কাজী জেবেল    |    
প্রকাশ : ২৩ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
এক বছর আগে কারিগরি সহায়তা চুক্তির মেয়াদ শেষ
ঝুঁকিতে ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রম
বাড়ি বাড়ি গিয়ে ২৫ জুলাই থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু, নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্ত, মৃতদের বাদ ও ভোটার স্থানান্তরের কার্যক্রম চলবে * ডাটা আপলোড ও দ্বৈত ভোটার শনাক্তকরণে জটিলতা সৃষ্টি শঙ্কা * মাঠ পর্যায়ে নেই পর্যাপ্ত ল্যাপটপ, স্ক্যানারসহ অন্যান্য উপকরণ
ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ চার কারণে কারিগরি ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন ভোটারের তথ্য সংগ্রহে থানা, উপজেলা ও জেলা অফিসগুলোতে ল্যাপটপ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানারসহ প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব রয়েছে। স্থানীয় নির্বাচন অফিসগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের নিজস্ব নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) নেই। ফলে সিডি, ডিভিডি বা হার্ডড্রাইভের মাধ্যমে নতুন ভোটারদের ডাটা ঢাকায় কেন্দ্রীয় সার্ভারে আনার সময়ে হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। হালনাগাদের সময় দ্বৈত ভোটার শনাক্তের জন্য তথ্য ম্যাচিং এএফআইএস (অটোমেটিক ফিঙ্গার আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম) সাপোর্ট সার্ভিসের সঙ্গে চুক্তি এক বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে। প্রায় একই ধরনের সমস্যা রয়েছে কেন্দ্রীয় সার্ভারে হালনাগাদের মূল ডাটাবেজ আপলোড করার ক্ষেত্রেও। এসব সমস্যার মধ্যেই ২৫ জুলাই সারা দেশে শুরু হচ্ছে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম। সব কাজ শেষে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে ৩১ জানুয়ারি। এ সময়ের মধ্যে নতুন ভোটার সংগ্রহ, মৃত ভোটারের নাম বাদ এবং ভোটার তালিকা স্থানান্তরের কাজ চলবে। তবে তথ্য ম্যাচিং এবং ডাটাবেজ সাপোর্ট সংক্রান্ত চুক্তি না থাকায় নতুন ভোটার তালিকা নিয়ে কাজের সময় হার্ডওয়্যারে সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানের সুযোগ কমিশনের হাতে থাকবে না।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নবম সভায় ঝুঁকির বিষয়গুলো চ্যালেঞ্জ আকারে উত্থাপন করে এর জরুরি সমাধান চেয়েছে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ (এনআইডি)। ১৯ জুলাই অনুষ্ঠিত ওই সভায় চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের সময়সীমা আগামী ৩১ জানুয়ারি থেকে ১৫ দিন পেছানোর জন্য এ সংক্রান্ত (ভোটার তালিকা) আইন সংশোধনের প্রস্তাব করে এনআইডি। এ নিয়ে ইসির তোপের মুখে পড়েন এনআইডির কর্মকর্তারাও। তবে সমস্যাগুলো এখনই সমাধানের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন এনআইডির কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
ভোটার হালনাগাদে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও তা তেমন কোনো সমস্যার সৃষ্টি করবে না বলে আশা প্রকাশ করছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। তিনি যুগান্তরকে বলেন, কারিগরি যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা নিয়ে আমি নিজেই দু’বার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। কমিশন সভায় কিছু সমস্যা উত্থাপন করেছে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ। সেগুলো সমাধানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকা সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী বলেন, বিগত বছরগুলোতে ভোটার তালিকা হালনাগাদ হওয়ায় এবার হয়তো কমসংখ্যক নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্ত হবেন। একইভাবে হয়তো কমসংখ্যক মৃত ভোটার থাকতে পারে। এত অল্পসংখ্যক ভোটার নিয়ে কাজ করায় এসব সমস্যা কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। বিষয়গুলো উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কোনো সমস্যা নয়।
ইসি সচিবালয় ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কারিগরি সমস্যাগুলোর কারণে পুরো হালনাগাদ কার্যক্রম ও কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। হালনাগাদ চলাকালে ডাটাবেজে কোনো ধরনের কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে বড় ধরনের সমস্যা হবে। নির্দিষ্ট সময় অর্থাৎ আগামী বছরের ৩১ জানুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। অথচ ওই ভোটার তালিকা দিয়েই অনুষ্ঠিত হবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তারা আরও বলেন, নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে থাকা দশ বছরের পুরনো প্রায় অচল ল্যাপটপ দিয়ে হালনাগাদ কার্যক্রম চালাতে বলা হয়েছে। এসব ল্যাপটপ প্রায়ই হ্যাং হয়ে যায়। কোনো কোনো ল্যাপটপ অকেজো হয়ে গেছে। এছাড়া ভোটার হালনাগাদের ডাটা হাতে হাতে বহন করাও নিরাপদ নয়। হাতে হাতে এসব ডাটা বহনের সময় চুরি বা হারিয়ে গেলে ওইসব ভোটারের গোপনীয়তা লংঘনের শঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার হালনাগাদে তিন ধরনের কার্যক্রম চলবে। সেগুলো হচ্ছে- ২০০০ সালের পহেলা জানুয়ারির আগে যাদের জন্ম তাদের নতুন ভোটার হিসেবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। যেসব ভোটার মারা গেছেন তাদের শনাক্ত করে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেয়া এবং ভোটারদের ইচ্ছা অনুযায়ী ভোটার এলাকা স্থানান্তরের কার্যক্রমও চলবে এ সময়ে। আগামী ২৫ জুলাই থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন তথ্য সংগ্রহকারীরা। তবে ভোটার এলাকা স্থানান্তরে ইচ্ছুকদের নিজ নিজ থানা বা উপজেলা অফিসে গিয়ে নির্দিষ্ট ফরম (১৩ নম্বর) পূরণ করতে হবে এবং উপযুক্ত তথ্য-উপাত্ত ওই ফরমের সঙ্গে জমা দিতে হবে। আরও জানা গেছে, ২০ আগস্ট থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত তিন ধাপে নিবন্ধন কেন্দ্রে নতুন ভোটারদের তথ্য আপলোড ও ছবি তোলার কাজ করা হবে। হালনাগাদ ভোটার তালিকার খসড়া প্রকাশ করা হবে আগামী বছরের ২ জানুয়ারি। ওই ভোটার তালিকার ওপর দাবি-আপত্তি ও অভিযোগ নিষ্পত্তি করে আগামী ৩১ জানুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে।
ভোটার হালনাগাদে যেসব ঝুঁকি : নির্বাচন কমিশনের নবম সভায় জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম ঝুঁকির বিষয়গুলো তুলে ধরেন। এর সঙ্গে সমাধানের প্রস্তাবও দেন তিনি। ডাটা আপলোডের ঝুঁকি তুলে ধরে কমিশনের কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়, উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিস থেকে মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিবন্ধিত ভোটারদের তথ্য প্র“ফ রিডিংয়ের পর সেন্ট্রাল সার্ভারে পাঠানো হয়। বর্তমানে জিএসএম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে উপজেলা ও থানা অফিসগুলো সংযুক্ত। ওই নেটওয়ার্কে বাল্ক ডাটা (অনেক তথ্য) আপলোডের কারণে ডাটা লস হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। ওই কার্যপত্রে আগের পদ্ধতি অনুযায়ী মোবাইল হার্ডডিস্কের মাধ্যমে ডাটা এনে কেন্দ্রীয়ভাবে আপলোড করার কথা বলা হয়েছে। পরবর্তীকালে মাঠ পর্যায়ে ব্রডব্যান্ড কানেকটিভিটি স্থাপনের প্রস্তাব দেন তিনি।
ইসির একাধিক কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, সারা দেশের নির্বাচন অফিসগুলোর মধ্যে ভাচুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) স্থাপনের জন্য টেন্ডার করা হয়েছিল। কিন্তু বিগত কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের কমিশনের আমলে কিছু লোকের অসৎ উদ্দেশ্য এবং আইনি জটিলতার কারণে তা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ভিপিএন স্থাপিত হলে এসব বাল্কডাটা অনায়াসে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সার্ভারে পাঠানো সম্ভব হতো। এতে ডাটা চুরি বা লসের ঝুঁকি থাকত না।
তথ্য ম্যাচিংয়ে ঝুঁকি : ভোটার তালিকায় দ্বৈত ভোটার রয়েছে কিনা- তা বের করা হয় এএফআইএস দিয়ে হাতের আঙুলের ছাপ মেলানোর মাধ্যমে। নাগরিকদের ভোটার করার আগে তথ্য ম্যাচিং করা হয়। এ সংক্রান্ত কারিগরি জিনিস সীমিত পরিসরে ইসির রয়েছে, সার্ভিস সাপোর্ট পেতে কোনো চুক্তিও নেই। এ বিষয়ে সভার কার্যপত্রে বলা হয়েছে, তথ্য ম্যাচিংয়ে সাপোর্ট সার্ভিসের চুক্তি গত বছর (২০১৬ সালে) জুনে শেষ হয়েছে। তাই এ হালনাগাদে তথ্য ম্যাচিংয়ে হার্ডওয়্যারজনিত সমস্যা হলে কোনো ধরনের সাপোর্ট পাওয়া যাবে না। এ সমস্যা সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে এএফআইএস সাপোর্ট সার্ভিসের চুক্তি নবায়ন বা নতুন চুক্তি করা প্রয়োজন বলে কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পিপিআর মেনে চুক্তি করার বিষয়ে ইসি সায় দিয়েছে।
মূল ডাটাবেজ আপলোডে ঝুঁকি : কার্যপত্রে ডাটাবেজ আপলোডের জায়গা কম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ভবনে যে ডাটা সেন্টার রয়েছে সেখানে মূল ডাটাবেজ স্টোরেজের সাইজ ৪৫ টেরাবাইট (টিবি)। এর মধ্যে আনুমানিক ১০ টেরাবাইট ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু বর্তমানে স্মার্টকার্ড বিতরণের সময় দশ আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং তা আপলোড শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে হালনাগাদকৃত তথ্য আপলোড করলে আনুমানিক ৪ টেরাবাইট খালি থাকবে। অপরদিকে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে স্থাপিত ডাটা সেন্টারের স্টোরেজ ৩৫ টেরাবাইট পূর্ণ হয়ে গেছে। এর ফলে ডাটা সেন্টার ও ডিজেস্টার রিকোভারি সাইটের মধ্যে সমন্বয় হচ্ছে না। এছাড়া এ সংক্রান্ত বিষয়ে ওরাকল সাপোর্ট সার্ভিসের সঙ্গে চুক্তি এক বছর আগে শেষ হওয়ায় ডাটাবেজ সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হলে সাপোর্ট পাওয়া যাবে না। এতে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এসব সাপোর্ট নেয়া হতো। বিশ্বব্যাংক এ খাতে অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। কার্যপত্রে এ সংক্রান্ত চুক্তি জরুরি ভিত্তিতে করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরঞ্জামাদি সংকট : ভোটারদের তথ্য নিবন্ধনের জন্য ল্যাপটপ, ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানার, ক্যামেরা ও সিগনেচার প্যাডের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে প্রতিটি থানা ও উপজেলা অফিসগুলোতে ৫টি ল্যাপটপ রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি ২০০৭ সালে কেনা, যেগুলোর বেশির ভাগই নষ্ট। এছাড়া ২০১৩ ও ১৬ সালে দুটি ল্যাপটপ কেনা হয়েছে, সেগুলো সচল রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভোটার হালনাগাদের জন্য এগুলো পর্যাপ্ত নয়। একইভাবে পর্যাপ্তসংখ্যক ফিঙ্গার প্রিন্ট স্ক্যানার, ডিজিটাল ক্যামেরা ও সিগনেচার প্যাড নেই।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত