মুসতাক আহমদ    |    
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
ইইউর অর্থায়নে গবেষণা
ব্রহ্মপুত্র-যমুনায় বন্যা বৃদ্ধির প্রবণতা ১০ শতাংশ
জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণতা বাড়ার কারণেই এমন পরিস্থিতির আশঙ্কা

ছয় বছর ধরে ব্রহ্মপুত্র-যমুনায় বাড়াতে শুরু করেছে বন্যাপ্রবণতা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই সৃষ্টি হয়েছে এমন পরিস্থিতির। ২০৪০ সাল নাগাদ এ প্রবণতা বৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে পৌঁছাবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অর্থায়নে ‘হাই অ্যান্ড ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড এক্সট্রিমস’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলামসহ বিভিন্ন দেশের ৬ জন গবেষক এ গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেন। আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স প্রবন্ধটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে।

প্রবন্ধে বলা হয়, ২০১১ সালে বন্যা বৃদ্ধির প্রবণতা শুরু হয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণে উষ্ণতা বেড়েছে। এতে পরিবর্তন হয়েছে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধারা ও গতিপ্রকৃতি। তুলনামূলকভাবে অতিরিক্ত বরফ গলছে হিমালয়ে। হচ্ছে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল। সেই পানি প্রবাহিত হচ্ছে পৃথিবীর এই চতুর্থ দীর্ঘ নদে। অতিরিক্ত পানির ফলেই বাংলাদেশে বন্যার প্রকোপ বেড়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর চিরাচরিত ধারা পরিবর্তন হয়ে গেছে। এর কারণে যখন বন্যা হওয়ার কথা নয়, তখন হচ্ছে। অনাবৃষ্টি-অতিবৃষ্টি একেবারেই স্বাভাবিক হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে নদনদীতে পানির উৎস হিমালয় পর্বতমালার বিভিন্ন অংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের বরফ গলা পানি এবং অতি ভারি বৃষ্টির পানি ভাটির দেশ হিসেবে ধেয়ে আসবে বাংলাদেশে। সেই পানির পরিমাণ কতটুকু হবে, সেটাই আমরা গবেষণায় বের করার চেষ্টা করেছি।’

অধ্যাপক ইসলাম আরও বলেন, ‘গবেষণায় আমরা দেখেছি, প্রাক-শিল্পযুগের (১৮৫১-১৮৮০) তুলনায় ২০৪০ সাল নাগাদ ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার ১০ শতাংশ পানিপ্রবাহ বাড়বে। হিমালয়ের বরফ গলা পানি, ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢল থেকে আসবে এ পানি। এটাই বন্যার সৃষ্টি করবে।’ তিনি বলেন, “আমরা এ গবেষণার নাম দিয়েছি ‘ফ্লাডস ইন দ্য ব্রহ্মপুত্র রিভার ব্যাসিন অব হ্যাভিং হানড্রেড ইয়ার রিটার্ন পিরিয়ডস’ (শতবছরের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ফিরতি বন্যা)। এতে আরও দেখা গেছে, ২০৪১-২০৭০ সালের মধ্যে ব্রহ্মপুত্রে বন্যাপ্রবণতা বাড়বে ১৭ শতাংশ, ২০৭১-২১০০ সাল নাগাদ বাড়বে ২৪ শতাংশ।’

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাইফুল হোসেন মঙ্গলবার বলেন, বাংলাদেশে মিঠা পানির প্রধান উৎস তিন নদী অববাহিকা। দেশে যে পরিমাণ পানি বাইরের উৎস থেকে পাওয়া যায়, তার ৬০-৭০ শতাংশই আসে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা হয়ে। বাকি পানির উৎস গঙ্গা, পদ্মা ও মেঘনা অববাহিকা। বর্তমানে শুধু ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার পানির কারণে দেশে বন্যা চলছে।

বুয়েটের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম জানান, দেশে সার্বিকভাবে বন্যা পরিস্থিতি ভবিষ্যতে কেমন হতে পারে, সেই আগ্রহ থেকে আলাদাভাবে অপর দুই অববাহিকার ওপরও তিনি গবেষণা করেছেন। এতে দেখা যাচ্ছে, প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় শতবর্ষের মধ্যে গঙ্গা-পদ্মায় ১৪ শতাংশ এবং মেঘনা অববাহিকায় ২১ শতাংশ পানি বেশি আসবে। ফলে সার্বিকভাবে দেশে পানিপ্রবাহ বর্তমানের চেয়ে গড়ে ১৫ শতাংশ বাড়বে।

বাংলাদেশে তিন শতাধিক নদ-নদী আছে। এর মধ্যে ৫৭টি এসেছে দেশের বাইরে থেকে, যার ৫৪টির উৎসই ভারতে। মেঘনা অববাহিকা ভারতের মেঘালয়, আসাম, মনিপুর, ত্রিপুরা অঞ্চলের ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের পানি বহন করে। যার বেশিরভাগ বোরাক নদী হয়ে সুরমা-কুশিয়ারার মধ্য দিয়ে মেঘনায় আসে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার অঞ্চল হিসেবে চীন, ভারত, ভুটান ও বাংলাদেশ আছে। সিকিম থেকে আসা তিস্তার পানিও ব্রহ্মপুত্রে যুক্ত হয়। গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পশ্চিমবঙ্গ-বিহারসহ ওই এলাকার পানি প্রবাহিত হয়।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানান, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল হিসেবে এশিয়ায় বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়া ব্যবস্থা ভিন্ন ধরনের। শুষ্ক মৌসুমে প্রশান্ত মহাসাগরের আবহাওয়ার বিশেষ পরিস্থিতি ‘এলনিনো’ গোটা বিশ্বকে পাগলা হাতির মতো নাচিয়ে তোলে। এর প্রভাব পড়ে বঙ্গোপসাগরে। সেখানে সৃষ্টি হয় ঘূর্ণিঝড়। মেঘমালা তৈরি, বাতাসের গতিবিধি ইত্যাদিতে প্রভাব পড়ে। বাতাস ও মেঘমালার গতিমুখ থাকে ভারতের মেঘালয়, আসাম ও ত্রিপুরার দিকে। তাই ওইসব অঞ্চলে আগাম বন্যা, পাহাড়ি ঢল ইত্যাদি হলে তা বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলকেও আক্রান্ত করে। প্রতিবছর জুন-জুলাইয়ে এটা হওয়ার কথা থাকলেও কখনও আগাম হয়ে যায়। এ বছর এপ্রিলেই আকস্মিক বন্যায় ভেসে যায় সিলেটের হাওরাঞ্চল। মানুষের শুধু ফসলই নয়, মাছসহ জলজপ্রাণী ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন জানান, এ আকস্মিক বন্যার দীর্ঘমেয়াদি কোনো পূর্বাভাস দেয়া যায় কিনা, সে ব্যাপারে বুয়েটের সঙ্গে গবেষণা চলছে। এখন তিন দিন আগে পূর্বাভাস দেয়া যায়। এটি ৫ দিনে উন্নীত করা যায় কিনা, সেই প্রচেষ্টা চলছে।

বন্যা ও পানি বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বা সিলেট এলাকার পানি প্রবাহিত হয় মেঘনায়। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে এসে মিলেছে পদ্মায়। অপরদিকে ভারতের গঙ্গাই বাংলাদেশে পদ্মা নামধারণ করেছে। এটি গোয়ালন্দে যমুনাকে একীভূত করে চাঁদপুরে গিয়ে মিলেছে মেঘনায়। আর যমুনা ও পদ্মার পানি বঙ্গোপসাগরে বয়ে নিয়ে যায় মেঘনা।

বুয়েটের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকায় বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং কৃষির ওপর কী পরিমাণ প্রভাব পড়বে, তা বের করার লক্ষ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে গবেষণা করাচ্ছে। বাংলাদেশে বুয়েট করছে এ গবেষণা। এছাড়া ভারতের একটি, আফ্রিকার একটি এবং ইউরোপের আরও ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাকর্ম চালাচ্ছে। আমাদের গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে লবণাক্ততা এবং কৃষির ওপর নেতিবাচক প্রভাবের সম্ভাব্য ফলাফলও বেরিয়ে এসেছে।

ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানিপ্রবাহের ওপর গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, পানিপ্রবাহের এ পরিমাণ নিরূপণে কার্বন নিঃসরণের প্রবণতা, ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় উপজীব্য করা হয়েছে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের সংস্থা আইপিসিসি (জলবায়ুবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল) পঞ্চম প্রতিবেদন এবং কার্বন নিঃসরণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বিষয়ে আরসিপি আট দশমিক পাঁচ (রিপ্রেজেন্টেশন কনসেনট্রেশন পাথওয়ে) সামনে রাখা হয়েছে। যদি কার্বন নিঃসরণ কমানো হয় এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রিত থাকে, তাহলে বন্যাপ্রবণতার এ ভবিষ্যদ্বাণী ভিন্ন হবে।

গবেষণায় ভবিষ্যতের ভয়াবহ এ বন্যা থেকে দেশ ও মানুষকে রক্ষা করতে বেশকিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উচ্চ ঝুঁকি মোকাবেলায় সমন্বিতভাবে বৈশ্বিকভাবেই কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিকভাবে অভিযোজন পদক্ষেপ নিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে মানুষকে রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে নদীর নাব্য বৃদ্ধি, নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ, মানুষের বিকল্প জীবনজীবিকার পথ সৃষ্টিসহ নানা পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুধু বন্যাই নয়, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, বজ পাতসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এ বছর ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ আঘাত হেনেছে। গতবছর হয়ে গেল ‘রোয়ানু’। ২০০৭ সালের পর মাত্র ১০ বছরে ‘মহাসেন’, ‘আইলা’, ‘সিডর’ আরও বেশকিছু ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। পাহাড় ধসের মতো বৃষ্টিপাতও হচ্ছে বর্তমানে। বজ পাত বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ পাতের দেশ বাংলাদেশ। টর্নেডোর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে বড়টি বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে।




 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত