বরিশাল ব্যুরো    |    
প্রকাশ : ২৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
তারিক সালমনের মামলা প্রত্যাহার
শেষ দেখে ছাড়ব- স্থানীয় সরকারমন্ত্রী * সাজুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন * ছয় পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার * বকেয়া ভাড়া পরিশোধ করলেন সেই বিচারক
আগৈলঝাড়া উপজেলার সাবেক ইউএনও গাজী তারিক সালমনের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন সৈয়দ ওবায়েদ উল্লাহ সাজু। রোববার দুপুর ১২টার দিকে তিনি বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেন। পরে বিচারক অমিত কুমার দে বাদীর জবানবন্দি নিয়ে মামলাটি খারিজ করে দেন। বিবাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আফজালুল করিম যুগান্তরকে এ তথ্য দিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করে উপজেলা প্রশাসনের আমন্ত্রণপত্রে ছাপানোর অভিযোগ এনে ৭ জুন এ মামলা করেছিলেন সৈয়দ ওবায়েদ উল্লাহ সাজু। এ মামলায় ১৯ জুলাই দুই ঘণ্টা হাজতবাস করতে হয় তারিক সালমনকে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা এবং আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর মামলা প্রত্যাহার করলেন তিনি। তবে এবার সাজুর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন।
এদিকে রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে রোববার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘ইউএনও’র হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা এর শেষ দেখে ছাড়ব। তার সঙ্গে অন্যায়ের বিচার অবশ্যই হবে। কারণ, আমার মনে হচ্ছে এটা সুপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ মোহনপুর উপজেলায় নবনির্মিত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের উদ্বোধনকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন মন্ত্রী।
এর আগে শনিবার রাতে বরিশাল আদালতে দায়িত্বরত ছয় পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়। তারিক সালমনকে নাজেহালের দিন ওই সদস্যরা দায়িত্বে ছিলেন। হাতকড়া পরানোর মতো করে ইউএনওকে হাজতে নিয়েছিলেন তারা। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (ডিবি) নাসির উদ্দিন মল্লিক শনিবার রাতে যুগান্তরকে জানান, প্রশাসনিক কারণে আদালতে দায়িত্বরত একজন এসআই, দু’জন এটিএসআই এবং তিন কনস্টেবলকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশলাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে সমালোচনার মুখে বরিশাল সার্কিট হাউসের সাত মাসের বকেয়া ভাড়া রোববার পরিশোধ করেছেন তারিক সালমনের মামলার সেই বিচারক মো. আলী হোসেন। সোনালী ব্যাংকের বরিশাল কর্পোরেট শাখায় চালানের মাধ্যমে ৯৩ হাজার ৯৫০ টাকা জমা দেয়া হয় এদিন। বরিশাল জেলা প্রশাসনের চিঠি দেয়ার প্রায় ১১ মাস পর বকেয়া পরিশোধ করলেন তিনি।
মামলা প্রত্যাহার : শুনানির সময় সৈয়দ ওবায়েদ উল্লাহ সাজুর কাছে আদালত জানতে চান, তিনি কেন মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন? জবাবে সাজু বলেন, শিশুর আঁকা বঙ্গবন্ধুর ‘বিকৃত’ ছবি ছাপানোর বিষয়টি নিয়ে একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। পরে মূল ছবি দেখে ভুলের অবসান হয়েছে। এ কারণে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়েছে।’ মামলা খারিজের পর সাজুর কাছে জানতে চাইলে একই কথা বলেন তিনি। যুগান্তরকে জানান, ছবি বিকৃত হওয়ার বিষয়টি তিনি বুঝতে পারেননি। এখন বুঝতে পেরে মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি কিছুই বলতে রাজি হননি।
শুনানির সময় গাজী তারিক সালমন আদালতে হাজির ছিলেন না। তার পক্ষে বরিশাল অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নুরুল আমিন উপস্থিত ছিলেন। তিনি যুগান্তরকে জানান, মামলা প্রত্যাহারের জন্য আদালতে বাদী আবেদন করলে বিচারক মামলাটি খারিজ করে দেন। তবে পরে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাতে পারেননি।
সাজুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা : বরিশালের জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান জানান, আদালতের কাছে আবেদনের প্রেক্ষিতে রোববার তারিক সালমনের বিরুদ্ধে মামলা সংক্রান্ত সব নকল সংগ্রহ করে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনে পাঠানো হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গাজী তারিক সালমন মোবাইল ফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘আইনি প্রক্রিয়ার ওপর আমার ইচ্ছা বা অনিচ্ছার কোনো বিষয় নেই। আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে সেটাই গ্রহণ করব।’ মামলা প্রত্যাহার হওয়ার কথা তিনি শুনেছেন বলে জানান।
বিচারকের বকেয়া ভাড়া : বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) কল্যাণ চৌধুরী স্বাক্ষরিত চিঠি সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল জেলা প্রশাসনের পরিচালনাধীন সার্কিট হাউসের পুরাতন ভবনের ৭নং কক্ষে ২০১৫ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে ২০১৬ সালের ২৮ জুন পর্যন্ত অবস্থান করেন তিনি। ২০১৫ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত চার দিনের মোট ৩৯০ টাকা ভাড়া পরিশোধ করেন। কিন্তু বাকি দিনের ভাড়া পরিশোধ করেননি। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ওই কক্ষে এক থেকে তিন দিন পর্যন্ত প্রতিদিন ৯০ টাকা হারে এবং চার থেকে সাত দিন পর্যন্ত ১২০ টাকা হারে এবং সাত দিনের বেশি হলে প্রতিদিন চারশ’ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা আছে। এই হিসাবে মুখ্য মহানগর হাকিমের কাছে মোট পাওনা হয় ৯৩ হাজার ৯৫০ টাকা। এ বকেয়া ভাড়া পরিশোধের জন্য এনডিসি ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট মুখ্য মহানগর হাকিমকে চিঠি দেয়। কিন্তু তিনি টাকা পরিশোধ করেননি।
বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃতির অভিযোগে করা মামলায় মুখ্য মহানগর হাকিম মো. আলী হোসেন ইউএনও গাজী তারিক সালমনের জামিন প্রথমে নামঞ্জুর ও পরে দুই ঘণ্টার মাথায় মঞ্জুর করেন। এ নিয়ে দেশব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তখন সার্কিট হাউসের কক্ষের বকেয়া ভাড়ার বিষয়টি প্রকাশ হয়। এতে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন ওই বিচারক।
রোববার সোনালী ব্যাংক, বরিশাল কর্পোরেট শাখায় এক চালানের মাধ্যমে ৯৩ হাজার ৯৫০ টাকা জমা দেয়া হয়। অফিসার ক্যাশ মহিউদ্দিন আহমেদের সই করা ওই চালান কোড ১/০৭৪২/০০০০/২৬৮১। এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের বরিশাল কর্পোরেট শাখার উপমহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসাইন জানান, রোববার দুপুরে মুখ্য মহানগর বিচারিক হাকিম মো. আলী হোসেনের সার্কিট হাউসের বকেয়া ভাড়া জমা পড়েছে। এ বিষয়ে মো. আলী হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
আগৈলঝাড়ায় যুগান্তরের ফটোকপি বিক্রি : আগৈলঝাড়া প্রতিনিধি জানান, রোববার যুগান্তরের প্রথম পাতায় ‘ইউএনও ইস্যুতে তোলপাড়’ শিরোনামে প্রধান সংবাদ প্রকাশ হয়। এ কারণে বরিশালের আগৈলঝাড়ায় যুগান্তর হট কেক ছিল। খুব সকালে আগৈলঝাড়ায় যুগান্তর আসার পরপর সব পত্রিকা বিক্রি হয়ে যায়। অনেক পাঠক পত্রিকা না পেয়ে হকারদের ফোন করে যুগান্তর চেয়েছেন। মূল পত্রিকা না পেয়ে দোকান থেকে ফটোকপি করে নিয়েছেন পাঠকরা। ২৬ মার্চের মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আমন্ত্রণপত্রে আগৈলঝাড়া সদর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণীর এক ছাত্রীর আঁকা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়েই এ মামলা করেছিলেন সাজু।
বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সৈয়দ ওবায়েদ উল্লাহ সাজুর মামলায় ১৯ জুলাই মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে হাজির হয়ে তারিক সালমন জামিন আবেদন করেন। বিচারক মো. আলী হোসেন তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই বিচারক দুই ঘণ্টা পর তার জামিন মঞ্জুর করেন। এর মধ্যে পুলিশ সদস্যরা তাকে হাতকড়া পড়ানোর মতো করে হাতে ধরে হাজতখানায় নেন। ওই ছবি সামাজিক গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে তুমুল সমালোচনার সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিস্ময় প্রকাশ করেন। জেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক পদ থেকে সাময়িক বহিষ্কার করে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় দল।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত