যুগান্তর রিপোর্ট    |    
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
অধরা অপহরণকারীরা
জড়িতদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে -স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
অপহরণ ও গুমের সঙ্গে জড়িতরা অধরাই থাকছে। একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটছে কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত বা গ্রেফতার করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রহস্যজনক নিখোঁজের পর অনেকে ফিরে এলেও কোনো কূলকিনারা হচ্ছে না। অপহরণের শিকার ব্যক্তিরা ফিরে এসে মুখ খুলছেন না।
গত শুক্রবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দাবি করেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণেই ‘নিখোঁজ’ ব্যক্তিরা ফিরে আসছেন।’ খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ দাবির পর প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশের তৎপরতার কারণে নিখোঁজরা ফিরছে অথচ অপহরণকারী বা গুমের সঙ্গে জড়িত চক্র গ্রেফতার হচ্ছে না কেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কেন এ চক্রের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের মুখোশ খুলে দিচ্ছে না। চক্রের সঙ্গে কে বা কারা জড়িত তা বলছে না পুলিশ। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কি আসলেই জানে যে কে বা কারা অপহরণ করছে। অপহরণের শিকার ব্যক্তিকে কোথায় নেয়া হচ্ছে। কিভাবে তিনি ফিরে এলেন। এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর মিলছে না। সব মিলে অপহরণ, গুম ঘিরে রহস্য তৈরি হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রহস্য উন্মোচন না করায় গুম বা অপহরণ ভীতি ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, অপহরণ ও গুমের ঘটনার দায় সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এড়াতে পারে না। গুম ও অপহরণের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না বলে এসব বন্ধ হচ্ছে না।
এ বিষয়ে শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান যুগান্তরকে বলেন, যারা রহস্যজনক নিখোঁজ হচ্ছে তারা তো কিছু বলছেন না। ফিরে আসার পর তারা যদি কিছু না বলেন তবে অপহরণের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফিরে আসা ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত চার মাসে নিখোঁজ হয়েছেন ১৫ জন। তাদের মধ্যে পাঁচজন ফিরেছেন, তিনজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। দেড় মাস রহস্যজনক নিখোঁজ থাকার পর বৃহস্পতিবার ফিরেছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান সিজার। প্রায় আড়াই মাস নিখোঁজ থাকার পর মঙ্গলবার ফিরেছেন সাংবাদিক উৎপল দাস। প্রায় চার মাস নিখোঁজ থাকার পর শুক্রবার রাতে কল্যাণ পার্টির মহাসচিব আমিনুর রহমানকে রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে গ্রেফতার দেখিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বাকিদের কোনো হদিস নেই। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে কোনো ধারণা দিতে পারছে না।
এদিকে হংকংভিত্তিক এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন (এএইচআরসি) ও দেশীয় মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৯৫ জন নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁদের মধ্য থেকে ৫২ জনের লাশ পাওয়া গেছে। ফিরে এসেছেন ১৯৫ জন। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ১৪৮ জন।
সম্প্রতি যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অপহরণ ও গুমের বিষয়টি অত্যন্ত ভয়াবহ। যারা ভিন্নমত পোষণ করছেন, তাদের অপহরণ ও গুম করা হচ্ছে। এটা সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে পদদলিত করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সন্দেহ করা হলেও তারা এটা স্বীকার করছেন না। যারা ফিরে আসছেন তারা মুখ খুলছেন না। এখানে একটা রহস্য থেকেই যাচ্ছে। এ রহস্য উন্মোচনের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। তাদের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা ও বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করা। অপহরণ ও গুমের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল যুগান্তরকে বলেন, দেশে একের পর এক অপহরণ ও গুমের ঘটনা ঘটছে এটা খুবই আতঙ্কজনক। অনেক ঘটনার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শীরা বা স্বজনরা অভিযোগ করে, সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে কোনো ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে যায়। এটা একটা ট্রেন্ড। আরেকটা টেন্ড হল, নিখোঁজের পর হঠাৎ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কাউকে কাউকে গ্রেফতার দেখায়।
অপহরণ ও গুমের রহস্য উন্মোচনে সরকারি বাহিনী ব্যর্থ হচ্ছে জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, যদি কেউ নিজে আত্মগোপনে থাকে বা অন্য কেউ অপহরণ করে লুকিয়ে রাখে তবে সেটা উদ্ঘাটনের দায়িত্ব সরকারের। ৭/৮ বছর ধরে একটি ঘটনার ক্ষেত্রেও সরকার বলতে পারেনি ‘এই লোকটি’ গুম হয়েছে, এর সঙ্গে ‘ওই লোকটি’ জড়িত। যদি সরকার বলতে না পারে, ফিরে আসা ব্যক্তিরা ভয়ে কিছু না বলেন সাধারণ মানুষের অনেক কিছু ভাবার অধিকার আছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান যুগান্তরকে বলেন, যারা অপহরণের শিকার হচ্ছেন তিনি জানেন এটাই শেষ নয়। তিনি যে আবার নিখোঁজ হবেন না বা অন্য কোনো ধরনের বিপদের মুখোমুখি হবেন না এই নিশ্চয়তা এই মুহূর্তে নেই।
গত কয়েক বছরে নিখোঁজ অবস্থা থেকে ফিরেছেন এমন ১৫ জন ব্যক্তিকে নিয়ে গণমাধ্যম সরগরম ছিল। তাদের মধ্যে গত চারদিনে সাংবাদিক উৎপল দাস ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান সিজার ফিরে এসেছেন। শুক্রবার রাতে কল্যাণ পার্টির মহাসচিব আমিনুর রহমানকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার দেখিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন তানভীর আহমেদ। ২০১৬ সালের ১৬ মার্চ দিবাগত রাতে তিনি নিখোঁজ হন। পাঁচ দিন পর তাকে উদভ্রান্ত অবস্থায় বিমানবন্দর সড়কে হাঁটতে দেখে পুলিশ বাড়ি পৌঁছে দেয়।
আট বছরে গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একটা বড় অংশ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। চলতি বছরের ১১ জুলাই বিএনপি গুম হয়েছেন এমন নেতাকর্মীদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। দলটির নেতারা বলছেন, শুধু ঢাকা থেকে গুম হয়েছেন ২৫ নেতাকর্মী।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত