আকতার ফারুক শাহিন, পাথরঘাটা (বরগুনা) থেকে    |    
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
পাথরঘাটায় ভাবমূর্তি সংকটে আ’লীগ
একের পর এক পিটিয়ে চলেছেন এমপি রিমন

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য হওয়া পর্যন্ত, একের পর এক পিটিয়েই চলেছেন বরগুনা-২ আসনের এমপি আওয়ামী লীগ নেতা শওকত হাসানুর রহমান রিমন। কেবল পেটানোই নয়, সালিশ বৈঠকের নামে গৃহবধূর মাথায় মানববিষ্ঠা ঢালার ঘটনা পর্যন্ত ঘটিয়েছেন তিনি। আর এবার সর্বশেষ পেটালেন এক সরকারি কর্মচারীকে। অবশ্য এবারের ঘটনায় খানিকটা ভিন্নতা এনেছেন ক্ষমতাসীন দলের এই এমপি। এর আগে তার হাতে মার খাওয়া সবাই ছিলেন নারী। পুরুষ বলতে কেবল এই সরকারি কর্মচারী। এসব কারণে নারীবিদ্বেষী জনপ্রতিনিধি হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছেন তিনি। সালিশ বৈঠকের নামে প্রতিবার তার ঘটানো এসব ঘটনায় কেবল বরগুনায় নয়, দেশজুড়েই উঠেছে তোলপাড়। কিন্তু দলীয় কিংবা প্রশাসনিক, কখনই কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে। বরঞ্চ বহালতবিয়তে তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন তার মারপিট আর সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করার ঘটনা। এমপি রিমন অবশ্য এসব অভিযোগ স্বীকার করেননি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনরোষ থেকে আলোচ্যদের বাঁচাতে সামান্য শাসন করেছেন বলে দাবি তার।

স্বাধীনতাবিরোধীর সন্তান থেকে আওয়ামী লীগের এমপি : রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই বিতর্কে জড়িয়ে আছেন এমপি রিমন। নির্বাচনের রাজনীতি প্রশ্নে তার প্রথম হাতেখড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার রায়হানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে। তার বাবা খলিলুর রহমানও ছিলেন ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। অবশ্য আরেকটা পরিচয় আছে এই খলিলুরের। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন বরগুনা মহকুমা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। বরগুনা-২ আসনের সাবেক এমপি গোলাম সবুর টুলুর অকাল মৃত্যুর পর উপ-নির্বাচনে যখন তাকে দলীয় মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগ, তখন এই মনোনয়নের চরম বিরোধিতা করেন স্থানীয় নেতারা। রাজাকারপুত্রকে দলীয় মনোনয়ন দেয়ার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনসহ বিক্ষোভ সমাবেশ পর্যন্ত হয় পাথরঘাটায়। তার পরও অবশ্য তাকেই মনোনয়ন দেয় ক্ষমতাসীন দল এবং বিএনপি-জামায়াতবিহীন নির্বাচনে এমপি হন তিনি। এমপি হওয়ার আগে আওয়ামী রাজনীতির সাথে তার তেমন কোনো সংশ্লিষ্টতার খবর দিতে পারেনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের কেউ।

পিটিয়ে পিটিয়ে সময় পাড় : বাবা খলিলুর রহমানের মৃত্যুর পর রায়হানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হন বর্তমান এমপি রিমন। তখন থেকেই তার বিরুদ্ধে নিজ হাতে পেটানো বিশেষ করে মহিলাদের গায়ে হাত তোলার অভিযোগ উঠতে শুরু করে। চেয়ারম্যান থাকাবস্থায় রায়হানপুর এলাকায় এক মহিলার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে সালিশ বৈঠক বসান রিমন। ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ তুলে ওই মহিলাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন রিমন। বিষয়টি নিয়ে তখন ব্যাপক তোলপাড় হলেও রহস্যজনক কারণে কোনোরকম বিচারের সম্মুখীন হতে হয়নি তাকে। ইউপি চেয়ারম্যানের পর একসময় পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হন রিমন। তখনও প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনা ঘটান। ২০১০ সালের ৮ জানুয়ারি তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান রিমন কর্তৃক প্রহৃত হন পাথরঘাটা উপজেলার হেমন্তপুর গ্রামের আক্কাস মিয়ার স্ত্রী হোসনে আরা বেগম। বহু মানুষের সামনে ওই মহিলাকে বেধড়ক বেত্রাঘাত করেন তিনি। ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন রিমনের বিরুদ্ধে পাথরঘাটা থানায় মামলা করেছিলেন গৃহবধূর ভাই ইদ্রিস চৌধুরী। মাঝে আরো বেশ কয়েকটি ঘটনার পর সর্বশেষ ৪ জানুয়ারি পাথরঘাটার দলীয় কার্যালয়ে ডেকে এনে এমপি রিমন পেটালেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান করণিক নুরুল ইসলামকে। বছরাধিককাল ধরে অনুপস্থিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক শাহনাজ পারভিনকে বেতন-ভাতা প্রদানে সহায়তা করার অভিযোগে এবারও সালিশ বৈঠকের নাম করেই নুরুল ইসলামকে মারধর করেন রিমন। চিকিৎসক এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ শত শত মানুষের সামনে প্রকাশ্যে এ ঘটনা ঘটান তিনি। এরই মধ্যে এ ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে পাথরঘাটা উপজেলা প্রশাসনে।

এমপি রিমনের রায়ে নারীর মাথায় মানববিষ্ঠা : ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দ্বিতীয় দফায় সংসদ সদস্য হওয়ার মাত্র ১১ মাসের মাথায় ২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর পাথরঘাটা উপজেলার গহরপুর গ্রামে ওই ঘটনা ঘটান তিনি। এলাকার বিভিন্ন মানুষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি করার অভিযোগে ওই গৃহবধূর বিচার করার উদ্দেশ্যে সালিশ বসান রিমন। স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সালিশ শেষে দেয়া রায়ে প্রথমে জুতাপেটা করা হয় তাকে। পরে এমপি রিমনের নির্দেশে পাশের একটি শৌচাগার থেকে এক বালতি মানববিষ্ঠা এনে ঢেলে দেয়া হয় ওই গৃহবধূর মাথায়। বিষয়টি নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হলে দেশজুড়ে ওঠে তোলপাড়। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতিসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন তীব্র নিন্দা জানায় ওই ঘটনার।

ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ, সব অস্বীকার করলেন রিমন : গৃহবধূর মাথায় বিষ্ঠা ঢালা প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, ‘বিক্ষুব্ধ জনগণ ওই কাজটি করেছে। তা ছাড়া তাকে বাঁচানোর কোনো বিকল্পও ছিল না।’ তিনি বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান এবং উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালে যে দুটি ঘটনা ঘটেছে তা অতিরঞ্জিত করে প্রচার হয়েছে। কোনো মারধর নয়, কেবল তাদের শাসানো হয়েছিল বলে জানান রিমন। সর্বশেষ সরকারি কর্মচারীকে মারধর বিষয়ে এমপি রিমন বলেন, সে যে অপরাধ করেছে তাতে তার আরো কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত ছিল। চিকিৎসা সেবাবঞ্চিত পাথরঘাটার মানুষকে চরমভাবে ঠকিয়েছে সে। ওই দিনের সালিশিতে সাধারণ মানুষ যতটা ক্ষুব্ধ ছিল, তাতে আমি হস্তক্ষেপ না করলে আরো বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনগণের ভালো মন্দ দেখব এটাই তো নিয়ম। রিমন এভাবে বললেও তার কর্মকাণ্ডে দারুণ ক্ষুব্ধ পাথরঘাটা আওয়ামী লীগ। এসব কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে মনে করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেলায়েত হোসেন। যুগান্তরকে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নীতি আদর্শ যারা হৃদয়ে ধারণ করেন না, তারা এমন ধরনের ঘটনা ঘটাবেন সেটাই স্বাভাবিক। তা ছাড়া একজন রাজাকারপুত্রের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি আর কিইবা আশা করা যায়। সালিশির নামে এভাবে বেআইনি মারধরই নয়, পুরো নির্বাচনী এলাকায় বিএনপি-জামায়াতকে প্রতিষ্ঠিত করছেন এমপি রিমন। তিনি এলাকায় ঘোরেন জামায়াত নেতার গাড়িতে। প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে বিএনপি-জামায়াতকে প্রতিষ্ঠিত করছেন তিনি। তার কারণে ভোটের দুর্গ হিসেবে পরিচিত বরগুনা-২ আসনে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দল। বিষয়টি শিগগিরই আমরা লিখিতভাবে কেন্দ্রকে জানাব।




 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত