভ ও কল্যাণের পক্ষে ভবিষ্যতেও জয়ী করবে।

অনুলিপি : শুচি সৈয়দ


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত