আল ফাতাহ মামুন    |    
প্রকাশ : ২১ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
রুহের কলমে রৌদ্রের গান

সাধনা ছিল- ‘কবি হব’। হয়েছেন তাই। সাধনা যখন আল্লাহতায়ালার রহমতের ছোঁয়া পায় তখন মানবজীবন স্বার্থক হয়। কবি হতে চেয়ে হয়েছেন শ্রেষ্ঠ কবি। বলছিলাম বাংলা সাহিত্যের জীবন্ত কিংবদন্তি আল মাহমুদের কথা। গত ১১ জুলাই ৮১টি বসন্ত পেরিয়ে ৮২তে পা রেখেছেন। প্রায়ান্ধ চোখ নিয়ে এখনও লিখে চলেছেন অকৃপণ।

কবির সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় ‘আব্বা বলেন পড়রে সোনা/আম্মা বলেন মন দে।/পাঠে আমার মন বসে না/কাঁঠাল চাঁপার গন্ধে’- এই ছড়াটি দিয়ে। তখন আমি হেফজ শ্রেণীর শিক্ষার্থী। ওই বয়সে ভাঙা ভাঙা বানানে পড়ে ফেলি পুরো ছড়াটি। বড় হয়ে কবির সঙ্গে বেশ সখ্য গড়ে ওঠে। কবির কথা, স্বপ্ন, সাধনা একটু একটু করে বুঝতে শুরু করি। প্রায়ই শুনি, কবি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ডিসেম্বর মাসে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল কবির সঙ্গে। কিন্তু বাস্তবে নয় স্বপ্নে।

কবি আল মাহমুদের কবিতার উল্লেখযোগ্য অংশ ধর্ম ও কোরআন। কোনো কোনো সূরার ভাব অনুবাদও করেছেন তিনি। কখনও কখনও মাত্র ক’টি আয়াত নিয়ে রচনা করেছেন সুবিশাল কবিতা। সূরা ইউসুফের তৃতীয় ও চতুর্থ রুকু নিয়ে ‘জুলেখার আহ্বান’ এবং ‘ইউসুফের উত্তর’ নামে দুটি বৃহৎ কবিতা লিখেছেন। একশতের বেশি চরণ রয়েছে দুটো কবিতাতেই। সূরা নূহে বর্ণিত ঘটনার ভাব বর্ণনা করে তিনি লিখেছেন, ‘নূহের প্রার্থনা’। নূহের পেছনে বসে এক মোমিন দম্পতি নতুন করে পৃথিবী গড়ার শপথ নিয়েছেন। আর প্রার্থনা করেছেন-

‘আদমের কালোত্তীর্ণ সেই পাপ যেন

হে প্রভু আবার কভু ছদ্মবেশী সাপের মতন

গোপন পিচ্ছিল পথে বেরিয়ে না আসে।’

সূরা নমলে আছে হুদহুদ পাখির ঘটনা। এর আলোকে আল মাহমুদ লিখেছেন ‘হুদহুদ পাখির কৈফিয়ত’। একটি পাখির বিচক্ষণতায় কীভাবে নবীর নবুয়াতি কাজ সহজ হয়ে গেল, গোটা একটি দেশ ইসলামের পতাকার নিচে আশ্রয় নিল; শুধু তাই নয়, সোলাইমান (আ.) কীভাবে একটি পাখি থেকে উপদেশ নিয়ে নিজেকে সংযত করেছেন তা খুব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ কবিতায়।

আল মাহমুদ লিখেছেন ‘কদর রাত্রির প্রার্থনা’। এ যে সূরা কদরের-ই সম্প্রসারিত ভাব, তা বলাই বাহুল্য। জাহেলী যুগের শ্রেষ্ঠ কবি লাবিদ থেকে শুরু করে ইরানের খোমেনি এবং উপমহাদেশের ইকবাল-নজরুলসহ মুসলিম ব্যক্তিত্ব কেউ বাদ যায়নি তার কবিতা থেকে। আসলে আল মাহমুদ তো তাদেরই যোগ্য উত্তসূরি। জাতীয় কবির ভাষায় বলতে গেলে, বীণা শুধু হাত বদল হয়েছে। নয়তো বীণার সুর ও ভাষা, উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য এক ও অভিন্ন। রাসূল (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবি আবু জর গিফারীর প্রতি কবির বিশেষ ভক্তির পরিচয় পাওয়া যায় ‘গিফারীর শেষ দিন’ কবিতায়। উমাইয়া শাসকদের চরম বিদ্রূপ করে শেষ হয়েছে কবিতাটি। খোদ রাসূল (সা.)কে নিয়েও কবিতা রচনা করেছেন তিনি। নাম দিয়েছেন ‘হজরত মোহাম্মদ’-

‘লাঞ্ছিতের আসমানে তিনি যেন সোনালি ঈগল/ ডানার আওয়াজে তার কেঁপে ওঠে বন্দির দুয়ার;/ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় জাহেলের সামান্য শিকল/ আদিগন্ত ভেদ করে চলে সেই আলোর জোয়ার।’

ধর্ম বিষয়ে আল মাহমুদের কবিতা এত বেশি যে তা দিয়ে অনায়াসেই বড় আকারের পৃথক সংকলন হতে পারে। শুরুর দিকে কিন্তু কবি ধর্মের প্রতি তেমন অনুরাগী ছিলেন না। এটি ছিল কবির জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। ‘ইয়াহদি মাইয়াশাআল্লাহ- আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদয়াত করেন’- আয়াতের আশ্চর্য বাস্তবায়ন। কবির মুখেই শুনি সে কথা- ‘আমি এক বছর বিনা বিচারে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকার সময় হঠাৎ আমার পিতার আদেশ পালনের সুযোগ পাই। অর্থাৎ, একখণ্ড পবিত্র কোরআন আমার স্ত্রী আমাকে জেলখানায় দিয়ে এলে আমি তা অর্থসহ আদ্যোপান্ত পাঠ করা শুরু করি। আর প্রথম পাঠেই আমার শরীর কেঁপে ওঠে। এর আগে কোনো গ্রন্থ পাঠে আমার মধ্যে এমন ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়নি। যেন এক অলৌকিক নির্দেশে আমার মস্তক মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।’ সুবহানাল্লাহ! ‘ইয়াহদি মাইয়াশাআল্লাহ’র নূরের বুঝি এই খেলা, কারাগারের আঁধারে হেদায়াতের আলো দেখে কবি মন হল উজালা। সাধক কবির রহমতের বর্ষণে সিক্ত হওয়া সেই থেকে শুরু। ৮২টি বসন্তের শুরুতে এসে তাই কবির জন্য আমাদের প্রার্থনা- ‘হে মহাকবি আল্লাহ! আমাদের প্রিয় কবির হায়াতে বরকত দিন। সুস্বাস্থ্য দিন। লেখনী তাজা করে দিন। আর আমাদের থেকেই বের করুন কবির যোগ্য উত্তরসূরি, নতুন কোনো কলম গায়ক। যে গাইবে রৌদ্রের গান, রুহের কলম বাজিয়ে।’

E-mail : [email protected]


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত