সিলেট ব্যুরো    |    
প্রকাশ : ১১ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
জালিয়াতি ও প্রতারণা মামলা
ছেলেমেয়েসহ রাগীব আলীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা
ক্ষতিপূরণ চান প্রতারিতরা, মিছিল স্মারকলিপি
বাঁ থেকে- সিলেটের রাগীব আলী, তার ছেলে আবদুল হাই, মেয়ে রুজিনা কাদির ও সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্ত -সংগৃহীত

সিলেটের কথিত দানবীর রাগীব আলী ও তার ছেলেমেয়েসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্মারক জাল করে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার দেবোত্তর সম্পত্তি তারাপুর চা বাগান অবৈধ দখলের দুই মামলায় এ পরোয়ানা জারি করা হয়। বুধবার সকালে মহানগর মুখ্য হাকিম সাইফুজ্জামান হিরো তাদের বিরুদ্ধে এ আদেশ দেন।

রাগীব আলী ছাড়াও যাদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয়েছে- রাগীব আলীর একমাত্র পুত্র আবদুল হাই, মেয়ে রোজিনা কাদির, জামাতা আবদুল কাদির, রাগীব আলীর আত্মীয় মৌলভীবাজারের রাজনগরের বাসিন্দা দেওয়ান মোস্তাক মজিদ ও তারাপুর চা-বাগানের সেবায়েত পংকজ কুমার গুপ্ত। প্রতারণার মাধ্যমে দেবোত্তর সম্পত্তি আত্মসাতের পর এর একাংশে আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্লট করে বিক্রি করেন রাগীব আলী। এর মাধ্যমেও কয়েকশ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন এ প্রভাবশালী। ওই টাকা আদায়ের দাবিতে এবার মাঠে নেমেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এদিকে শনিবারের মধ্যে তারাপুরের সব অবৈধ স্থাপনার বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বুধবার দ্বিতীয় দফা গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে জেলা প্রশাসন। আর এতে আরও বিপাকে পড়েছেন রাগীব আলীর কাছ থেকে প্লট-ফ্ল্যাট কেনা ব্যক্তিরা। বুধবার তারা মিছিল-সমাবেশ করেন এবং স্মারকলিপি দেন।

১০ জুলাই আদালতে প্রতারণা ও জালিয়াতির দুই মামলায় অভিযোগপত্র দেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সারোয়ার জাহান। বুধবার অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল। রাগীব আলীকে অসুস্থ দেখিয়ে আদালতের কাছে সময় চান তার আইনজীবীরা। আদালত তা নামঞ্জুর করে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।

রাগীব আলীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম জানান, মেডিকেল বোর্ডের দেয়া রাগীব আলীর অসুস্থতার প্রতিবেদন জমা দিয়ে আমরা সময় চেয়েছিলাম। কিন্তু অতীতের কয়েকটি তারিখেও আদালতে অনুপস্থিত থাকায় রাগীব আলীর পক্ষে করা আবেদন আমলে নেননি আদালত।

চার্জশিট : ১১৭নং মামলা তদন্ত করেন পিবিআইয়ের এসআই দিলীপ কুমার নাথ। তদন্তে জালিয়াতি ও প্রতারণার প্রমাণ পান তিনি। বিষয়টি উল্লেখ করে ১০ জুলাই চার্জশিট দেন। এতে রাগীব আলী, সেবায়েত পংকজ কুমার গুপ্ত, দেওয়ান মোস্তাক মজিদ, আবদুুল হাই, আবদুল কাদির ও রোজিনা কাদিরকে অভিযুক্ত করা হয়। রাগীব আলীর স্ত্রী রাবেয়া খাতুন মৃত্যুবরণ করায় তার নাম বাদ দেয়া হয়।

১২ নম্বর মামলা তদন্ত করেন এসআই দেওয়ান আবুল হোসেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর একই দিনে তিনিও চার্জশিট দেন। এতে অভিযুক্ত করা হয়েছে রাগীব আলী ও তার ছেলে আবদুল হাইকে। চার্জশিট দুটি সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম মো. সাইফুজ্জামান হিরোর আদালতে জমা দেয়া হয়।

মামলা : ২০০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সিলেট সদর ভূমি কমিশনার এসএম আবদুল কাদের বাদী হয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানায় মামলা দুটি করেন। এ সময় সরকারি দফতরের স্মারক জাল করে ভুয়া চিঠি তৈরিসহ জালিয়াতির ৪টি প্রমাণপত্রও জমা দেন তিনি। পরে মামলা দুটির কার্যক্রম স্থগিত করেন উচ্চ আদালত। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ রাগীব আলীর অবৈধ দখলে থাকা দেবোত্তর সম্পত্তি তারাপুর চা-বাগান পুনরুদ্ধারের রায় দেন। ওই রায়ে দীর্ঘ ১১ বছর আগে করা প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলা দুটিও সক্রিয় করার নির্দেশ দেয়া হয়। কোতোয়ালি থানা পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দিলে রহস্যজনক কারণে তারা তদন্ত না করে বারবার সময় চাইতে থাকে। তাদের ব্যর্থতায় এপ্রিলে তদন্ত শুরু করে পিবিআই। মন্ত্রণালয়ের চিঠি জাল করে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ভূসম্পদ আত্মসাতের সত্যতা পায় পুলিশের ইউনিটটি।

এজাহারে যা রয়েছে : ১৯১৫ সালের ২ জুলাই বৈকুণ্ঠ চন্দ্র গুপ্ত তারাপুর চা বাগানসহ তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি শ্রীশ্রী রাধা কৃষ্ণ জিউ দেবতার নামে রেজিস্ট্রি দানপত্র করে দলিল করেন। তখন থেকে সম্পত্তিটি দেবোত্তর হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। পরে নানা জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে রাগীব আলীর পুত্র আবদুল হাইয়ের নামে ৯৯ বছরের বন্দোবস্তের দলিল তৈরি করা হয়। দলিলে সই করেন দেওয়ান মোস্তাক মজিদ। রাগীব আলী ও তার জালিয়াত চক্রের দাবি, শ্রীশ্রী রাধা কৃষ্ণ দেবতার পক্ষে সেবায়েত শ্রী পংকজ কুমার গুপ্ত ১৯৮৮ সালে ৪২২.৯৬ একর জমি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে রাগীব আলীর পুত্র আবদুল হাইয়ের কাছে বিক্রি করতে চুক্তি করেন। অথচ সেবায়েত ওই দলিলে স্বাক্ষরই করেননি। মোস্তাক মজিদের মাধ্যমে কথিত আমমোক্তার নামা তৈরি করা হয়। আমমোক্তার নিয়োগ করা হয় রাগীব আলীর স্ত্রী রাবেয়া খাতুন চৌধুরী, আত্মীয় দেওয়ান মোস্তাক মজিদ, মেয়ে জামাই আবদুল কাদির ও মেয়ে রোজিনা কাদিরকে। চারজনই রাগীব আলীর পারিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়। এতে প্রতীয়মাণ হয়, রাগীব আলীই তার নিজের স্বার্থে জাল আমমোক্তারনামা তৈরি করেছেন।

স্মারক জালিয়াতি : ভূমি মন্ত্রণালয়ের ৮নং শাখা থেকে ১৪-০৮-২০০৫ তারিখে তারাপুর সংক্রান্ত কোনো পত্রই ইস্যু করা হয়নি। অথচ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার দেবোত্তর সম্পত্তি গ্রাসে রাগীব আলী ও তার পুত্র আবদুুল হাই ওই তারিখের ভূ:ম:/শা-৮/খাজব/৩১৯/৯১/১৭০ স্মারকের চিঠিটি জাল করে নেন কৌশলে। প্রকৃত স্মারকটি ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-২ কে ঢাকা জেলায় ৭ একর খাস জমি বন্দোবস্ত দেয়ার। রাগীব আলী ও আবদুল হাই ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব শাহ ইমদাদুল হকের স্বাক্ষর ও ওই চিঠি জাল করেন। এর মাধ্যমে তারাপুর চা বাগানের সমুদয় সম্পত্তি নামজারি করে আত্মসাৎ করার চেষ্টা করেন রাগীব আলী।

তেমনিভাবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের শাখা-৮ থেকে ১২-১০-১৯৮৯ তারিখের ভূ:ম:/শা-৮/খাজব/৫৩/৮৯/৪৪৬নং স্মারকে সহকারী সচিব এমএ মালেকের স্বাক্ষরে পাবনা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) একটি চিঠি ইস্যু করা হয়। এ স্মারক নম্বরটি জাল করে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবার ও দেবোত্তর প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ভূসম্পদ আত্মসাতের সহায়ক দলিল তৈরি করেন রাগীব আলী ও তার জালিয়াত চক্র।

ক্ষতিপূরণ দাবি : রাগীব আলীর বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন সিলেট সিটির ৭নং ওয়ার্ডবাসী। তারা রাগীব আলীকে দানব আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার রাতে ওয়ার্ডের তারাপুরের মেওজায় আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এ দাবি জানান তারা। সভায় বক্তারা রাগীব আলীর কাছ থেকে তাদের ক্ষতিপূরণ আদায়েরও দাবি জানান। বুধবার তারাপুর এলাকাবাসী মিছিল করেন। তারা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নে জারি করা গণবিজ্ঞপ্তি স্থগিত করার জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেন।

১৯ জানুয়ারি আপিল বিভাগ এক রায়ে প্রতারণার মাধ্যমে দখল করা তারাপুর চা বাগান থেকে ৬ মাসের মধ্যে রাগীব আলীর অবৈধ দখল উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী ১৫ মে বাগানটির মূল ও আদি সেবায়েত ডা. পংকজ কুমার গুপ্তকে বাগানের খোলা জায়গা ও মন্দির বুঝিয়ে দেন স্থানীয় প্রশাসন। তবে রাগীব আলীর অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা ও তিন শতাধিক আবাসিক স্থাপনা এখনও বর্তমান। প্রথম দফার গণবিজ্ঞপ্তির পরও দখলদাররা দখল না ছাড়ায় দ্বিতীয় দফা গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জেলা প্রশাসন। এতে ১৩ আগস্টের মধ্যে দখল না ছাড়লে ১৪ আগস্ট সিলেটের তারাপুর চা-বাগানে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। উচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তারাপুরের স্থাপনার ব্যাপারে পর্যালোচনা করতে ৪ আগস্ট ঢাকায় অর্থমন্ত্রীর বাসায় বৈঠক করেন সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতারা।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত