ফাহমিদা আলম    |    
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
মুখোশ মানবী

আমার বন্ধুমহল গিনেজ বুকে নাম উঠাতে পারছে না একটাই কারণে। খোঁচা মারায় গিনেজ বুক কোনো অ্যাওয়ার্ড দেয় না। দিলে এদের কেউ আটকাতে পারত না!

এদের খোঁচার নমুনা না দিলেই নয়। সাম্প্রতিক ঘটনাটার সূত্রপাত আমার সর্দি-কাশি নিয়ে। মুজতবা আলী সাহেবের মতো করে বললে, আমার ঠাণ্ডা এমনিতে ভালো হয় তিনশ’ পঁয়ষট্টি দিনে, আর ওষুধ খেলে সারতে লাগে মাত্র বারো মাস। সহজ কথায় আমার বারো মাস কাল ঠাণ্ডা। ডাক্তার সোজা বলে দিলেন, ধুলা-বালিতে যাওয়া যাবে না।

মরুভূমিতে কোনো কোনো স্থানে বালি নাও থাকতে পারে কিন্তু আমার জানা মতে, ঢাকা শহরে ধুলা-বালিবিহীন কোনো জায়গা নেই। ঢাকা শহরের নাম কবেই বদলে ‘বালি’ হয়ে যেত, নেহাৎ ওই নামে আগে থেকেই শহর আছে বলে হয়নি। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম, উপায় কী? তিনি প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে বললেন, মাস্ক পরেন।

খেয়াল করলাম, ঢাকা শহরের একশ’ ভাগ মানুষের মধ্যে একশ’ দশভাগ মানুষের মুখেই এখন এ জিনিস। আমিও এ দলে যোগ দিলাম।

খোঁচা শুরু হল বন্ধুমহলে।

: কী রে! রেজাল্ট খারাপ করেছিস বলে লজ্জায় মুখ দেখাচ্ছিস না?

: আরেহ নাহ, ও কোরিয়ান ড্রামা দেখে। ওইখানের কোনো ট্রেন্ড হবে নিশ্চিত।

: নিশ্চিত পাওনাদারের ভয়ে মাস্ক পরে আসছে।

আমি সাধারণত যা করি, তাই করলাম, এদের কথায় পাত্তা দিলাম না। আমি নিরুপায়। কোনো এক অদ্ভূত কারণে মাস্ক খুললেই হাঁচি শুরু হয়। যন্ত্রণায় বাসায়ও মাস্ক পরে বসে থাকি। অবস্থা এমন যে, আমি ধুলায় না গেলেও আমার হাঁচি হয়। হয়তো, আমার কোনো বন্ধু ধুলা-বালিময় রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে আমার মাস্ক ছাড়া ফেসবুক প্রোফাইল পিকচার দেখছে। তাতেও আমার হাঁচি শুরু হয়ে যায়! অবস্থা বেগতিক দেখে আমি ফেসবুকেও মাস্ক পরা ছবি দিয়ে দিলাম।

আমার জীবন হয়ে গেল মুখোশময়।

বন্ধুমহলে নতুন ডাকনাম হয়ে গেল ‘মুখোশ মানবী’! আমি এদের কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে জীবনমুখী দর্শন ঝাড়ি, আমরা সবাই তো মুখোশের আড়ালে থাকি। কারোটা প্রত্যক্ষ করতে পারি, কারোটা পারি না। ওরা আমার কথা শুনে হো হো করে হাসে। কেউ কেউ ফিস ফিস করে আঙ্গুল ফলের স্বাদ জানায়!

ক্লাসে প্রথম প্রথম শিক্ষকরা জিজ্ঞেস করতেন ক্লাসে মাস্ক পরা কেন, বন্ধুরা থাকতে সেই উত্তর আমাকে দিতে হতো না।

হুট করে একদিন ডিপার্টমেন্টে একজন নতুন শিক্ষক আসলেন। খুব কম বয়েসী, দেখতে-শুনতে বেশ সুদর্শন। আমি মুখোশ পরে ক্লাস করছি, এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র ভ্রƒক্ষেপ করলেন না। তিনি একটা বিষয় নিয়েই যাবতীয় উদ্বেগ প্রকাশ করলেন, সেটা হচ্ছে ক্লাসে উপস্থিতি। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, একদিন উপস্থিত না থাকলেই জবাবদিহি করতে হবে। আর ক্লাস না করলে তার বিষয়ের পরীক্ষায় বসতে দেয়া হবে না।

হ্যালির ধূমকেতুর সঙ্গে আমার ক্লাসে আসার সিডিউলের মিল আছে। দুইটাই ছিয়াত্তর বছর পরপর ঘটে। আমি পড়লাম বিপদে। অন্যান্য সব স্যার আমার কম ক্লাস করার অভ্যাসের সঙ্গে অভ্যস্ত। এই স্যার কে বুঝাই কী করে?

সেদিন রুটিন অনুযায়ী স্যারের ক্লাস। এদিকে আমি কাজিনদের সঙ্গে কনসার্টে যাব। টিকিট কাটা হয়ে গেছে। স্যারের ক্লাস আর কনসার্ট একই সময়ে। এতদিনের স্বভাব সহজে ত্যাগ করা যায় না। আমি ক্লাস ফেলে গেলাম কনসার্টে। স্যারকে না হয় বলব, অসুস্থ ছিলাম। অসুস্থ থাকলে কনসার্ট তো আর পেছাবে না!

এদিকে কনসার্ট শুরু হতেই বন্ধুমহল ফোন দিতে শুরু করল। এরা আমার ফাঁকিবাজির সঙ্গে অভ্যস্ত, তবুও ‘ক্লাস করতে আয়’ মূলক কথা বলতে প্রতিদিন ক্লাস শুরুর আগে কেন ফোন দেয় কে জানে। আমি ফোন ধরলাম না। মনে মনে পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছিলাম এই ভেবে, ওরা ক্লাস করছে আর আমি আনন্দ করছি। জীবন হয় সুন্দর! একের পর এক গান শুনতে শুনতে ঘণ্টা তিনেক পার করে ফেললাম। এমন সময় ভিড়ের মধ্যে পরিচিত একটা মুখ দেখলাম। স্যার! ক্যাম্পাস থেকে জায়গাটা কাছেই, নিশ্চিত ক্লাস শেষ করে এসেছেন।

এখনও অনেক ব্যান্ডের পারফরমেন্স বাকি। আমাকে দেখে ফেললে? বাসায় চলে যাব নাকি? আমার কাজিন দুশ্চিন্তা দেখে বলল, তোকে দেখলেও চিনবে না। তুই তো মাস্ক পরা!

মাথায় বুদ্ধির বাত্তি জ্বলে উঠলো। স্যার আমাকে মাস্ক ছাড়া কখনও দেখেছেন বলে মনে হয় না। আমি মুখোশ খুলে ফেললাম। ঠিক তখনই স্যার আমার দিকে তাকালেন। অভাগা যেদিকে যায়, সেদিকেই ধরা খায়। আমাকে দেখে বললেন, তুমি ৪৩ ব্যাচ না?

আমি বিব্রত ও কিঞ্চিৎ বিস্মিত হয়ে বললাম, জি স্যার! স্যার নির্লিপ্ত মুখ করে বললেন, ও।

স্যার গানে মনোযোগ দিলেন, আর আমি চিন্তায়! নিশ্চিত পরের ক্লাসে ধরবেন। তখন কী বলব? বন্ধুমহলের পরামর্শ নিতে তৎক্ষণাৎ ফোন দিলাম। আমার গ্যাড়াকলের কথা শুনে ফোনের ওপাশ থেকে গালি ভেসে আসল। বলল, ক্লাস ক্যানসেল বলতেই

ফোন দিছিলাম রে গাধা!

নিজের বোকামির কথা ভেবে লজ্জা পেলাম, ধুলার জন্যই হোক কিংবা এভাবে বোকা হওয়ার লজ্জা ঢাকতেই হোক, আবার মুখোশ পরে ফেললাম।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত