যুগান্তর রিপোর্ট    |    
প্রকাশ : ২৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
ডান চোখের আলো নিভে গেল সিদ্দিকের
বাম চোখের আশাও ক্ষীণ
চক্ষুবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটে রোববার সিদ্দিকের পাশে তার মা ও ভাই -যুগান্তর

ডান চোখে আর দেখতে পাবেন না সিদ্দিকুর রহমান। বাম চোখের আলো ফেরার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। রোববার সিদ্দিক চোখের ব্যান্ডেজ খুলে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসকরা এ অবস্থা দেখতে পান। এদিকে সিদ্দিকুর ও তার পরিবারের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তার বন্ধুরা। সিদ্দিকুরের চিকিৎসায় নিয়োজিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইফতেখার মোহাম্মদ মুনির যুগান্তরকে বলেন, সিদ্দিকুরের ডান চোখের অবস্থা একেবারেই খারাপ। শনিবার ওই চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়। ডান চোখে তিনি কোনো আলোই দেখতে পাচ্ছেন না। আর বাম চোখের কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই চোখটি ওয়াশ করা হয়েছে। ওই চোখে তিনি মাঝে মাঝে আলো দেখতে পাচ্ছেন, তাও সামান্য।

সিদ্দিকুর আর দেখতে পাবেন কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতে তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আশা নেই। আর বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আশাও ক্ষীণ। বাম চোখে আরেকটি অপারেশন করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শনিবার অস্ত্রোপচারের পর রোববার সকালে সিদ্দিকুরের চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হয়। এরপর তার চোখের এমআরআইসহ বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগে ও পরে দু’বার বৈঠক করেছে মেডিকেল বোর্ড।

সিদ্দিকুরের বাম চোখের অস্ত্রোপচারে দায়িত্বরত চিকিৎসক রেটিনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. দীপক কুমার নাগ যুগান্তরকে বলেন, ‘তার ডান চোখের অবস্থা বেশি খারাপ ছিল। শনিবার থেকে আমরা ওষুধ দিচ্ছি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে আমরা ওষুধ কমিয়ে-বাড়িয়ে দিচ্ছি। সিদ্দিকুর বাম চোখে মাঝে মাঝে আলো দেখতে পাচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘সিদ্দিকুর দেখতে পাবেন, এমন নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারছি না, তবে আশা করছি অবস্থার উন্নতি হবে। আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।’

এদিকে দরিদ্র পরিবারের সন্তান সিদ্দিকুর আহত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তার দেখভাল করছেন তার বন্ধুরা। তার বন্ধু শাহ আলী যুগান্তরকে বলেন, হাসপাতালের কেবিন ভাড়াসহ বিভিন্ন খরচ দিতে হচ্ছে না। তবে ভর্তি ও ভর্তি-পরবর্তী কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি এবং ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এমনকি হাসপাতালের বাইরে থেকেও কিছু পরীক্ষা করিয়ে আনতে হয়েছে। সিদ্দিকুরের পরিবারের পক্ষে এসব ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে তিতুমীর কলেজসহ অন্যান্য কলেজ থেকে সিদ্দিকুরের জন্য তার বন্ধুরা চাঁদা তুলে সহায়তা করেছেন। সেই টাকা দিয়েই সব ব্যয় মেটানো হচ্ছে। শাহ আলীসহ আরও কয়েকজন বন্ধু পুলিশের গুলিতে আহত সিদ্দিকুরের নিরাপত্তার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেন। কর্মজীবন শুরুর আগেই যদি সিদ্দিকুরের চোখের আলো নিভে যায়, তাহলে তার পক্ষে জীবন বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই তার ও তার পরিবারের জীবিকা নির্বাহে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।

প্রসঙ্গত, পরীক্ষার রুটিন ও তারিখ ঘোষণাসহ কয়েকটি দাবিতে বৃহস্পতিবার সকালে শাহবাগে অবস্থান নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এ সময় গুরুতর আহত হন সিদ্দিকুর রহমান (২৩)।

ক্ষুব্ধ স্বজন ও গ্রামবাসী, উন্নত চিকিৎসার দাবি : ফুলপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানান, সিদ্দিকুরের দু’চোখের আলো নিভে যাচ্ছে- এমন খবরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তার ছেলেবেলার সহপাঠী, স্বজন ও গ্রামবাসী। তারা এ জন্য দায়ী পুলিশ সদস্যের বিচার দাবি করেছেন। পাশাপাশি তার উন্নত চিকিৎসার দাবি জানান। হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া অজপাড়াগাঁয়ের সিদ্দিকুরের স্বপ্ন ছিল একজন বড় সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার। আশা ছিল, সৎ উপায়ে উপার্জনের মাধ্যমে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন। তার সেই স্বপ্ন আজ অনিশ্চয়তার মুখে।

সরেজমিন ঢাকেরকান্দায় সিদ্দিকুরের গ্রামের বাড়িতে দেখা যায়, বাড়ির সামনে বিষণœ মনে বসে আছেন এক ভাই নেছার উদ্দিন এবং ভাবি সাবিনা ইয়াসমিনসহ স্বজনরা। সিদ্দিকুরের বড় ভাই নায়েব আলীর স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন যুগান্তরকে বলেন, ‘যে পুলিশ আমার দেবরের দুটি চোখ নষ্ট করে দিয়েছে, আল্লাহ যেন তার বিচার করেন।’ তিনি আক্ষেপ করে জানান, বাড়ি এলেই সিদ্দিকুর বলত, ‘ভাবি আমাদের অভাব দূর হবে। ভালো রেজাল্ট করে সরকারি কর্মকর্তা হয়ে সংসারের অভাব ঘোচাবো। গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করব।’

তার ছেলেবেলার বন্ধুরা জানান, ঢাকার তিতুমীর কলেজে ভর্তির পর থেকে একটি দোকানে কাজ করে এবং টিউশন করে পড়াশোনার খরচ চালাতেন সিদ্দিকুর। ছুটিতে বাড়ি এলে টিউশনের আয় থেকে ভাতিজাদের জন্য বই অথবা পড়ার সামগ্রী কিনে আনতেন। বালিখা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম দুদু জানান, অমানবিক এ ঘটনাটি ওই পরিবারের জন্য সারা জীবনের কান্নায় পরিণত হয়েছে।

ঢাকায় হাসপাতালে অবস্থানরত বড় ভাই নায়েব আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে সিদ্দিকুরের উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে তার দু’চোখ ভালো করার দাবি জানান। তিনি বলেন, খুব কষ্ট করে রাজমিস্ত্রির কাজ করে ভাইকে এতদূর এগিয়ে নিয়েছি। আজ আশা-ভরসার সবই শেষ হয়ে গেছে।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত