মাসুদ করিম    |    
প্রকাশ : ২৩ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
এশিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধিতে চাপে বাংলাদেশ
সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফর বিলম্বিত * চীনের সঙ্গে মেরিটাইম সংলাপে সবার দৃষ্টি * সমুদ্র নিরাপত্তায় সহায়তা বাড়াতে চায় যুক্তরাষ্ট্র
এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধিতে চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। ফলে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সহযোগিতায় বাংলাদেশকে অতিমাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। ভারত, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের সামনে আসছে। এ চ্যালেঞ্জের কারণে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের রুটিন কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মধ্যে উত্তেজনায় এ দুই দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কার্যক্রমের গতি ধরে রাখতে সমস্যা হচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উত্তাপের কারণে দুই বড় শক্তিই সামুদ্রিক সহযোগিতায় ঢাকার দিকে অতিমাত্রায় ঝুঁকেছে।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশকে কঠোর নিরপেক্ষতা বজায় রেখে চলতে হবে। এ তিনটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু ভালো নয়; বরং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোনো অবস্থাতেই কারও পক্ষ নেয়া চলবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো বিশেষ কারণে কিছু বলতে হলে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যে যে সমস্যা চলছে; সেই সমস্যার সমাধান হলে বাংলাদেশের জন্য ভালো। ঠিক একইভাবে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা নিরসন হলে বাংলাদেশের জন্য তা হবে আরও ভালো। বর্তমান সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানই হবে আমাদের দেশের জন্য আন্তরিক প্রত্যাশা। তার বাইরে কোনো পক্ষে যাওয়া ঠিক হবে না।’ ভারত ও চীনের মধ্যে এখন তীব্র উত্তেজনা আর অবিশ্বাসের কালো ছায়া। বেইজিংয়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড সামিট বর্জন করায় ভারতের প্রতি নাখোশ চীন। অপরদিকে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সিল্ক রোড করিডর নির্মাণের উদ্যোগে ক্ষুব্ধ ভারত। সেই অস্বস্তির প্রভাবেই বর্তমানে তিব্বত ও ভুটান সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ উত্তেজনার পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭ থেকে ১০ এপ্রিল ভারত সফর করেন। ওই সময়ে দু’দেশের মধ্যে প্রায় তিন ডজন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা চুক্তি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। এসব বিষয়ে সম্পর্কের গতি ধরে রাখতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশে আসছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ করে চীনের সঙ্গে উত্তেজনায় সুষমা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে তার সফরের কর্মসূচি নির্ধারণ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও সুষমা স্বরাজের সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফরকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনে ভারত একতরফা সমর্থন দিয়েছিল। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। তাই ভারতের বার্তা জানার জন্য সুষমার সফরকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হচ্ছে। সুষমা স্বরাজ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। তিনি সুস্থ হয়ে প্রথমে বাংলাদেশ সফর করবেন বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। সুষমা স্বরাজের সফরের প্রস্তুতিও নিচ্ছে ঢাকা। তবে এখনও কোনো কর্মসূচি জানা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, চীনের সঙ্গে সৃষ্ট উত্তেজনায় তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত বছরের ১৪ ও ১৫ অক্টোবর বাংলাদেশ সফর করেন। ওই সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ২৭টি চুক্তি ও এমওইউ সই হয়। এসব চুক্তি কার্যকর করার বিষয়ে রুটিন কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। চীনের সঙ্গে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে উত্তেজনার কারণে বাংলাদেশকে সতর্ক হয়ে অগ্রসর হতে হচ্ছে। ওই সময়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অপরাপর চুক্তি ও স্মারকের পাশাপাশি সমুদ্র খাতে সহযোগিতার এমওইউ সই হয়। তার আওতায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মেরিটাইম সহযোগিতা নিয়ে একটি সংলাপ আগামী ২৫ ও ২৬ জুলাই বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) খুরশেদ আলমের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল বৈঠকে যোগ দেবে।
বাংলাদেশ-চীন মেরিটাইম সহযোগিতা বৈঠকের প্রস্তুতি হিসেবে ১৫ মে ঢাকায় একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অনুবিভাগের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। গত এপ্রিলেই চীনের সঙ্গে মেরিটাইম সহযোগিতা নিয়ে সংলাপের কথা ছিল। কিন্তু তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর থাকায় চীনের সঙ্গে সংলাপটি হয়নি।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মেরিটাইম সংলাপের প্রতি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দৃষ্টি থাকবে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ-চীন মেরিটাইম সংলাপের এজেন্ডায় চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ব্লু ইকোনমি, নৌচলাচল সংক্রান্ত সামুদ্রিক তথ্য বিনিময়, সমুদ্রসীমায় অবৈধ ও অপরাধমূলক তৎপরতা মোকাবেলা, জাহাজ ও নাবিকদের শুভেচ্ছা সফর, পারস্পরিক সামর্থ্য বৃদ্ধি, গবেষণা প্রভৃতি ইস্যু রয়েছে। ঢাকায় সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘একই ধরনের সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গেও আমাদের রয়েছে। আমরা কাউকেই আহত করতে চাই না তাই সতর্কতার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলি। কেননা ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ সবার সঙ্গেই আমাদের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। সবার সঙ্গেই মেরিটাইম সহযোগিতা রয়েছে।’
এদিকে দক্ষিণ চীন সাগরকে ঘিরে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও মিয়ানমারের সঙ্গে মেরিটাইম সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত পার্লামেন্টারি কমিটি বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও মিয়ানমারের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে পেন্টাগনের প্রতি সুপারিশ করেছে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মেরিটাইম সহযোগিতা রয়েছে। তার অধীনে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় অপরাধ দমনে কারিগরি সহযোগিতা দিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডকে টহলযানও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, সামরিক ঘাঁটি স্থাপনসহ সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের পুরনো। চীনের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে সেসব পুরনো প্রত্যাশার কথা যুক্তরাষ্ট্র নতুন কৌশলে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে কিনা সেটিই দেখার বিষয়। এমন হলে বাংলাদেশকে ভারসাম্য রক্ষার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত