আহমদুল ইসলাম চৌধুরী    |    
প্রকাশ : ২১ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
হজ ব্যবস্থাপনায় সৌদির কাছে ৭ সুপারিশ

শত বছর থেকে হজ ব্যবস্থাপনা সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাদশা ফাহাদ হজযাত্রীদের কল্যাণে বিশাল অবদান রেখে গেছেন। নতুনভাবে সাজিয়ে দিয়ে গেছেন পবিত্র মদিনাকে। পবিত্র মক্কায় মসজিদুল হারাম সম্প্রসারণসহ হজযাত্রীদের কল্যাণে বহুবিধ অবদান তার। বাদশা ফাহাদ বিন আবদুল আজিজই নিজেকে নিজে দু’হেরেমের খাদেম খাদেমুল হারামানুস শরিফাইন ঘোষণা দিয়েছিলেন। দেশের অনেক হজযাত্রী ও হজ এজেন্সি নানা অভিযোগ জানিয়েছে হজ বিষয়ে। এ পরিপ্রেক্ষিতে হজযাত্রীদের কল্যাণে মহামান্য বাদশাহর বরাবরে ৭ দফা সুপারিশ পেশ করছি।

হজযাত্রীর কর্তনকৃত ২০ শতাংশ

কোটা ছেড়ে দেয়া

মসজিদুল হারামে বড় ধরনের সংস্কারের লক্ষ্যে প্রতি দেশে হজযাত্রীর কোটা ২০ শতাংশ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। গত ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের হজের আগেই মসজিদুল হারামের মূল কাঠামো পুনর্নির্মাণের কাজ সমাপ্ত হয়ে গেছে। এখন শুধু সাজানোর কাজ বাকি। কাজেই অতি সত্বর এ ২০ শতাংশ কর্তনকৃত কোটা ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা করা হোক। যেহেতু বাংলাদেশসহ অনেক দেশের বহু হজযাত্রী এ কারণে হজে যেতে পারছে না।

হজ ও উমরাহকারীর ওপর

ট্যাক্স প্রত্যাহার হোক

বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে জানতে পারি একাধিকবার হজ উমরাহ করতে গেলে ট্যাক্স দিতে হবে। এটা একটি বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত। উম্মেহাতুল মুমেনিন (আল্লাহ রাসূল (সা.)-এর বিবি) প্রতিকূল যোগাযোগে ১৩ মঞ্জিলের দূর পবিত্র মদিনা থেকে এসে একাধিকবার হজ পালন করেছেন। মহান সাহাবা ও তাবেঈনদের মধ্যে এমন সংখ্যা কম নয় যারা বহু দূর থেকে হেঁটে উটে চড়ে এসে অনেকবার হজ পালন করেছেন। টাকার প্রয়োজন হলে মুসলিম বিশ্ব থেকে নেয়া যাবে। আমাদের বাংলাদেশ সরকারও উভয় হারামের প্রয়োজনে কোটি কোটি রিয়াল দিতে মনে হয় ইতস্তত করবে না। যদি মনে করেন, ট্যাক্সের মাধ্যমে একাধিকবার হজ উমরাহকারীকে ঠেকাতে চান তা হলে বিষয়টি নিজ নিজ দেশে ছেড়ে দেয়া উত্তম হবে। তারাই কোটা মতো হজ উমরাহকারী প্রেরণ করবে। কিন্তু হজ উমরাহকারী থেকে ট্যাক্স নেয়া কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

হজ টার্মিনাল জরুরি সংস্কার করা

বর্তমান হজ টার্মিনাল হজযাত্রীর জন্য একটি চরম প্রতিকূল অবস্থানের জায়গা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হজযাত্রীরা দ্বিতলবিশিষ্ট টার্মিনাল ভবনে ঢুকে এসিতে কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে পড়ে। যাত্রী অনুপাতে চেয়ার সংখ্যা কম, কম টয়লেট সংখ্যাও। বিদেশ থেকে এসে হাজীদের টয়লেটে গিয়ে লাইন ধরতে হয়। ইমিগ্রেশনের পর মূল ভবন থেকে যখন হাজীরা বাইরের চত্বরে আসে তখন ৩৭-৩৮ থেকে ৪৩-৪৪ ডিগ্রি তাপমাত্রায় দগ্ধ হতে শুরু করে। বাংলাদেশ থেকে লাখের অধিক হাজী চরম প্রতিকূল অবস্থার স্বীকার হয়। এখানে একাধিক ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয় বাসে ওঠার জন্য। হজ টার্মিনালের এ বিশাল চত্বরে বসার ব্যবস্থা অপ্রতুল ও গ্রহণযোগ্য নয়। টয়লেটগুলোও মানসম্পন্ন নয়। হজের পর দেশে ফিরতে ৭-৮ ঘণ্টা আগে হজ টার্মিনালে রিপোর্ট করতে হয়। তখন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হাজিরা আবারও বাস থেকে নেমে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে প্রতিকূল অবস্থায় পড়ে। বাংলাদেশসহ অনেক দেশের হাজীরা অনভ্যস্ত বিধায় গরমে ছটফট করতে থাকেন। অবস্থাভেদে অনেক দূরত্বে ইমিগ্রেশনের দিকে যেতে ট্রুলি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। ইমিগ্রেশনের দূরত্ব অধিক হওয়ায় মানসম্পন্ন টার্মিনালের মতো বেল্ট না থাকা দেশে ফেরার সময় টার্মিনাল ভবনে যাত্রী অনুপাতে আসন স্বল্পতা এবং এতে কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যেও হজযাত্রীদের ফ্লোরে বসতে বাধ্য করা।

হজ টার্মিনাল সংস্কার আপনাদের মহাপরিকল্পনা থাকলেও আগামী হজের আগে জরুরি ভিত্তিতে এ সমস্যাগুলো সমাধান করা প্রয়োজন।

পুরনো বাস প্রত্যাহার করা

হজযাত্রী পরিবহনে এখনও বহু পুরনো বাস ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তানসহ গরিব দেশগুলোর ক্ষেত্রে। এসব বাস হাজীদের জন্য মেরামত করে চালু করলেও তা যথাযথ হয় না। ফলে এসির প্রতিকূলতা নিয়ে হাজীদের ভুগতে হয়। অর্থাৎ এসি যথাযথভাবে কাজ করে না। সিটগুলো আরামদায়ক নয়। সামনের সিটে হাঁটু লাগে, বাঁকা হয়ে বসতে হয়। অনেক বাসে সিটের ওপর কিছু রাখা যায় না। বৃষ্টি পড়লে বাসের ভেতরে পানি পড়ে। ৮-১০ ঘণ্টার যাত্রায় হাজীদের এসব বাস খুবই যন্ত্রণাদায়ক।

হজযাত্রীকে আবদুল্লাহ হেরেমে

যেতে বাধ্য করা

মিসফলায় বাংলাদেশি হাজীসহ প্রায় লক্ষাধিক হাজী থাকেন। তার ওপর কুদাই, কাকিয়া, নাক্কাসা, রুসাইফা ইত্যাদি এলাকাতে অবস্থান করা লাখ লাখ হাজী মিসফলা হয়ে কাবা শরিফের দিকে আসেন নামাজ পড়তে, তাওয়াফ করতে। কিন্তু পুলিশ এ দিকে কড়া ব্যারিকেড দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটারের কাছাকাছি দূরত্বে ওয়াক্তে ওয়াক্তে নামাজ পড়তে আব্দুল্লাহ হেরেমে যেতে বাধ্য করে। এটা অমানবিক। আল্লাহপাকের মেহমানদের প্রতি অবিচার। সম্প্রসারিত হেরেম পরিকল্পিতভাবে দক্ষিণে মিসফলার দিকে মসজিদুল হারাম সম্প্রসারিত করুন।

কাবার চারপাশে সমান্তরালে মসজিদুল হারাম সম্প্রসারণ হওয়া প্রয়োজন। এখানে রাজপ্রাসাদ এবং তারকামানের হোটেলের গুরুত্ব না হওয়া চাই। মসজিদুল হারামের চারপাশে পবিত্র মসজিদে নববীর মতো চতুর্পাশে থাকতে হবে বিশাল আকারে চত্বর।

দুই হারামের জন্য সেবকবাহিনী

পবিত্র দুই হারামের হজ উমরাহকারী ও জেয়ারতকারীদের শৃঙ্খলায় রাখার জন্য একটি সেবক তথা খাদেম বাহিনী গঠন করা প্রয়োজন। এসব খাদেমদের থাকবে বিশেষ পোশাক, থাকবে বিশেষ প্রশিক্ষণ। এরাই উভয় হেরেমসহ মিনা, আরাফাহ, মুজদালেফা হজকে নিয়ন্ত্রণ করবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজীরা অবুঝ। এবাদতের উদ্দেশ্যে যেখানে সেখানে বসে যায়। হজ উমরাহকারীর ওপর শক্তি প্রয়োগের কোনো প্রয়োজন নেই। পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী এনে নিয়ন্ত্রণ করা মানায় না। আবারও বলছি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত হাজীরা অবুঝ এবং আবেগপ্রবণ। এবাদতের উদ্দেশ্যে তারা যেখানে সেখানেই বসে যাবে। অতএব, এখানে নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন খাদেম বাহিনীর।

মোয়াল্লেম নিয়ন্ত্রণ করা

৯ জিলহজ আরাফাতে শুধু একটি দিন অবস্থান করতে হয়। তাই আপনার নিয়োগপ্রাপ্ত সৌদি মোয়াল্লেমদের মাধ্যমে অনেকে এসি, ফ্যান কোনো কিছুর ব্যবস্থা করে না। এতে হাজীরা প্রচণ্ড গরমে দগ্ধ হন। যেখানে কম করে হলেও ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকে, সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজীরা এসি, ফ্যানবিহীন ৮-১০ ঘণ্টা গরমে দগ্ধ হতে থাকেন যা অমানবিক। হজ মন্ত্রণালয় (ওজারাতুল হজ) থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত মোয়াল্লেমরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে কিনা এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ গোয়েন্দা বাহিনী নিয়োজিত থাকা চাই, যাতে যাবতীয় অনিয়মও সরকারের নজরে আসে। হজ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন দেশের হজ এজেন্সিগুলোর সঙ্গে যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা তথা ঘর ঠিক করা মোয়াল্লেমের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া সব কিছু রমজানের আগেই সম্পন্ন হওয়া দরকার। এদিকে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হতে যাচ্ছে দু-একদিনের মধ্যেই। আশা করি তাদের প্রতি বিশেষ যতœ নেবেন।

পবিত্র দুই হারামের মেহমানদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে সৌদি সরকার। আমরা মনে প্রাণে কামনা করি আল্লাহ পাক যেন আপনার সেবার মান বাড়িয়ে দেয়ার তৌফিক দেন। ৭টি সুপারিশ জরুরিভাবে বিবেচনায় এনে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে হজযাত্রীরা আরাম পাবেন।

সভাপতি

হজযাত্রী কল্যাণ পরিষদ

E-mail: [email protected]


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত