ইকবাল হাসান ফরিদ    |    
প্রকাশ : ২৪ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
মোবাইলে ছবি দেখেই সুরতহাল প্রতিবেদন
থানায় বসে লেখেন এসআই হরিচাঁদ
লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। আর সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী পরিদর্শক (এসআই) রাজধানীর শাহবাগ থানায়। হাসপাতালে যাননি তিনি, লাশও আনা হয়নি। দেখেননি তা। কিন্তু দুই কিলোমিটার দূরে বসেই তিনি তৈরি করে ফেললেন সুরতহাল প্রতিবেদন। কীভাবে? নিহতের স্বজনের মুঠোফোনে তোলা ছবিই যে তার জন্য যথেষ্ট!
না, এটি কোনো গল্প নয়। নয় কোনো সিনেমার চরিত্রও। ঘটনা বাস্তবেরই। আর শাহবাগ থানার ওই এসআইয়ের নাম হরিচাঁদ হাজরা। সংশ্লিষ্টরা জানান, এভাবেই প্রতিনিয়ত সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন তিনি। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী স্বজনদের কাছে স্তান্তর করা হয় লাশ। ময়নাতদন্তের জন্য ওই প্রতিবেদন যেমন চিকিৎসকের কাছে যায়, তেমনি বিচার কাজে ব্যবহারে তা চলে যায় আদালতেও।
এ নিয়ে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করলে তারা বিস্ময় প্রকাশ করেন। তার থানারই ওসি আবুল হাসানও বিস্মিত। আবুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, মোবাইল ফোনে ছবি তুলে থানায় বসে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির নিয়ম পৃথিবীর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অন্যান্য থানার চেয়ে শাহবাগ থানা এলাকায় অপরাধের মাত্রা অনেকটাই কম। খুন-ধর্ষণ তেমন একটা ঘটে না বললেই চলে। কম ঘটে অস্বাভাবিক মৃত্যু। তবে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করতে হয় একটু বেশিই। কারণ শাহবাগ থানা এলাকায় অবস্থিত ঢামেক হাসপাতাল। এটি দেশের মানুষের চিকিৎসাসেবার শেষ ভরসাস্থল। সারা দেশ থেকেই এখানে রোগী আসেন। বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনায় আহত মানুষজন প্রায় প্রতিদিনই এখানে কমবেশি মারা যান। এসব মৃতদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করতে হয় পুলিশকে। শাহবাগ থানার যখন যে এসআই দায়িত্বে থাকেন- তিনি তৈরি করেন এ প্রতিবেদন। ময়নাতদন্ত, লাশ হস্তান্তর- পরবর্তী সবকিছুই হয় সে অনুযায়ী। আর সেখানেই হরিচাঁদ হাজরা ব্যতিক্রম।
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার চরনিমতলার আবদুল হামিদ বেপারির ছেলে হাবিব মিয়া (৫২) টঙ্গিবাড়ী এলাকায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। কাজ করতে গিয়ে তিনি গুরুতর আহত হন। ৩ জুলাই তাকে ভর্তি করা হয় ঢামেক হাসপাতালে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ জুলাই মারা যান হাবিব মিয়া। ওইদিন এলাকার মাতবর ঢাকা মেডিকেল কলেজ নার্সিং হোস্টেল সুপার ইলিয়াস মোল্লা তাদের বিনা ময়নাতদন্তে লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রভাবিত করেন। বিনা ময়নাতদন্তে লাশ নিলেও এর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করতে হয় পুলিশকে। ওইদিন হাবিব মিয়ার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব বর্তায় শাহবাগ থানার এসআই হরিচাঁদ হাজরার ওপর।
হাবিব মিয়ার স্বজনরা থানায় এসে যোগাযোগ করেন হরিচাঁদের সঙ্গে। হরিচাঁদ তাদের নির্দেশ দেন, মোবাইল ফোনে ছবি তুলে থানায় আসতে। এরপর ঢামেক মর্গে হাবিব মিয়ার মেয়ের জামাই শরিফ মৃতদেহের বিভিন্ন অংশের ছবি তুলেন। তাকে সহযোগিতা করেন মর্গের এক কর্মচারী। এ সময় লাশের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন নার্সিং হোস্টেল সুপার ইলিয়াস মোল্লা, হাবিব মিয়ার স্ত্রী মাসুদা বেগম এবং বড় ভাই নাসির মিয়া। ওই ছবি থানায় নিয়ে এলে হরিচাঁদ হাজরা ছবি দেখে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। পরে বিনা ময়নাতদন্তে হাবিব মিয়ার লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, শুধু হাবিব মিয়ার লাশ নয়, হরিচাঁদ হাজরা যত সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন, তা এভাবেই করেন। লাশ দেখে নয়।
যোগাযোগ করা হলে নাসির মিয়া যুগান্তরকে বলেন, এসআই হরিচাঁদ হাজরা লাশের ছবি তুলে থানায় নিয়ে যেতে বলেছেন। এরপর শরিফ মোবাইল ফোনে ছবি তুলেছে। ওই ছবি দেখে হরিচাঁদ হাজরা হাবিব মিয়ার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। তিনি বলেন, বিনা ময়নাতদন্তে লাশ নিতেও তাদের খরচ হয়েছে ৮ হাজার টাকা। ঘাটে ঘাটে টাকা দিয়েই এ লাশ নিতে হয়েছে। বিনা ময়নাতদন্তে লাশ নিলেন কেন? এমন প্রশ্নে নাসির মিয়া বলেন, ইলিয়াস মোল্লা বলেছেন, তিনি এখানে চাকরি করেন, এ লাশের ময়নাতদন্ত করা হলে তার মান-সম্মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এজন্য তার সম্মান রক্ষার্থে আমরা বিনা ময়নাতদন্তে লাশ নিয়ে গেছি।
এ ব্যাপারে এসআই হরিচাঁদ হাজরার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বিষয়টি অস্বীকারের চেষ্টা করেন। যুগান্তরের কাছে এর অকাট্য প্রমাণ আছে- এ কথা জানানোর পর অনেকটা চুপসে যান। কোনো সদুত্তর না দিয়ে সংবাদটি যাতে গণমাধ্যমে না আসে, সে বিষয়ে বিভিন্ন লোককে দিয়ে তদবির করান। আর ইলিয়াস মোল্লা হাবিব মিয়ার পরিবারকে বিনা ময়নাতদন্তে লাশ নেয়ার বিষয়ে প্রভাবিত করার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এভাবে অনেক সুরতহাল রিপোর্টই পুলিশ নিয়মবহির্ভূতভাবে তৈরি করে। আবার কখনও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেও সুরতহাল প্রতিবেদন লেখা হয়। যাতে ঘটনা ভিন্ন খাতে চলে যাওয়ার কিংবা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আবার পুলিশের গাফিলতির কারণে কোনো কোনো সুরতহাল প্রতিবেদন পরবর্তী সময়ে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে কোনো হত্যার ঘটনাকে আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা বা অপমৃত্যু বলে চালিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টায় এ ধরনের সুরতহাল প্রতিবেদন ব্যবহার করা হয়।
শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, মৃতদেহ স্বচক্ষে দেখেই সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করার নিয়ম। ছবি দেখে মৃতদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির কোনো নিয়ম নেই পুলিশের। তিনি বলেন, কেউ যদি এ ধরনের অনিয়ম করে থাকে, তবে তা খতিয়ে দেখে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নেতিবাচক প্রভাব : ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের এক সূত্র জানায়, এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ সুরতহাল প্রতিবেদন ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একজন চিকিৎসক প্রাথমিক তথ্য জানতে পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদন দেখেন। সুরতহাল প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসক তার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেন। এতে মামলা পরিচালনার সময় বিপাকে পড়েন বাদী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আসামিরাও পার পেয়ে যায়।
আইনে কী আছে : সুরতহাল সম্পর্কে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অথবা এ সম্পর্কে ক্ষমতাবান কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি সংবাদ পান যে, কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে অথবা অপর কোনো ব্যক্তি বা প্রাণী কর্তৃক বা কোনো যন্ত্রের আঘাতে কেউ মারা গেছে, যার ফলে যুক্তিসংগতভাবে সন্দেহ করা যেতে পারে যে, অপর কোনো ব্যক্তি কোনো অপরাধ সংঘটন করেছে, সেক্ষেত্রে অবিলম্বে সুরতহাল তদন্তের জন্য ক্ষমতাবান নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটকে এ ব্যাপারে জানাবেন এবং পুলিশ কর্মকর্তা নিজে সেখানে যাবেন এবং লাশের সুরতহাল প্রণয়ন করবেন। মৃত ব্যক্তির দেহে ক্ষত, ভাঙা বা মচকে যাওয়ার দাগ, আঁচড়ের দাগ ও অন্যান্য আঘাতের চিহ্ন বর্ণনা করে এবং যেভাবে ওই চিহ্নের সৃষ্টি হয়েছে, তা উল্লেখ করে আপাতদৃষ্টিতে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদন করবেন এবং এলাকার সম্ভ্রান্ত দুই ব্যক্তির উপস্থিতিতে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রস্তুত করবেন।’
অন্যদিকে ১৭৬ ধারা অনুসারে পুলিশের হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে সুরতহাল করার ক্ষমতাসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট তা পরিচালনা করবেন। ম্যাজিস্ট্রেট মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের জন্য লাশ কবর থেকে উঠিয়ে পরীক্ষা করাতে পারেন। আইন অনুযায়ী সুরতহাল প্রতিবেদনে লাশের পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিভিন্ন দিকের বর্ণনা থাকতে হয়। শরীরের কোন অঙ্গটি কীভাবে পাওয়া গেছে, কোনো আঘাত বা দাগের চিহ্ন আছে কিনা- এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হয়।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত