আমিনুল ইসলাম হুসাইনী    |    
প্রকাশ : ২১ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বৃষ্টি ঝরিয়ে জমিন থেকে রিজিক ফোটান আল্লাহ
ঘন কালো মেঘে ঢেকে আছে আকাশ। তারই মাঝে হঠাৎ হঠাৎ বিজলির চমক। গুড়গুড় গর্জনে মুখরিত চারদিক। যখন তখন আকাশের বুক চিরে শতসহস্র ধারায় নেমে আসে বৃষ্টি। ক’দিন আগেও তীব্র দাবদাহ আর প্রখর রোদে মানুষ হয়ে উঠেছিল অতিষ্ঠ। শুধু মানুষই নয়, পশুপাখি এমনকি সবুজ বৃক্ষও নেতিয়ে পড়েছিল প্রচণ্ড দাবদাহে। তীব্র খরায় জমিন যখন ফেটে চৌচির, তখনই মহান প্রভুর ঐশী করুণায় বর্ষার এক পশলা বৃষ্টি জগতে জন্ম দিয়েছে নয়া প্রাণের। প্রকৃতি হয়ে উঠল প্রাণবন্ত প্রাণময়। যা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এক নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া। আল্লাহতায়ালার একটি বিশেষ নিয়ামতও বটে। সারা দিন একটানা বৃষ্টিতে গাছের ডালে ভেজা কাকের অসহায় বসে থাকা, পূর্ণ যৌবনে টইটম্বুর জলরাশি ছুটে চলা, দুই কূল ছাপিয়ে ছল ছল শব্দে বহমান নদ-নদীতে বিভিন্ন রঙের পাল তোলা শত শত নৌকার ছোটাছুটি মনকে করে মুগ্ধ-বিহ্বল। কান পাতলেই শোনা যায় টিনের চালের টাপুরটুপুর শব্দ।
বর্ষাকাল শুধু ভিজিয়েই দেয় না, জীবনকে রাঙিয়েও দেয়। এ সময় বাগানে রজনীগন্ধা, কদম, জুঁই, টগর, বেলি প্রভৃতি ফুলের সুবাসিত গন্ধে মন ভরে যায়। এই মৌসুমে জলমগ্ন প্লাবনভূমিগুলো জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য এক বিশাল আবাসক্ষেত্রে পরিণত হয়। আম, জাম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, ডেউয়া, চালতা, লটকন, তাল ইত্যাদি জনপ্রিয় গ্রীষ্মকালীন ফল এই মৌসুমে প্রচুর পাওয়া যায়।
বর্ষার অতি বর্ষণে কখনও কখনও চরম বিপত্তিও দেখা দেয়। পানিতে রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়, কাদায় ভরে ওঠে, কোথাওবা ডুবেও যায়। দেখা দেয় নানা রোগ-ব্যাধি।
অতিবর্ষণের সময় এ দোয়াটি আমাদের বেশি বেশি পড়া প্রয়োজন- ‘আল্লাহুম্মা, সাইয়্যিবান নাফিআ।’ অর্থ- ‘হে আল্লাহ! এ যেন হয় কল্যাণকর বৃষ্টি।’ (বুখারি, ১০৩২)
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষির ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে এ দেশের আশি ভাগ মানুষ। বর্ষায় আমন ধানসহ অন্যান্য ধান ও বিভিন্ন ধরনের ফসল বড় হয়। বৃষ্টির পানিতে পাট গাছগুলো বড় হয়ে ওঠে। বর্ষার পানিতে পাটের আবাদ ভালো হয়। এ ঋতুতেই এসব অর্থকরী ফসল ফলাতে হয়। মহান আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা বর্ষার প্রকৃতিতে যেমন সজীবতার ছোঁয়া লাগিয়েছেন, ফুলে ফলে ভরপুর করে দিয়েছেন জগৎ সম্ভারকে, তেমনি জমিনকেও করেছেন উর্বর ও উৎপাদনশীল। পবিত্র কোরআনেও সে কথাই বলা হয়েছে-
‘তিনি (আল্লাহ) পৃথিবীকে তোমাদের জন্য
বিছানা ও আকাশকে ছাদ করেছেন,
এবং আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে/তা দিয়ে তোমাদের জীবিকার জন্য/ফল-মূল উৎপাদন করেন। সুতরাং জেনে/শুনে কাউকেও আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড়/করিও না।’ (সূরা বাকারা : ২২)
আফসোসের কথা হল, এখন আর ফসল উৎপাদনে কৃষকরা তেমন ব্যস্ত থাকেন না। ভদ্র সাজতে গিয়ে তারা আপন ঐতিহ্যকে ভুলে গেছেন। তাই তো এখন বর্ষা এলে চোখে পড়ে না বিলজুড়ে নৃত্যরত আমন ধানের হাতছানি। শোনা যায় না ডাহুকের ডাক। তারা ভুলে গেছে সবুজ বনায়নের কথা। অপরদিকে অবাধ বৃক্ষ নিধনে উজাড় হয়ে যাচ্ছে বন।
অথচ উচিত ছিল বেশি বেশি বৃক্ষ রোপণের। সবুজ আবাদের উৎকৃষ্ট সময় বর্ষা। কৃষিবীদদের মতে জুন, জুলাই ও আগস্টই গাছ লাগানোর উপযুক্ত সময়।
ভুলে গেলে চলবে না, পরিবেশের নিবিড় ছায়াতলেই আমাদের সার্বক্ষণিক বিচরণ। আমরা চাইলেও প্রকৃতির এই পরিবেশ থেকে নিজেকে বাইরে রাখতে পারি না। প্রকৃতি ও পরিবেশের মধ্যেই আমাদের বাস।
পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদম ও মানবী হাওয়া (আ.) আসারও বহু আগে বৃক্ষই তার অবারিত শ্যামল ছায়া বিস্তার করে এই পৃথিবীকে রক্ষা করেছে সূর্যের প্রখর দহন থেকে। বৃক্ষ আমাদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, চিকিৎসাসহ নানা প্রয়োজন মেটাচ্ছে। বৃক্ষের ছালবাকল, লতাপাতা, শেকড়ের রস ইত্যাদি দিয়ে রোগমুক্তির চিকিৎসা হচ্ছে। আজকের বিজ্ঞানের যুগেও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় এগুলোকে শোধন করে তৈরি করা হচ্ছে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেন, ‘কালিজিরা সর্বরোগের মহৌষধ, একমাত্র মৃত্যু ছাড়া।’ (বোখারি)।
ওই হাদিসে যে কালিজিরার কথা বলা হয়েছে তা তো এই বৃক্ষেরই ফল। এ ছাড়া পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণ বনাঞ্চল।
বৃক্ষ শুধু আমাদের জন্য কেবল ইহজীবনেই উপকারে আসবে এমনটা নয়, বরং পরকালীন জীবনেও পুণ্যময় পাথেয় হিসেবে কাজ করবে। হাদিসে এসেছে ‘বৃক্ষরোপণ’ একটা সদকায়ে জারিয়ার মতো সৎকাজ। হজরত আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান যদি বৃক্ষরোপণ করে কিংবা খাদ্যশস্যের বীজ বপন করে অতঃপর তা থেকে কোনো মানুষ, পাখি অথবা পশু কিছু অংশ খায় তবে তার জন্য এই কাজ (বৃক্ষরোপণ) সাদাকাহ হিসেবে বিবেচিত।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
বর্ষা বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতকে একেবারে বদলে দেয়। রোদে ঝলসে যাওয়া খেটে খাওয়া মানুষ বর্ষার অঝোর ধারায় স্নাত হয়ে সবুজ হয়ে ওঠে। বর্ষা এ দেশের মানুষের জন্য অতি প্রয়োজনীয় ঋতু। তাই বলা যায় বর্ষা স্রষ্টার অপার দান। স্রষ্টার কাছে এই প্রার্থনা- মাটির পরতে পরতে বৃক্ষের শাখায় শাখায় ফিরে আসুক বর্ষা।
লেখক : প্রাবন্ধিক
ই-মেইল : [email protected]



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত