তোহুর আহমদ    |    
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
প্রভাবশালীরা প্রতারকদের সঙ্গে হতভাগ্যদের পাশে নেই কেউ
‘স্বামী মররে যাবার পর ছোট মাইয়ে শারমিনরে নিয়ে বিপদে পড়ি যাই। বাদ্য হয়ি মায়েডা আমার পড়া ছাড়ে দিই বিমা কুম্পানির চাকরি নেলো। সিহানতে যা পাতো তার থিকিন কিছু টাহা জমায় জমায় পঞ্চাশ হাজারের মতো অয়। তার সাথে বাড়ির কিছু জিনিসপত্তর বেইচে এক লাখ টাকা তাগেরে দিছলো। হায়রে, সেই টাহার লাভ পড়ে থাহুক আসলই ফিরত দিলো না। আমার মায়েডা শেষ পর্যন্ত টাকার শোয়ে ভুগে ভুগে মররে গেলো।’
যশোর-মাগুরা অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় এভাবে এহসান সোসাইটির বিরুদ্ধে মনের ক্ষোভ আর হাহাকার প্রতিবেদকের কাছে প্রকাশ করেন জেলা সদরের পুখুরিয়া গ্রামের মীর মোতালেব আলির স্ত্রী হোসনে আরা। তিনি জানান, এক লাখ টাকায় বছরে ১৬ হাজার টাকা লাভ পাওয়া যাবে- এমন আশ্বাস দেন এহসান সোসাইটির কর্মকর্তারা। গরিবের সংসারে বছর শেষে অতিরিক্ত টাকাটা কাজে লাগবে, এমন আশায় শারমিন সেখানে ১ লাখ টাকা রাখেন। কিন্তু লাভ তো দূরের কথা আসল টাকাই আর ফেরত পাওয়া যায়নি। বৃদ্ধ হোসনে আরা বলেন, খেয়ে না-খেয়ে প্রায় ১ বছর ঘুরে ঘুরে মেয়েটা অসুস্থ হয়ে ২০১৫ সালের শেষ দিকে মারা যায়। তবে এমন অমানবিকতার গল্প শুধু হোসনে আরা বেগমের একার নয়, সারা দেশে এহসান সোসাইটির প্রায় আড়াই লাখ গ্রাহকের ঘরে ঘরে আছে এমন দুঃখগাথা। হাজারও গ্রাহক সর্বস্বান্ত হয়ে পথে পথে ঘুরছেন। অথচ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া মুখোশধারী প্রতারকদের কিছুই হয়নি। তারা আছে বহাল তবিয়তে। অনেকে রাজধানীর বুকে প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায়। বেশ কয়েকজন শীর্ষ প্রতারকের বিরুদ্ধে একাধিক গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে পুলিশ যেন নীরব দর্শকের ভূমিকা বেছে নিয়েছে। ভুক্তভোগীদের অনেকেই বলেছেন, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তথা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আন্তরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই তারা এ ব্যাপারে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিশন গঠনেরও দাবি জানান।
শীর্ষ প্রতারক যারা : এহসান সোসাইটির প্রতারণার কারিগরদের অনেকে ঢাকায়ই থাকেন। কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রবিউল ইসলামের বাড়ি মাগুরা জেলায়। তিনি এখন স্থায়ীভাবে ঢাকায়ই থাকেন। তার সঙ্গে প্রভাবশালী লোকজনের উঠাবসা আছে। এহসান সোসাইটির প্রধান কার্যালয় ছিল রাজধানীর উত্তরায় (বাড়ি # ৩৯, রোড # ৭/ডি, সেক্টর # ৯, রোজ গার্ডেন ২য় তলা)। প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত একটি ফ্ল্যাট এখন রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দখলে। এ ছাড়া বারিধারা আমেরিকান অ্যাম্বাসির সামনে জামালপুর টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় আরেকটি ফ্ল্যাটে এহসান সোসাইটির কার্যক্রম ছিল। ওই ফ্ল্যাটটি ক্যামব্রিয়ান কলেজের কাছে ভাড়া দেয়া হয়েছে। এ দুটি ফ্ল্যাট ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় এহসান সোসাইটির বিপুল পরিমাণ ভূ-সম্পত্তি আছে। এহসান সোসাইটির এসব ধন-সম্পদ এখন কাজী রবিউল ইসলামই দেখাশোনা করছেন। তার সঙ্গে আছেন রাজধানীর মিরপুর এলাকার একজন সংসদ সদস্যের লোকজন।
এহসান সোসাইটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুফতি জুনায়েদ আলী ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মাওলানা ইমরান হোসেনের গ্রামের বাড়িও মাগুরা জেলা সদরের শিমুলিয়া গ্রামে। ইমরান হোসেন মুফতি জুনায়েদের চাচাতো ভাই। এ দু’জন এহসান সোসাইটির অন্তত ৭০ কোটি টাকা লোপাট করে গা ঢাকা দেন। অথচ জুনায়েদ ও ইমরানকে এলাকার মানুষ ধর্মভীরু আর সজ্জন হিসেবেই জানতেন। এহসান সোসাইটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জুনায়েদ আলীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এরপর থেকেই তিনি পলাতক আছেন।
এহসান সোসাইটির আইন শাখার পরিচালক ছিলেন অ্যাডভোকেট কাজি মিনহাজ। অর্থ আত্মসাতের একাধিক মামলায় তিনি আসামি। বর্তমানে তিনি এলাকায় প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলেও অজ্ঞাত কারণে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে না। এ নিয়ে মাগুরা জেলার এহসান সোসাইটির প্রতারিত গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
কোম্পানির শরিয়াহ বিভাগের প্রধান ছিলেন মুফতি আমিনুল হক। তার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা জেলায়। এহসান সোসাইটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও এখন প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বেশ কয়েক বছর আগে তিনি টঙ্গী ২৭ নম্বর এলাকায় এহসান সোসাইটির জমিতে বাড়ি করেন। সেখানেই এখন তিনি সপরিবারে বসবাস করেন।
এহসান সোসাইটির পরিচালনা পর্ষদের আরেক কর্মকর্তার নাম মাওলানা আবু তাহের নদভী। তিনি চট্টগ্রামের একটি মাদ্রাসার তিন নম্বর হুজুর। টাকা আত্মসাৎ করে বেশিরভাগ কর্মকর্তা পালিয়ে যাওয়ার পর আবু তাহের নদভী অভিনব কৌশলে পুলিশের চোখ ফাঁকি দেন। পুলিশের কাছে তিনি বলেন, এহসান সোসাইটির কুমতলব জানতে পেরে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত স্বপদে বহাল ছিলেন। এখন তিনি বহাল তবিয়তে মাদ্রাসায় চাকরি করছেন। তার মোবাইল ফোনও খোলা। টাকা ফেরত চেয়ে গ্রাহকরা তার মোবাইলে ফোন করলে তিনি চরম দুর্ব্যবহার করেন। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন।
এহসান সোসাইটির সহসভাপতি ছিলেন একজন সাবেক আমলা। অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার এ কর্মকর্তার নাম মোতাহার হোসেন। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর প্রথমে তিনি বিশ্বব্যাংকে চাকরি নেন। পরে উচ্চ বেতনে তিনি এহসান সোসাইটির পরিচালক হিসেবে চাকরি নেন। কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই মোতাহার হোসেন লাপাত্তা। কেউ বলেন তিনি অসুস্থ। আবার কেউ কেউ বলেন তিনি বিপুল পরিমাণ টাকা-পয়সা নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছেন।
কোম্পানির অর্থ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন মইনুল হোসেন নামের এক ব্যক্তি। তার বিস্তারিত ঠিকানা পাওয়া না গেলেও তিনি যে ঢাকায়ই থাকেন তা নিশ্চিত হওয়া গেছে। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও খোলা। মইনুল হোসেন এখন পুরান ঢাকায় সিএনজি পার্টসের ব্যবসা করেন। যুগান্তরের পক্ষ থেকে বক্তব্য জানার জন্য মইনুল হোসেনের মোবাইল নম্বরে ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করলেও সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর লাইন কেটে দেন। পরে বক্তব্য চেয়ে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।
গ্রাহকদের অভিযোগ- খুলনা শহরের জনৈক মুফতি এহসান সোসাইটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। অন্য পরিচালকদের মতো তিনিও বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করে কিছুদিন পালিয়ে ছিলেন। এখন খুলনায় আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন তিনি। সেখানে তার নিজস্ব মাদ্রাসাও আছে।
এহসান সোসাইটির বিভিন্ন শাখা ম্যানেজারও বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যান। এদের মধ্যে যশোর শাখার ম্যানেজার মুফতি আতাউল্লাহ অন্যতম। আতাউল্লাহ বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করে পরিবারসহ দীর্ঘদিন ধরে পলাতক। সংস্থার টাকা হাতিয়ে নেন মাগুরা শাখা ম্যানেজার সেলিম হোসেনও। পরে সংস্থার টাকায় নিজের নামে বিপুল পরিমাণ ভূসম্পদ কেনেন।
প্রতারিত গ্রাহকদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, স্থানীয় ইছাখাদা মৌজায় একটি বিশাল জায়গা, মির্জাপুর মৌজায় ৫২ শতকের লিচুবাগান ও ছোট ব্রিজ এলাকায় কাশিনাথপুর মৌজায় ৫০ শতকের বেশি জমি কেনেন সেলিম। এ ছাড়া প্রায় ৬০ লাখ টাকায় জায়গাসহ একটি ডেকোরেটর কিনে সম্প্রতি তিনি ব্যবসা জমিয়ে বসেছেন।
প্রতারিত গ্রাহকরা সম্প্রতি এহসান সোসাইটির ১৮ কর্মকর্তাকে ধরিয়ে দিতে তাদের ছবিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার লাগান। এরা হলেন : প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুফতি মাওলানা জুনায়েদ আলী, প্যানেল ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুফতি ইউনুস আলী ও মুফতি আতাউল্লাহ, পরিচালক মাওলানা আইয়ুব আলী, মাওলানা মনিরুজ্জামান, মাওলানা আবদুল হালিম, মাওলানা মিজানুর রহমান, শামসুল হক টিটু, কাজী রবিউল ইসলাম, আবু তাহের নদভী, মুফতি আজিজুল ইসলাম, মুফতি গোলাম রহমান, মুফতি আবদুল মতিন, মাওলানা মঈনুল ইসলাম, আমিনুল হক, মুফতি কালিমুল্লাহ, বাবর আলী, সেলিম-উল আজম, আবদুল হক, মুফতি ফোরকান, মুহুরি সিরাজ, মুফতি মোকছেদ, মুফতি সামছুল হুদা, অধ্যক্ষ সামসুর রহমান ও মুফতি ইব্রাহিম।
যেভাবে গজিয়ে ওঠে : এহসান সোসাইটির কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৩ সালের ২৫ মার্চ। মাগুরা কৃষি ব্যাংকের কর্মচারী কাজী রবিউল ইসলাম সেবামূলক কার্যক্রমের কথা বলে আল এহসান নামের একটি সংস্থার নিবন্ধন নেন। পরে আল এহসানের নাম বদলে এহসান সোসাইটি করা হয়। শুরুর দিকে মাগুরা এলাকাকে ভিক্ষুকমুক্ত করতে নানা সেবাধর্মী উদ্যোগ নেন তারা। কার্যক্রম শুরুর দু’বছরের মাথায় এহসান সোসাইটি অবৈধভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে।
সূত্র জানায়, এহসান সোসাইটি গ্রাহক ও আমানত সংগ্রহে মসজিদভিত্তিক কার্যক্রম চালাতে শুরু করে। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুভূতি কাজে লাগিয়ে ইমামদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়। মাত্র ১০ টাকায় সদস্যপদ, কিস্তিতে মোটরসাইকেল, মাসিক মাত্র ১০০ টাকা কিস্তিতে মোবাইল ফোন, ৮ বছর মেয়াদি জামানতের বিপরীতে দ্বিগুণ মুনাফা, হজ প্রকল্প এমনকি মাসিক সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ মুনাফার প্রলোভনে হাজার কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করা হয়। এভাবে এহসান সোসাইটি দেশের ৫৬ জেলায় তাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এহসান সোসাইটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোট ১৮২টি শাখা পরিচালনা করে। এসব শাখায় নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার। এ ছাড়া ১০-৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে গ্রাহক নিবন্ধন পক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন আরও লক্ষাধিক মানুষ। সব মিলিয়ে এহসান সোসাইটির গ্রাহক ছিল প্রায় আড়াই লাখ। (রিপোর্টটি তৈরিতে সহায়তা করেন যুগান্তরের মাগুরা জেলা প্রতিনিধি আবু বাসার আখন্দ।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত