সিলেট ব্যুরো    |    
প্রকাশ : ২৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
সিলেট মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর
শিক্ষামন্ত্রীর প্রশ্রয়ে জাহাঙ্গীরের বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য
ক্ষমতা খাটাতে ব্যবহার করেন মন্ত্রীর সুপারিশ * নিয়ম ভেঙে ৮ বছর একই জায়গায় * মন্ত্রীর আশীর্বাদ থাকায় অভিযোগের তদন্ত হয় না
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ঘনিষ্ঠজন পরিচয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদফতর সিলেটের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক জাহাঙ্গীর কবির আহম্মদ। যেখানে একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি অবস্থান করার কথা নয়, সেখানে তিনি দায়িত্বে রয়েছেন টানা আট বছর। এ দীর্ঘ সময় তাকে ঘিরে সিলেটে বিশাল এক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। আর এ সিন্ডিকেটে রয়েছেন জাহাঙ্গীর কবিরের অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও বেশ কয়েকজন শিক্ষকনেতা, যারা তার এজেন্ট হিসেবে ঘুষ আদায় করে থাকেন। এর মধ্যে বদলি ও এমপিওভুক্তির বাণিজ্যই বেশি। অভিযোগ রয়েছে, চাহিদামাফিক ঘুষের টাকা না দিলে আবেদনকারীদের বদলি ও এমপিওভুক্তিতে চরম হয়রানির শিকার হতে হয়। এছাড়া চাঁদাবাজিরও অভিযোগ রয়েছে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন দিবস উদযাপন, সংবর্ধনা, উৎসব-অনুষ্ঠানের নামে জেলা, উপজেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের কাছ থেকে তিনি হাতিয়ে নেন টাকা। ভুক্তভোগীরা জাহাঙ্গীরের এসব অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ হজম করে চলেছেন শুধু শিক্ষামন্ত্রীর প্রিয়ভাজন হওয়ায়।
বাংলাদেশ সরকারি শিক্ষক সমিতি সিলেট অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় এক নেতা যুগান্তরকে বলেন, ‘মাউশি সিলেটের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক জাহাঙ্গীর কবির আহম্মদের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের হয়রানি, অসৌজন্যমূলক আচরণ, বদলি বাণিজ্যের অনেক অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষকদের হুমকি-ধমকি দিয়ে তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় জটিলতা সৃষ্টি করে ঘুষ আদায় করেন তিনি। দীর্ঘদিন সিলেটে অবস্থান করায় তিনি একটি সিন্ডিকেটও তৈরি করেছেন। সিলেটে এসেই তিনি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেককে বদলি করে অন্যত্র পাঠিয়ে দেন। এরপর পছন্দ মতো লোকদের এনে সিন্ডিকেট তৈরি করেন। এখন তাদের দিয়েই ঘুষ আদায় করছেন। এ সিন্ডিকেটের মধ্যে তার অফিসের কেরানি, পিয়ন ও ড্রাইভারও আছেন। কোনো কাজে গেলে তিনি দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ঘুষ না দিলে এসব কর্মচারীও শিক্ষকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।’
শিক্ষকনেতা আরও বলেন, ‘জাহাঙ্গীর ও তার সিন্ডিকেটের লোকজনের অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করায় শিক্ষক অলকরঞ্জন পাল, ঝলকরঞ্জন তালুকদার, মাহফুজা আক্তারসহ বেশ কয়েকজনকে বদলি করা হয়েছ। সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের ভর্তি বাণিজ্য বন্ধ করায় প্রধান শিক্ষক অনিলকৃষ্ণ মজুমদারের মতো শিক্ষককে বদলি করা হয়। এছাড়া সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় ও অগ্রগামী বালিকা বিদ্যালয় থেকে স্বাধীনতার পক্ষের শিক্ষকদের সরিয়ে সরকারেরই উপর তলার নির্দেশের কথা বলে সরাসরি জামায়াত-শিবির ও তাদের পরিবারের সদস্যদের এ দুই বিদ্যালয়ে আনা হয়েছে।’ ওই শিক্ষকনেতার দাবি, ‘জাহাঙ্গীর কবিরের কারণে শিক্ষা ক্ষেত্রে গৃহীত সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ভেস্তে যাচ্ছে।’
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি সিলেট মহানগর শাখার সভাপতি আহমদ আলী ভুক্তভোগী বেশ কয়েকজনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘জাহাঙ্গীরের নিয়োজিত লোকজন এমপিওভুক্তির জন্য শিক্ষকদের কাছে ঘুষ নেন। উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকেও চাঁদা নেন তিনি। এমনকি অধীনস্থদের ভুয়া, অতিরিক্ত ভাউচার জমা দিতে বাধ্য করে বিলের টাকায় ভাগ বসানোর অভিযোগটি শিক্ষা বিভাগে চাউর রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘জাহাঙ্গীর কবির আহম্মদ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদফতর সিলেটের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালকের দায়িত্ব পালন করলেও তিনি একজন শিক্ষক। কিন্তু শিক্ষক হয়ে শিক্ষকের মর্যাদা তিনি দেন না।’
বিদ্যালয়ের কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে আগে সম্পন্ন হওয়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এমপিওভুক্তি, বেতন স্কেল পরিবর্তনসহ বেশ কিছু কাজ জেলা ও আঞ্চলিক অফিসের মাধ্যমে সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেয়া হয় মন্ত্রণালয় থেকে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে শুরু হয় জাহাঙ্গীরের ঘুষ বাণিজ্য। শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ, সঠিকভাবে অনলাইনে আবেদন করার পরও বিভিন্ন অজুহাতে ফাইল বাতিল হয়ে যায়। আবার একই সঙ্গে জমা হওয়া ফাইলের একটি গ্রহণ করা হয়, অন্যটি বাতিল হয়। তারা জানান, শিক্ষা অফিসের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মচারী সুকৌশলে শিক্ষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন পন্থায় হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।
এমপিও দুর্নীতিতে জড়িয়ে শিক্ষকদের কাছে এখন ভিলেন জাহাঙ্গীর কবির। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, প্রতিটি শিক্ষককে এমপিওভুক্তির জন্য সর্বোচ্চ ১ লাখ, সর্বনিম্ন ২৫ হাজার টাকা দিতে হয় জাহাঙ্গীর কবিরকে। তা না হলে ফাইল উপরে যায় না। এ ঘুষের টাকার বেশির ভাগই লেনদেন করেন তার বিশ্বস্ত কর্মচারী লিখন চক্রবর্তী, জগবন্ধু ভৌমিক এবং নাসির। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার ড্রাইভার মোমেনও এসব ঘুষ লেনদেন করে থাকেন।
সরকারি স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক যুগান্তরকে জানান, ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালকের অনৈতিক আবদার না মানলেই বদলির শিকার হন শিক্ষকরা। ভর্তি বাণিজ্যে সায় না দেয়ায় তার নিষ্ঠুর আচরণের শিকার হয়েছেন সিলেট সরকারি পাইলট স্কুলের প্রধান শিক্ষক এ কে মজুমদার। তাকে বদলি করা হয় হবিগঞ্জের মাধবপুরের এক মফস্বল এলাকায়। তার স্থানে আনা হয় যিনি প্রধান শিক্ষক তো দূরের কথা, এত বড় স্কুলে কোনোদিন শিক্ষকতাও করেননি। শিক্ষক বদলিতে নানান ফন্দি-ফিকির করেন জাহাঙ্গীর। নিজের সুপারিশে কাজ না হলে জুড়ে দেন শিক্ষামন্ত্রীর সুপারিশ। সিলেট পাইলট স্কুলের প্রধান শিক্ষক এ কে মজুমদারকে বদলির ক্ষেত্রে তিনি এ কাজই করেন।
জাহাঙ্গীরের এমপিও বাণিজ্যের সর্বশেষ শিকার হন সিলেটের হাজী মোহাম্মদ সফিক হাই স্কুলের শিক্ষক শর্মিলা দাস। দুইবার প্রত্যাখ্যান হয়ে অবশেষে মহাপরিচালক বরাবর গত ১৯ জুলাই জাহাঙ্গীর কবিরের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ আনেন শর্মিলা দাসের বাবা গৌরাঙ্গ দাস। অভিযোগে তিনি বলেন, ‘হাজী মোহাম্মদ সফিক হাই স্কুলের এমপিওভুক্ত বাংলা শিক্ষকের মৃত্যুজনিত কারণে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যায়ন কর্তৃপক্ষের নিয়োগের সুপারিশের আলোকে আমার মেয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করে। তার এমপিওভুক্তির আবেদন প্রধান শিক্ষক চলতি বছরের ৬ এপ্রিল সুপারিশ করেন। এরপর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ১৭ এপ্রিল এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ২৫ এপ্রিল সুপারিশ করে আঞ্চলিক উপ-পরিচালক কার্যালয়ে পাঠান। কিন্তু উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর কবির অসৎ উদ্দেশ্যে ফাইল ফরোয়ার্ড না করে কালক্ষেপণ করছেন।’ অভিযোগে তিনি আরও বলেন, ‘স্কুলের এক শিক্ষকের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে উপ-পরিচালক তার মেয়ের ফাইলটি আটকে রেখেছেন।’
সিলেটের শিক্ষক নেতাদের মতে, জাহাঙ্গীর কবির একজন সুবিধাবাদী। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হয়ে উঠেন। জোট সরকারের আমলে শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুকের প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি। সে সময় কিশোরগঞ্জে ডিইও’র দায়িত্ব পালনকালে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের নানাভাবে হয়রানি করেন তিনি। এখন তিনি সিলেট নগরী এবং বিভাগের তিন জেলা সদরের বিদ্যালয়গুলোতে নানান কৌশলে বিএনপি-জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের রেখে অন্যদের মফস্বলে পাঠাচ্ছেন।
এটাই শেষ নয়, নানান কলঙ্কে ভরা জাহাঙ্গীরের চরিত্র। ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের এক সিনিয়র শিক্ষক যুগান্তরকে জানান, ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকা অবস্থায় ৭ম শ্রেণীর এক ছাত্রের মায়ের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়ান তিনি। পরে সেই ছাত্রের মাকে নিয়ে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় প্রথম স্ত্রী মামলা ঠুকে দিলে বেকায়দায় পড়েন জাহাঙ্গীর। পরে জেলা প্রশাসকের সুপারিশে তাকে ময়মনসিংহ থেকে বদলি করা হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই মোকাবেলা করছি। মহাপরিচালক বরাবরও অনেক অভিযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সবই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।’ এমপিওভুক্তি ও শিক্ষকদের বদলি বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার অফিসে যা হয় তা নিয়ম মেনেই হয়। কোনো অনিয়ম দুর্নীতি করলে শিক্ষামন্ত্রীর সুনজরে থাকতাম না।’
ময়মনসিংহে শিক্ষক হিসেবে চাকরিকালীন এক ছাত্রের মায়ের সঙ্গে পরকীয়া এবং পাঁচের অধিক বিয়ে সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সিলেটে যতদিন ধরে কাজ করছি একজন স্ত্রীই আছে।’
জাহাঙ্গীর কবির দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন এ সম্পর্কে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রফেসর ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘যদিও অধিদফতরের নিয়মে ৩ বছরের বেশি ভারপ্রাপ্ত পদে থাকার নিয়ম নেই, তারপরও তাকে রাখতে হচ্ছে। যোগ্য লোক না থাকায় তাকে বদলি করা যাচ্ছে না।’



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত