• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯
যুগান্তর রিপোর্ট    |    
প্রকাশ : ১১ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
তামকীন সাইটের ইঞ্জিনিয়ারসহ ছয় জঙ্গি গ্রেফতার
গুলশান ও শোলাকিয়াসহ ১১টি হামলা চালায় জেএমবি ও এবিটি * পরিকল্পনা ছিল আত্মঘাতী হামলার

গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলা চালানো হয়েছে দাওলাতুল ইসলামের ব্যানারে। জঙ্গি সংগঠন জেএমবি ও এবিটির নতুন ব্যানার এটি। এ ব্যানারে এক হয়ে জঙ্গিরা হামলা চালায়। আর পরে তাদের নিজস্ব ওয়েব মাধ্যম আত তামকীনে প্রচার করে। জেএমবি পরিচালিত আত তামকীন সাইটের অ্যাডমিন ইঞ্জিনিয়ার মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে সিফাতসহ গ্রেফতার হওয়া ছয় জঙ্গি র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য দেয়। মঙ্গল ও বুধবার গাবতলী এবং মিরপুর এলাকা থেকে এ ছয় জঙ্গিকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তারা আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করেছিল। ওই দুই হামলাসহ ১১টি হামলা পরিচালনা করে জেএমবি ও এবিটি।

বুধবার র‌্যাব সদর দফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান উল্লিখিত তথ্য দিয়ে বলেন, গ্রেফতারকৃত বাকি পাঁচজন হচ্ছে জাহিদ আনোয়ার ওরফে পরাগ, তাজুল ইসলাম ওরফে তাজুল, জাহিদ হাসান ওরফে মাঈন, জিয়াবুল হক জিয়া ও নয়ন হোসেন। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে সিফাত বাদে বাকিরা স্লিপার সেলের সদস্য। এরা প্রত্যেকেই নিষিদ্ধ জেএমবির প্রশিক্ষিত আত্মঘাতী সদস্যও। তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক এবং অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে সিফাত জানায়, হামলার পর দেশের বাইরেও তারা তথ্য পাঠায়।

র‌্যাবের এ পরিচালক আরও জানান, গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার পর জেএমবির দুটি গ্রুপ দাওলাতুল ইসলামের ব্যানারে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁ ও শোলাকিয়ায় নাশকতা সংঘটিত করে। পরে গ্রেফতারকৃত কয়েকজন জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ওই দুই ঘটনাস্থল থেকে প্রাপ্ত আলামত নিয়ে কাজ শুরু করে র‌্যাব। র‌্যাবের গোয়েন্দারা জানতে পারেন, জেএমবির এ ধরনের আরও বেশকিছু গ্রুপ নাশকতার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছে। যে কোনো স্থানে তারা নাশকতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম। এমন তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব-৪ এর একটি দল মঙ্গলবার গভীর রাতে বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে প্রথমে জাহিদ আনোয়ার ওরফে পরাগকে আটক করে। পরে আরও দুইটি অভিযান পরিচালনা করে গাবতলী আল-আরাফাত খাবার হোটেল থেকে তাজুল ইসলাম ওরফে তাজুল, জাহিদ হাসান ওরফে মাঈন ও বুধবার সকালে শাহ আলী মাজারের পেছনের একটি ভাড়া বাসা (বাসা নং-১২, রোড-২, উত্তর বিসিল, ওয়ার্ড-৮, ব্লক-খ, থানা-শাহ আলী, মিরপুর-১) থেকে দাওলাতুল ইসলামের মুখপাত্র আত তামকীন জঙ্গি সাইটের অ্যাডমিন সিফাতকে আটক করা হয়। যারা এরই মধ্যে আত্মঘাতী হামলার জন্য প্রস্তুত বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যায়, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে পাঁচজন জেএমবি ও একজন এবিটির সদস্য। তারা আত্মঘাতী হামলার জন্য পূর্ণপ্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তাদের আমিরের নির্দেশনা অনুযায়ী যে কোনো স্থানে, যে কোনো সময় নাশকতা ঘটানোর জন্য তারা অপেক্ষামাণ ছিল।

কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, আত তামকীন জেএমবি পরিচালিত একটি ওয়েবসাইট। এ দেশীয় জঙ্গিরা তাদের বিভিন্ন জঙ্গি হামলার সংবাদ ও ছবি এ সাইটে পোস্ট করে থাকে। এ সাইটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং প্রচার-প্রসারের জন্য আইএসের সংঘটিত বিভিন্ন হামলার সংবাদ বাংলায় অনুবাদ করে নিয়মিতভাবে প্রচার করা হয়।

র‌্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃংখলা বাহিনীর অব্যাহত অভিযানের মুখে নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) ও জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) নেতৃত্বহীনতার কারণে জঙ্গিরা নিজেদের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতায় আসে। পরে তারা দাওলাতুল ইসলামের ব্যানারে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এক্ষেত্রে আত তামকী এ সংগঠনের প্রচারের ভূমিকা রাখে।

র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে জানান, এ জঙ্গি সংগঠনের স্লিপার সেলের বেশকিছু সদস্য বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে নাশকতার জন্য পূর্ণপ্রস্তুতি গ্রহণ করে আসছে। এরা সামাজিক যোগাযোগ ফেসবুক ছাড়াও টেলিগ্রাম ও থ্রিমা অ্যাপসে যোগাযোগ করে। অনুসন্ধানে এ দলে নারী সদস্যদের সক্রিয় উপস্থিতিও লক্ষ করা গেছে। জঙ্গি হামলার পর তারা আত তামকীন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মিডিয়াতে নিজেদের আইএস হিসেবে প্রচার চালায়।

আবুল কালাম আজাদ আরও জানান, হামলার পর আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের ব্যানারে প্রকাশ করার চেষ্টা করে জেএমবি। এজন্য তারা নিজেদের কেন্দ্রবিন্দুতে আনাতে আইএস দাবি করে। কিন্তু বাংলাদেশের এ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোনো জঙ্গি সংগঠনের সম্পৃক্তততার তথ্য মেলেনি।

তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় হত্যাকাণ্ডের পরপর ‘আত তামকীন’ আইএসের পক্ষে দায় স্বীকার করে। তবে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা মূলত জেএমবি ও এবিটির সদস্য। এরা নিজেদের দাওলাতুল ইসলাম বাংলাদেশের ব্যানারে সংগঠতি করে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১১টি হামলা পরিচালিত হয়েছে বলে তারা দায় স্বীকার করে। জিজ্ঞাসাবাদে জঙ্গিরা জানায়, জঙ্গি সংগঠন প্রথমত দুই ধরনের দাওয়াতের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ করে। প্রথমত তারা সরাসরি ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে দাওয়াত দেয়। পরে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে (ফেসবুক) দাওয়াত দিয়ে থাকে। দাওয়াত দেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোভাব যাচাই করে।

গ্রেফতারকৃতরা আরও জানায়, জঙ্গিদের সেলের সদস্যরা একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহার করে। একজন আরেকজনের পরিচয় জানে না। তারা যে কোনো হামলা আগে রেকি করে। এদের দলে আরও আত্মঘাতী সদস্য আছে। যারা হামলার জন্য প্রস্তুত থাকে। এরা বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে, তাদের ভাষায় বাড়ি ছাড়াকে বলা হয়, হিজরত।

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে জঙ্গিরা আরও জানায়, ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকার কারণে তারা তাদের আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়াটি ব্যাংক অথবা বিকাশের মাধ্যমে সম্পন্ন করে না। এক্ষেত্রে তারা নতুন পদ্ধতি যেমন- স্বণ চোরাকারবারী প্রক্রিয়ায় অর্থ সংগ্রহ করে। এর সুবিধা হল, কেউ কখনও আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাকে জঙ্গি হিসেবে নয়, চোরাকারবারী হিসেবে চালিয়ে দেয়া সহজ হয়। সাধারণত আমিরই তাদের আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে থাকেন।

ইঞ্জিনিয়ার সিফাতের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, মাদারীপুরে কলেজ শিক্ষকের ওপর জঙ্গি হামলায় আবরার, নীরব এবং ওসামা নামক তিন ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, আবরার, ওসামা, আবদুর রহমান ও নীরব নামের ব্যক্তিসহ চারজন ওই অপারেশনের জন্য সিলেটে একত্রে মিলিত হয়ে জঙ্গি আক্রমণের পরিকল্পনা করে। এক্ষেত্রে প্রথমে ওসামা, আবরার ও নীরব সিলেটে অবস্থান করে। আবদুর রহমান বিশেষভাবে গ্র“পের আমির কর্তৃক নির্বাচিত হয় এবং ওসামা, আবরার ও নীরবের কাছে যোগাযোগ করতে বলা হয়। সুনির্দিষ্ট দিনে আবদুর রহমান ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং বলে, সে সাদা প্যান্ট, সাদা শার্ট পরিহিত অবস্থায় সিলেটে পৌঁছাবে। ওই কথোপকথনের পর আবদুর রহমান মোবাইল বন্ধ করে দেয়। এমনকি মোবাইল থেকে সিম কার্ডটি খুলে ফেলে। আবদুর রহমান একতা নামে একটি বাসে করে সিলেটে পৌঁছায় এবং উপরোল্লিখিত তিন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে। নিরাপত্তার স্বার্থে তারা কোনো হোটেলে অবস্থান করেনি। ওই চার ব্যক্তি হজরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজারে এবং মাজারের আশপাশে ঘোরাঘুরি করে সময় পার করে। পরে নিরাপত্তার খাতিরে আমিরের নির্দেশে আবদুর রহমানকে ওই অপারেশন থেকে সরিয়ে নেয়া হয় এবং তাকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। আবদুর রহমানকে অন-লাইনে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আবার নির্দেশ দেয়া হয় এবং পরে হিজরতের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়।

র‌্যাবের অনুসন্ধানে জানা যায়, আবদুর রহমানের প্রকৃত নাম জিয়াবুল হক, সে ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা থানার বাসিন্দা। সে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করে এবং পরে সংসারে অভাব-অনটনের কারণে ঢাকায় আসে এবং পোশাক কারখানায় কাজ নেয়। সে আগে থেকেই জসিমউদ্দিন রহমানীর ভক্ত এবং জসিমউদ্দিন রহমানীর জিহাদি ভাষণ দ্বারা উদ্দীপ্ত।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত