হুমায়ূন আহমেদ    |    
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
মানুষ কেন হাসে?

আগামীকাল ১৩ নভেম্বর কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন। কিংবদন্তি লেখকের লেখনীতে যে ব্যাপারগুলো পাঠকেরা সবচেয়ে ভালোবাসতেন, ‘হিউমার’ বা রসবোধ তার মধ্যে অন্যতম। হুমায়ূন আহমেদের লেখনী মানেই পরিপূর্ণ হিউমার। ‘এলেবেলে’ শিরোনামে উন্মাদ ম্যাগাজিনে হুমায়ূন আহমেদ এককালে নিয়মিত লিখেছেন রম্য। প্রথমে উন্মাদে এবং পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়া ‘এলেবেলে-১’ থেকে হুমায়ূন আহমেদের একটি রম্যরচনা তুলে দেয়া হল বিচ্ছু পাঠকদের উদ্দেশে।

আমাদের পাড়ার মজিদ সাহেব নামে একজন রিটায়ার্ড পুলিশের এসপি থাকেন। তার স্বভাব হচ্ছে দেখা হওয়া মাত্র অত্যন্ত চিন্তিত মুখে ‘হাই ফিলসফি’ গোছের একটি প্রশ্ন করা। মহা বিরক্তির ব্যাপার।



সেদিন মোড়ের দোকানে সিগারেট কিনছি। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম মজিদ সাহেব হন হন করে আসছেন। আমি চট করে আড়ালে চলে গেলাম লাভ হল না। ভদ্রলোক ঠিক আমার সামনে এসে ব্রেক করলেন এবং অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন, প্রফেসর সাহেব, মানুষ হাসে কেন একটু বলুন তো।

আমি বিরক্তি চেপে বললাম, হাসি পায় সেইজন্য হাসে।

হাসি কেন পায় সেইটাই বলুন।

এ তো মহা যন্ত্রণা! ভদ্রলোক যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে তাতে মনে হচ্ছে জবাব না শুনে যাবেন না। তার না হয় কাজকর্ম নেই, রিটায়ার্ড মানুষ; কিন্তু আমার তো কাজকর্ম আছে।

আমি বললাম, মজিদ সাহেব আমি আপনাকে একটা গল্প বলি। গল্পটা শুনে আপনি হাসবেন। তারপর নিজেই চেষ্টা করে বের করুন কেন হাসলেন।

এটা মন্দ নয়। বলুন আপনার গল্প।

আমি গল্প শুরু করলাম। এক লোক একটি সিনেমা একত্রিশবার দেখেছে শুনে তার বন্ধু বলল, একত্রিশবার দেখার মতোন কী আছে এই সিনেমায়? লোকটি বলল, সিনেমার এক জায়গায় একটি মেয়ে নদীতে গোসল করতে যায়। সে যখন কাপড় খুলতে শুরু করে ঠিক তখনই একটা ট্রেন চলে আসে। একত্রিশবার ছবিটি দেখেছি, কারণ আমার ধারণা কোন-না-কোনবার ট্রেনটা লেট করবে।



মজিদ সাহেব আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। অবাক হওয়া গলায় বললেন, ট্রেন লেট হবে কেন? প্রতিবার তো একই ব্যাপার হবে।’

আমি বললাম, ‘হাসিটা তো এই খানেই!’

-একই ব্যাপার প্রতিবারই ঘটছে এর মধ্যে হাসির কী?



মজিদ সাহেব গম্ভীর মুখে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। মনে হল আমার ওপর খুব বিরক্ত। আমি যে অভিজ্ঞতার কথা বললাম এ জাতীয় অভিজ্ঞতা আপনাদের সবারই নিশ্চয়ই আছে। অনেক আশা নিয়ে একটি রসিকতা করলেন, সেই রসিকতাটা ব্যাঙের মতো চ্যাপ্টা হয়ে গেল।

আমেরিকান একটি বইতে একশ’টি রসিকতা দেয়া আছে এবং বলা হয়েছে এই রসিকতাগুলোর সাফল্যের সম্ভাবনা শতকরা নিরানব্বই দশমিক তিন দুই ভাগ। আমি এর একটা এক বিয়া বাড়ির আসরে চেষ্টা করে পুরাপুরি বেইজ্জত হয়েছি। একজন শুধু আমার প্রতি করুণার বশবর্তী হয়ে একটু ঠোঁট বাঁকা করেছিলেন কিন্তু অন্যদের গম্ভীর মুখ দেখে সেই বাঁকা ঠোঁট সোজা করে জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলেন। জনৈকা তরুণী চশমার ফাঁক দিয়ে এমনভাবে আমাকে দেখতে লাগল যেন আমার মাথায় দোষ আছে।

গল্পটা এরকম-

এক বন্ধু আরেক বন্দুকে জিজ্ঞাস করছে- ফ্রান্স শহরটা কেমন?

বন্ধু বলল, ভালো। সেখানে এয়ারপোর্টে নেমে তুই যদি একটা মোটর গাড়ি ভাড়া করিস তাহলে দেখবি সেই ড্রাইভার তোর সঙ্গে কি ভদ্র ব্যবহার করছে। এমনও হতে পারে সে তোকে তোর বাসায় নিয়ে যাবে। রাখবে তার বাড়িতে। নাচ-গান করবে। এবং এই যে তুই তার বাড়িতে থেকে এত আনন্দ ফুর্তি করলি, তার জন্য উল্টা তোকে একগাদা টাকা দিবে।

-বলিস কী? তুই গিয়েছিলি নাকি ফ্রান্স?

-আমি যাইনি, আমার বৌ গিয়েছিল। তার প্রাকটিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স। সে তো আর বানিয়ে বানিয়ে বলবে না। এরকম মেয়েই সে না।

এই গল্পে কেউ হাসল না কেন? আমি ভেবে টেবে বের করলাম এরকম একটা ভেন্দা যুবকের এমন বউ থাকতেই পারে না যে একা একা ফ্রান্স যাবে। এই কারণেই গল্পটি কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। কি যন্ত্রণা, হাসির গল্পের আবার বিশ্বাসযোগ্যতা

কী? আমাদের মুশকিল হচ্ছে সিরিয়াস গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। হাসির গল্প হলেই গম্ভীর হয়ে ভাবতে বসি গল্পটি কি বিশ্বাসযোগ্য? ভেন্দা ধরনের ছেলেটির বউ ফ্রান্সে কেন গেল?

রসিকতা যারা করেন তারা বেইজ্জত হওয়ার আশঙ্কা মাথায় নিয়েই করেন। নো রিস্ক নো গেইন ব্যাপার এবং দু’একটা যখন লেগে যায় তখন তাদের উৎসাহের সীমা থাকে না। রসিকতা করাটাকে তখন তারা পবিত্র দায়িত্ব মনে করেন। আগাড়ে বাগাড়ে রসিকতা করে আশপাশের মানুষদের বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে দেন। আমি একবার শ্যামলী থেকে গুলিস্তান যাবার পথে এরকম একজনের দেখা পেয়েছিলাম। বাসে অসম্ভব ভিড়। প্রচণ্ড গরম। ঘামের কটু গন্ধ। এরমধ্যে একজন তার পরিচিত একজনকে পেয়ে গেলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বললেন, এই মোজাম্মেল একটা চুটকি শোন। একবার এক বিয়ে বাড়িতে বরযাত্রী আসতে দেরি করছে তখন বরের ফুপাত বোন...

মোজাম্মেল যার নাম সে একবার অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল। তাতে লাভ হল না। ভদ্রলোক দীর্ঘ গল্প শেষ করে দ্বিতীয় গল্প শুরু করলেন। টাক-মাথার এক লোক বিরক্ত হয়ে অললেন, ‘চুপ করেন তো ভাই’।

-কেন চুপ করব? আপনার কি অসুবিধা করলাম?

-কানের কাছে ভ্যান ভ্যান করছেন এটা অসুবিধা না?

ভদ্রলোক চুপ করে গেলেন। সায়েন্স ল্যাব পর্যন্ত এসেই আবার তার গলা খুস খুস করতে লাগল। তিনি মোজাম্মেলকে তিন নম্বর রসিকতাটি বললেন। অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার এই রসিকতাটি হিট করল। বাস সুদ্ধ লোক হু হু করে হেসে উঠল। এমন কি সেই টাক-মাথার ভদ্রলোক ঠা ঠা জাতীয় বিচিত্র শব্দ করে হাসতে লাগলেন।

অবশ্য এ সংসারে কিছু ভাগ্যবান লোক আছেন, তাদের সব রসিকতা ‘পাবলিক খায়’। এটা বিরাট একটা যোগ্যতা। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে যারা এই যোগ্যতা অর্জন করেন অল্পদিনের মধ্যেই তাদেরকে কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে যেতে দেখা যায়। জীবনের প্রতি সব রকম আকর্ষণ হারিয়ে ফেলতে থাকেন। চল্লিশ না হতেই তাদের দেখা যায় পঞ্চাশের মতো। কারণ খুব সহজ, এই জাতীয় জন্ম-রসিকদের সব কথাই আমরা সবাই রসিকতা হিসেবে নেই। যা একসময় জন্ম-রসিকদের ওপর মানসিক চাপ ফেলতে শুরু করে।

উদাহরণ দেই, আমার এক বন্ধু আবদুস সোবাহান একজন জন্ম-রসিক। স্কুল জীবন থেকে সে আমাদের হাসাচ্ছে। কলেজ জীবনেও একই অবস্থা। সংসারে ঢুকে সে নানা সমস্যায় পড়ল। অল্প বেতন। অনেকগুলো ছেলে-পুলে। অভাব-অনটন। একেকবার সে দুঃখের গল্প করে, আমরা হেসে গড়িয়ে পড়ি। একবার বিকেল বেলা মুখ শুকনো করে বলল, ঘরে আজ রান্না হয় নাই ভাই। একটা পয়সা নেই।

তার কথা শুনে হাসতে হাসতে আমাদের পেটে খিল ধরে যাবার মতো অবস্থা। কি মজার ব্যাপার ঘরে পয়সা নেই।

শেষ করবার আগে এই প্রসঙ্গে একটা দামি উপদেশ দিতে চাচ্ছি। অল্প বয়সী মেয়েদের সঙ্গে কখনও কোনো রসিকতা করবেন না। যদি এদের কোনো একটা রসিকতা পছন্দ হয়ে যায় তাহলে আপনার অবস্থা কাহিল। ‘ঐ গল্পটা আরেকবার বলেন না। ঐ গল্পটা আরেকবার বলেন না।’

শীরিন নামের এক মেয়েকে কোনো এক কুক্ষণে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার একটা গল্প বলেছিলাম। তারপর থেকে যেখানেই তার সঙ্গে দেখা হয় সে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে এবং বলে- ঐ গল্পটা আরেকবার বলেন। প্লিজ।

আমাকে বলতে হয়। তিন বছরের মধ্যে আমি হাজার খানিকবার এই গল্প বললাম। জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল। নাসিরুদ্দিন হোজ্জাকে কাছে পেলে কাঁচা খেয়ে ফেলি এমন অবস্থা। সেই সময়কার কথা, নিতান্ত উপায়ান্তর না দেখেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ব্লাডারের প্রেশার কমাচ্ছি, মনে মনে প্রার্থনা করছি যেন পরিচিত কারোর সঙ্গে দেখা না হয়। ঠিক তখন আমার পেছনে একটা রিকশা থামল। আমার বুক ধক্ করে উঠল। শিরীনের আদুরে গলা, ‘হুমায়ূন ভাই এখানে কী করছেন?’ আমি মনে মনে বললাম, ‘হারামজাদি দেখছিস না কি করছি? দ্রুত জিপার লাগাতে গিয়ে আরেকটা অ্যাকসিডেন্ট হল। জিপার দেয়া প্যান্ট যারা পরেন তাদের জীবনে এ জাতীয় দুর্ঘটনা একাধিকবার ঘটে। তবু ফ্যাকাসে হাসি হেসে বললাম, তারপর কী খবর?

ভালো তো?’



শীরিন বলল, ‘এ হচ্ছে আমার বান্ধবী লোপা, আপনি এঁকে ঐ গল্পটা বলেন তো। প্লিজ। না না বলতেই হবে। আমি কোন কথা শুনব না।’

সেই থেকেই আমি কারও সঙ্গে রসিকতা করতে পারি না। কারও রসিকতা শুনে হাসতেও পারি না। রিটায়ার্ড এসপি, মজিদ সাহেবের মতো নিজেকে প্রশ্ন করি- মানুষ হাসে কেন? (সংক্ষেপিত)


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত