যুগান্তর রিপোর্ট    |    
প্রকাশ : ২৬ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
দিনাজপুরে লিচু খেয়ে ১৩ শিশুর মৃত্যু
দায়ী নিষিদ্ধ কীটনাশক
গবেষণা প্রতিবেদন : দাঁত দিয়ে কামড়ানোর কারণে খোসা থেকে বিষ পেটে প্রবেশ করে * ৮০ দেশে এই কীটনাশক নিষিদ্ধ
নিষিদ্ধ কীটনাশকের বিষক্রিয়ার কারণে ২০১২ সালে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর জেলার একটি গ্রামীণ জনপদে ১৩টি শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। কীটনাশক মিশ্রিত লিচু খাওয়ার পর ওই শিশুরা ‘অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিনড্রোমে (এইএস) আক্রান্ত হয়েছিল, ফলে তাদের মস্তিষ্কে প্রদাহ তৈরি হয়। ২৪ জুলাই ‘অ্যামেরিকান জার্নাল অব ট্রুপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিনে’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যে সময় শিশুদের মৃত্যু হয় সে সময় চাষীরা তাদের ক্ষেতে ‘এনডোসালফান’ নামের অত্যন্ত বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করেছিল। যে কীটনাশকটি বিশ্বের ৮০টি দেশে নিষিদ্ধ। লচু ফলগুলোয় ওই কীটনাশক বিষ মিশে গিয়েছিল যা খাওয়ার কারণে ২০ ঘণ্টার মধ্যে তার প্রতিক্রিয়ায় মস্তিষ্কে প্রদাহ শুরু হয় ও শিশুদের মৃত্যু ঘটে। ২০১২ সালের ৩১ মে থেকে ৩০ জুনের মধ্যে দিনাজপুরে ১ থেকে ১২ বছর বয়সী ১৪ শিশু লিচু খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর মধ্যে ১৩ শিশু মারা যায়। এক শিশু বেঁচে থাকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, লিচু খাওয়ার পর শিশুমৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ঘটেছিল। তবে ভারতের ঘটনা উদ্ধৃত করে ‘দ্য ল্যানচেটে’ প্রকাশিত জার্নালে বলা হয়েছিল যে, লিচুফলের মধ্যেই থাকা একটি রাসায়নিকের কারণে এমনটা ঘটেছে। শিশু খালি পেটে লিচু খেলে এই রাসায়নিকের প্রতিক্রিয়ায় মৃত্যু ঘটতে পারে। কিন্তু নতুন এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে লিচু খাওয়ার পর যে শিশুদের মৃত্যু হয়েছ তার কারণ শুধু এই ফলটি নয়। শিুশুরা ফলের ভেতরের রাসায়নিকের জন্য মারা যায়নি। কৃষি কাজে উচ্চমাত্রার বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে।
গবেষণায় প্রধান গবেষক হিসেবে ছিলেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সহযোগী বিজ্ঞানী এম সাইফুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন মহাখালী রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) গবেষকরাও। বিজ্ঞানী সাইফুল ইসলামই প্রতিবেদনটি তৈরি করেন।
প্রতিবেদনে তিনি বলেন, লিচুবাগানে বিষাক্ত কৃষি রাসায়নিক ও কীটনাশক দ্রব্যাদি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওই জমিতে ইনডোসালফান নামক উচ্চমাত্রার বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছিল বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যে ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল তারা সবাই লিচুবাগানের কাছে বাস করত। শিশুরা লিচুবাগানে খেলাধুলা করত ও গাছ থেকে পাকা লিচু ঝরে পড়লে সেগুলো কুড়িয়ে না ধুয়ে খেত। লিচুর ওপরের শক্ত আবরণ দাঁত দিয়ে কামড়ানোর ফলে বিষাক্ত কীটনাশক তাদের পেটে ঢুকত। আক্রান্ত শিশুদের প্রত্যেকেই শুরুর দিকে কান্নাকাটির পর জ্ঞান হারাত এবং আড়াই ঘণ্টা থেকে ২০ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
গবেষকরা স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে আলাপকালে লিচুবাগানে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক ব্যবহারের কথা জানতে পারেন। অথচ এ ধরনের কীটনাশক শুধু সুতায় ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে। কোনো ফলে বা খাদ্যদ্রব্যে নয়।
গবেষণায় দেখো গেছে, ২০০৯ সালে কার্বমেট জাতীয় কীটনাশকযুক্ত লিচু খাওয়ার ফলে এ অঞ্চলে আরও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। এমনকি ২০১৫ সালেও একই ঘটনায় ১২ শিশু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। যার মধ্যে ১১ জনের মৃত্যু ঘটে।
প্রসঙ্গত দিনাজপুরের পীরগঞ্জের বইরচুনা গ্রামে ২০১২ সালের ১৪ জুন প্রথমে একটি শিশু মারা যায়। আড়াই বছর বয়সী ওই শিশুর নাম ছিল তাপসী। সে ওইদিন বাগানে গিয়ে শিশুদের সঙ্গে খেলছিল এবং কুড়িয়ে লিচু খাচ্ছিল। হঠাৎ সে জ্ঞান হারায়। এরপর খিঁচুনি শুরু হয়। তাকে দিনাজপুর হাসপাতালে নেয়া হলে বিকাল ৫টার দিকে তাপসী মারা যায়। মারা যাওয়া অন্য শিশুরা হল- মহেশপুরের সোহাগের মেয়ে শায়লা (৬), রামনগরের রঞ্জন দাশের ছেলে রিপন দাশ (১০), বিরলের মাধববাটি গ্রামের বাবুল হোসেনের ছেলে বোরহান (২), রুনিয়া গ্রামের করিমুল ইসলামের ছেলে নূর কিবরিয়া (৪), কৃষ্ণপুরের মারকুসের ছেলে সাগর (৪), দিনাজপুর সদর উপজেলার সুন্দরবন ইউনিয়নের কাশির আহমেদের মেয়ে নার্গিস (৬), পারগাঁও গ্রামের হোপনা সরেনের ছেলে নয়ন (২), একবারপুর গ্রামের ধলা বাবুর ছেলে ধনঞ্জয় (৫), বড়ইল গ্রামের নিতীশ কুমারের মেয়ে সুবর্ণা (৫), চিরিরবন্দরের কিষানবাজার গ্রামের তাইবুর রহমানের মেয়ে তাসনিমা (১০) এবং খানসামা উপজেলার শাহজাহান আলীর ছেলে আজিজুল ইসলাম (৬)।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত