সুদিপ্ত কুমার নাগ    |    
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
পাঠাও অ্যাপের সর্বোত্তম ব্যবহার

অনু ভাইয়ের কোনো চাকরি পছন্দ হয় না।

একদিন এই চাকরি ছাড়েন তো আরেক চাকরি ধরেন। প্রতিদিনের জামাকাপড় বদলানোর মতো অনু ভাই নিয়মিত চাকরি আর গার্লফ্রেন্ড পাল্টান। কখন কী সিদ্ধান্ত নেবে, কী কাজ করবে, অনু ভাই এসব ভেবে চলতে পারে না। আমরা ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবেই নিই। যেহেতু অনু ভাই অনেক লম্বা মানুষ, কিন্তু তার বুদ্ধি হাঁটুর নিচেই থাকার কথা। তবে এলাকার ভাইমহলে কথিত আছে, অনু ভাইয়ের বুদ্ধি হাঁটুর নিচেও না, একদম গোড়ালির নিচে!

তবে একটা দিক থেকে অনু ভাই বুদ্ধিমানদের থেকে এগিয়ে আছেন। তাহা হইল অতি আদিম বস্তু, প্রেম! ও হ্যাঁ, আরও একটা বস্তুতেও তিনি এগিয়ে আছেন বটে। সেটাও প্রেমের মতোই আদিম এবং অকৃত্রিম বস্তু, ছ্যাঁকা! বেশিরভাগ সময়েই প্রেম করার পর তিনি টের পান, মেয়ে নাহয় বিবাহিত অথবা এঙ্গেজড! তবু অনু ভাই প্রেম করা এবং ছাড়াটা (অথবা ছ্যাঁকা খাওয়া!) চালিয়ে যান। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘এক চাকরি থেকে আরেক চাকরিতে গেলে যেমন স্কিল বাড়ে, এইটাও আসলে স্কিলের বিষয়। আমি জাস্ট স্কিল বাড়াচ্ছি ম্যান!’

সেই স্কিলটা ঠিক কবে কাজে লাগবে আমরা তা জানি না। সে যাই হোক, অনু ভাই গত মাসে চাকরি ছেড়ে পাঠাও চালানো শুরু করলেন। এটাকে তিনি বলতে লাগলেন, ‘চাকরি তো অনেক করলাম, এইবার স্বাধীন ব্যবসা করতেছি! চাকরি একদম বিয়াশাদির মতো বোরিং ব্যাপার!’

ঘটনা দেখলাম খারাপ না। অনু ভাই কয়েকদিন পাঠাও অ্যাপে বাইক চালিয়ে চাকরির বেতনের চেয়ে বেশি টাকা ইনকামও করে ফেলল। আমরা নিয়মিত ফ্রি-তে রাইডও নিতে থাকলাম! কিন্তু তার দুঃখের বিষয় হল, কোনো মেয়ে যাত্রী তার বাইকে ওঠে না। রাইডের রিকোয়েস্ট দিলেও কোনোভাবে তা ক্যানসেল হয়ে যায়। আমরা আমাদের বান্ধবীদের অনু ভাইয়ের ফোন নাম্বার দিয়ে দিলাম, পাঠাও যে না ঢুকে সোজা ভাইরে ফোন দিতে বললাম, ভাইয়ের শখটা অন্তত পূরণ হোক সেটাও ভালো। জানা গেল, আমাদের কোনো বান্ধবীই তাকে ফোন করেনি।

সেদিন সকালে হঠাৎ অনু ভাই কাজীপাড়া থেকে মহাখালী যাওয়ার রিকোয়েস্ট পেলেন। তবে প্রোমো কোড ওয়ালা রিকোয়েস্ট, ভাড়া কমে মাত্র ৬০ টাকা হয়ে যায়। কিন্তু অনু ভাই প্রফেশনাল রাইডার, না করার তো প্রশ্নই আসে না। বাইক নিয়ে পিক আপ পয়েন্টে গিয়েই বুঝলেন, ঘটনা ঘটে গেছে। যাত্রী অতি সুন্দরী অষ্টাদশী! অনু ভাই বাইকের প্রথম নারী যাত্রীকে নিয়ে বাইক টানার সময় জীবনের বেস্ট পারফরম্যান্সটা দিলেন। মাঝখানে ঝাঁকিওয়ালা রাস্তায় যাওয়ার সময় যদিও মনোযোগ অন্যদিকে চলেই যাচ্ছিল, তবু তিনি ‘রাইডিং পারফরম্যান্স’ খারাপ না করেই পৌঁছলেন মহাখালী! মেয়েটি নামার সময় ভাড়া দিয়ে বলল, ‘আপনি তো জোস চালান। আশপাশেই থাকেন নাকি?’

বিকেল বেলা সেই মেয়ের নম্বর থেকে ফোন। মহাখালী যেতে বলছে তাকে পিক করতে। অনু ভাই তখন রামপুরা, ঝড়ের গতিতে বাইক চালিয়ে দশ মিনিটে মহাখালী পৌঁছলেন। না, কোনো ডেটিংয়ের জন্য কল দেয়া হয়নি। আবারও কাজীপাড়া নামিয়ে দিতে হবে। অনু ভাই পারফরম্যান্স খারাপ করলেন না, আবারও ১৫ মিনিটে মহাখালী টু কাজীপাড়া! এভাবে প্রতিদিন সকালবেলা ওই মেয়েকে কাজীপাড়া থেকে মহাখালী আবার বিকালবেলা মহাখালী থেকে কাজীপাড়ায় পৌঁছে দেয়া অনু ভাইয়ের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে গেল। প্রথম দু-চারদিন সে ভাড়া নিয়েছিল, এরপর আর ভাড়া নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না! রাস্তার প্রতিটা ঝাঁকিই অনু ভাইয়ের কাছে তার প্রাপ্য ভাড়া মনে হতে লাগল। মেয়েটা আগে হাত রাখত বাইকের পেছনের হ্যান্ডেলে। সেই হাত আস্তে আস্তে অনু ভাইয়ের কাঁধে আসতে থাকল। অনু ভাইও ঝাঁকিপূর্ণ রাস্তায় নিজের রাইডিং পারফরম্যান্স দেখানোর আরও অনুপ্রেরণা পেয়ে গেলেন!

সেদিন শুক্রবার। হুট করে ভোর ৬টার দিকে মেয়েটির কল। ‘অনু, খুব আর্জেন্ট কাজ আছে। তুমি তাড়াতাড়ি বাইক নিয়ে আমার বাসার সামনে চলে আসো তো। অনু ভাই ঘুম থেকে উঠে আরেকটু হলে লুঙ্গি পরেই বের হয়ে যেত! পৌঁছতেই মেয়েটা বলল, ‘এখানে আশপাশে কোনো কাজী অফিস আছে? চেন?’

অনু ভাইয়ের মাথা আউলা হয়ে গেল! সর্বনাশ! একে তো কাজীপাড়া, তার ওপর মেয়ে কাজী অফিস খুঁজছে! অনু ভাইয়ের মাথায় তখন একটাই বাক্য ‘আমাদের তো বিয়ে হবে রে!’

কাজী অফিস পাওয়া গেল। তবে কাজীপাড়ায় না, শেওড়াপাড়ায়। বাইক থেকে নেমেই মেয়েটি অনু ভাইকে দুজন সাক্ষী আর বরের পোশাক-কনের শাড়ি ম্যানেজ করতে বলল। অনু ভাই দ্রুত টান দিয়ে চলে গেল এলিফেন্ট রোড! সাক্ষী দুজন হলাম আমি আর বদরুল! কেনাকাটায় খরচ পড়ল পঁচিশ হাজার টাকার মতো। অনু ভাই আরও কয়েকজন বন্ধুকে ফোন দিয়ে বিয়ের কথা জানিয়ে দ্রুত ওই কাজী অফিসের সামনে চলে আসতে বলল। আমরা এক বাইকে তিনজন চেপে রওয়ানা হলাম!

বিয়ের প্রক্রিয়া শুরু হল। আমরা সাক্ষী হলাম। ছেলেটি দেখলাম তার ঠিকানা লিখল, ‘মহাখালী!’

মেয়েটা আরও একটা আবদার করল। উকিল বাবা হিসেবে সে অনু ভাইকেই চায়... ভাই তার জন্য এত কিছু করলেন... তাকে উকিল বাবা হতেই হবে...

আমি এবার হাসি থামাতে পারলাম না। বদরুলের কানে কানে বললাম, ‘মামা, পাঠাও অ্যাপের সবচেয়ে ভালো ব্যবহারটা কিন্তু মেয়েটাই করল, কী বলিস?’

আঁকা : তনি সুভংকর




 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত