সাফায়েত মুত্তাকী    |    
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
মুহম্মদ জাফর ইকবালের ছাত্রজীবন

১. ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালরা যখন কুমিল্লায় থাকতেন, তখন তাদেরকে বাসায় সাহায্য করার জন্য আফজাল নামের একটি ছেলে ছিল। স্বাধীনতার সময়ে আফজাল মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। এই আফজাল, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় না হলেও পরিবারের থেকেও বেশি। এই আফজালের মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়া নিয়ে একটি মজার ঘটনা রয়েছে। ঘটনাটি এরকম- যুদ্ধ তখন মাত্র শুরু হয়েছে, আফজালকে একজন বললেন যে- দেশে খুব যুদ্ধ হচ্ছে, খুব বড় ঝামেলা, রাজাকার বাহিনীতে লোক নিচ্ছে জয়েন করে ফেল, মাসে মাসে বেতন! তাই শুনে আফজাল গ্রাম থেকে রওনা দিয়েছে। হঠাৎ পথে দেখে যে, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল যাচ্ছে। আফজালকে জিজ্ঞেস করল যে, সে কোথায় যাচ্ছে। এই প্রশ্নের উত্তরে কীভাবে আফজাল রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিতে যাচ্ছে এই কথা বলবে, তা বুঝে উঠতে পারল না। সে বলে ফেলল, মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে যাচ্ছে। শোনামাত্রই যোদ্ধারা তাকে দলে টেনে নিল! সেই থেকে আফজাল মুক্তিবাহিনীতে!

২.

আবারও সেই আফজালকে নিয়েই ঘটনা। স্বাধীনতার পর একদিন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বাসায় ফিরে দেখলেন যে, আফজাল আবার ফিরে এসেছে। তো যাই হোক, আফজাল ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং তার পরিবারের জন্য অন্তঃপ্রাণ! কিন্তু একরাতে হঠাৎ দেখা গেল আফজাল বারান্দায় চিৎপটাং হয়ে পড়ে আছে, অচেতন হয়ে। কী সমাচার? শোনা গেল, সে বলছে তার বাবা এসেছিলেন। তাই তিনি বাবার কোলে উঠতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবার কোলে উঠার পর তার মনে পড়ল যে, তার আসলে বাবা নেই। তখন আফজাল দড়াম করে পড়ে জ্ঞান হারায় ফেলল!

৩.

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তখন দেশে একটিমাত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল, নাম ‘বিচিত্রা’। সেখানে একদিন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার লেখা একটি গল্প পাঠিয়ে দিলেন। পরের সপ্তাহে তিনি অবাক হয়ে খেয়াল করলেন যে, গল্পটি ছাপা হয়েছে! ব্যস, তার মাথায় লেখক হওয়ার ভূত চেপে বসল! তিনি দুমদাম একটি গল্প লিখে ফেললেন, রীতিমতো সায়েন্স ফিকশন। নাম দিলেন ‘কপোট্রুনিক ভালোবাসা’। সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতে সে লেখাও বিচিত্রায় ছাপা হয়ে গেল। কিন্তু এবারে ঝামেলা হল যে, একজন পাঠক রীতিমতো চিঠি লিখে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে, তিনি নাকি এই গল্পটি ‘আইভা’ নামের একটি রাশিয়ান সায়েন্স ফিকশন থেকে ‘টুকলিফাই’ করেছেন। ব্যাপার দেখে-শুনে তার খুব মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। তিনি প্রতিবাদ হিসেবে, আরও গোটা দশের কপোট্রুনিক গল্প লিখে ফেললেন। কারণ একটা গল্প থেকে টুকলি করে বড়োজোর একটা গল্প লেখা যায়, কিন্তু গোটা দশেক নিশ্চয়ই লেখা যাবে না। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রতি সপ্তাহে বিচিত্রায় কুটির শিল্পের মতো ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের গল্প বের হতে লাগল। তাদের নামও সব একই ধরণের- কপোট্রুনিক ভায়োলেন্স, কপোট্রুনিক বিভ্রান্তি, কপোট্রুনিক ভবিষ্যৎ, কপোট্রুনিক প্রেরণা ইত্যাদি, ইত্যাদি।

অনেকদিন পর, সেই পাঠকের সঙ্গে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের সাক্ষাৎ হলে, সেই পাঠক মাথা চুলকে তার অভিযোগের জন্য মাফ চেয়ে নিয়েছিলেন!

৪.

প্রাকটিকাল কাজ এবং পরীক্ষায় বরাবরই ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল সিদ্ধহস্ত। একদিন ভার্সিটিতে ‘ধারকত্ব’ সংক্রান্ত একটি পরীক্ষা করছিলেন, কাচের বিকারে সিলভার নাইট্রেটের দ্রবণ। হঠাৎ একফোঁটা তার হাতে এসে পড়ে হাতে বেগুনি একটা দাগ হয়ে গেল। তিনি সেটা নিয়ে চিন্তিত তো হলেনই না, বরং তার মাথায় একটি বুদ্ধি খেলে গেল- এই সিলভার নাইট্রেট দ্রবণের দাগ দিয়ে একটা উল্কিমতোন করলেই তো হয়! তিনি তাই করলেন। সুন্দর মতোন হাতে একটি মাছের প্রতিকৃতি এঁকে ফেললেন। এহেন শিল্পকর্ম দেখে তার তাবৎ বন্ধু-বান্ধব মুগ্ধ হয়ে গেলেও তিনি একটু পরই এর মজা টের পেতে শুরু করলেন। খানিকক্ষণ পর তিনি সূক্ষ্ম অস্বস্তি নিয়ে খেয়াল করলেন যে, সেখানে কিছুটা জ্বালা অনুভব করছেন। আস্তে-ধীরে সেই জ্বালা টনটনে জ্বালা এবং টনটনে জ্বালা থেকে পরিবর্তিত হয়ে ভয়াবহ জ্বালায় পরিণত হল। তিনি একদিন অপেক্ষা করলেন ব্যথা কমবার, কিন্তু ব্যথা কোনোভাবেই কমল না। পরে আর উপায় না দেখে, মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সি বিভাগে চলে গেলেন। শার্টের হাতা গুঁটিয়ে ক্ষত বের করে দেখলেন যে, সেই কালচে-বেগুনি মাছ ততক্ষণে লালবর্ণ ধারণ করে, জীবিত মাছের মতো ড্যাবড্যাবে চোখে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কোনমতে ডাক্তারকে সমস্যা বুঝিয়ে বলার পড়ে, ডাক্তার তাকে ওষুধপত্র দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলেন, আর পেথিড্রিন ইঞ্জেকশন দিলেন। পেথিড্রিন ইঞ্জেকশন কী সেটা তখনও ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল জানতেন না, তাই সে অবস্থাতেই ড্যাংড্যাং করে ক্লাস করতে গিয়ে, অঘোরে ঘুমিয়ে পড়লেন!

৫.

আবারও মাছের গল্প! হলের ডাইনিংয়ে খেতে বসেছেন। বরাবরের মতোই খাবারের আয়োজন খুবই খারাপ। ছোট পিরিচে সবজির ঘ্যাঁট, পাতলা জিলজিলে ডাল এবং আরেকটা বাঁটিতে শিং মাছ। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের পাশের জন হঠাৎ বলে উঠলেন যে, শিং মাছটিকে যে বড়শি দিয়ে ধরা হয়েছিল সেই গলা থেকে বড়শিটা পর্যন্ত খোলা হয়নি। একটু পরীক্ষা করে দেখা গেল, ব্যাপারটা সত্যি। বন্ধু বিরক্ত হয়ে মাথাটা ফেলে দিতে যাচ্ছিলেন, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাকে থামিয়ে দিয়ে দেখতে চাইলেন যে টোপের সঙ্গে যে গাঁথা কেঁচোটা এখনও আছে কি না। পরীক্ষা করে দেখা গেল, কথা ভুল না, তখনও শিং মাছের

মাথায় কেঁচোর টোপসমেত পুরো বড়শিটাই বহাল তবিয়তে আছে!


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত