• মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০
ফিরোজ আহমাদ    |    
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বাবা-মার খেদমত করতে বলেছে কোরআন

যে মানুষটি প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে পরিবারের সব সদস্যের আহার, আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদনের খরচ যোগানোর জন্য কর্মক্ষেত্রে ছুটেছেন। সে মানুষটি জীবনের কোনো একটি সময়ে যৌবনের সঙ্গে হার মেনে বয়সের ভারে নুয়ে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। যিনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গায়ের ঘাম ঝরিয়ে আয় রোজগার করেছেন। তিনি বৃদ্ধ বয়সে এসে দু’চারশ টাকার জন্য পরিবারের অন্য সদস্যদের দিকে চেয়ে থাকেন। পরিবারের সব সদস্য যখন আধুনিক নগর জীবনের স্বাদ উপভোগ করা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন তখন বয়স্করা ঘরের একটি কোণে বসে মৃত্যুর প্রহর গোনেন। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার জন্য হাতের লাঠি কিংবা ছড়ি একমাত্র সঙ্গী। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তায়ালাই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনিই তোমাদের মৃত্যু দেবেন। তোমাদের কোনো ব্যক্তি বৃদ্ধ বয়সের দুর্বলতম স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, এতে করে জানার পর সে অজ্ঞ হয়ে যাবে, আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।’ (সূরা আন-নাহল : ৭০)।

প্রবীণদের প্রতি ভালো আচরণ করা করুণার বিষয় নয়। তা প্রবীণদের অধিকার। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমার প্রভু নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচারণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ বল না এবং তাদের ধমক দিও না। আর তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বল। আর তাদের উভয়ের জন্য দয়া পরবশ হয়ে মমতা ও নম্রতার ডানা বিছিয়ে দাও এবং বল, ‘হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ২৩-২৪)।

বয়স্ক তথা প্রবীণদের সব সময় খোঁজখবর নেয়া ও সেবা করা একটি উত্তম ইবাদত। প্রবীণদের প্রতি ভালো আচরণ করা, সালাম বিনিময় করা, শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেয়া, অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, সময় মতো পুষ্টিকর খাবার পরিবেশন করা, তাদের নিয়ে একসঙ্গে খাওয়া, একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়া, ভালো জামা কাপড় পরানো ও তাদের বিছানাপত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা নেক আমলের পর্যায়ভুক্ত। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজ করবে- নর কিংবা নারী, সে যদি ঈমানদার অবস্থায়ই তা (সম্পাদন) করে তাহলে এসব লোক অবশ্যই বেহেশতে প্রবেশ করবে, তাদের ওপর বিন্দুমাত্রও অবিচার করা হবে না। এর চেয়ে উত্তম জীবন বিধান আর কার হতে পারে, যে আল্লাহ পাকের জন্য মাথানত করে দেয়, মূলত সেই হচ্ছে নিষ্ঠাবান ব্যক্তি, সে ইবরাহিমের আদর্শের অনুসরণ করে; আর আল্লাহ পাক ইবরাহিমকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন।’ (সূরা আন-নিসা : ১২৪-১২৫)।

যে মা সন্তানের নিরাপত্তার জন্য চোখের ঘুমকে হারাম করেছেন। শিশু অবস্থায় সন্তানের জন্য মা সারা রাত জেগে থেকেছেন। নিজে ভালো কাপড়চোপড় না পরে সন্তানকে পরিয়েছেন। সন্তানের সুন্দর একটি ভবিষ্যতের জন্য নিজের সব সুখকে বিসর্জন দিয়েছেন। অথচ সে ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে কর্মব্যস্ততার জন্য বয়স্ক মাতা-পিতার খোঁজখবর নেয়ার মতো সামান্য সময়টুকু পান না। অনেকে বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে রেখে আসেন। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি মানুষকে মাতা-পিতার সঙ্গে সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে অতি কষ্টে গর্ভে ধারণ করেছেন এবং অতি কষ্টে তাকে প্রসব করেছেন। তার গর্ভধারণ ও দুধ পান ছাড়ানোর সময় লাগে ত্রিশ মাস।’ (সূরা আহকাফ : ১৫)। ‘আর আমি মানুষকে তার মাতাপিতার সঙ্গে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা অনেক কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছেন। আর দুই বছর পর্যন্ত স্তন্যদান করেছেন।’ (সূরা লোকমান : ১৪)। হজরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘তোমরা তোমাদের পিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। কেননা যে ব্যক্তি আপন পিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল সে কুফরি করল। (বুখারি : ৬৩১১)।

প্রবীণদের সেবা করলে বান্দার নিত্যদিনের গোনাহ মাফ হয়ে যায়। আমলনামায় নেকির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ভালো কর্মগুলো আমলনামা থেকে মন্দ কাজগুলোকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়। কোরআনে এরশাদ হয়েছে ‘যারা ভালো (কাজ) দিয়ে মন্দ (কাজ) প্রতিহত করে, তাদের জন্যই (পরকালে) শুভ পরিণাম।’ (সূরা রা’দ : ২২)। আর যারা প্রবীণদের সঙ্গে সদাচরণ করবে না এবং মাতা-পিতার অবাধ্য হবে তাদের জন্য পরোকালে জাহান্নামের আগুন নিশ্চিত হয়ে যাবে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন, উপকার করে খোঁটা দানকারী, মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান এবং মদ পানকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (নাসাঈ, দারেমী, মেশকাত, পৃ. নং-৪২০)।

সুতরাং প্রবীণদের খোঁজখবর নেয়া, দেখতে যাওয়া ও তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা অপরিহার্য। কারণ বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হজরত রাসূল (সা.)-এর বৈশিষ্ট্য। এছাড়া বয়স্কদের প্রতি ভালো আচরণ করা ঈমানের একটি অংশ। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যারা ঈমান আনে এবং নেক কাজ করে, আমি নিশ্চয়ই তাদের সেসব ত্রুটিগুলো দূর করে দেব এবং তারা যেসব নেক আমল করে আমি তাদের সেসব কর্মের উত্তম ফল দেব।’ (সূরা আনকাবুত : ৭)। হজরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন, জনৈক ব্যক্তি একটি কুকুরকে পিপাসায় কাতর অবস্থায় ভিজামাটি চাটতে দেখে সে নিজের চামড়ার মোজার সাহায্যে পানি তুলে তৃপ্তির সঙ্গে পান করাল। আল্লাহ এই কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে জান্নাত দান করলেন। (বুখারি : ১৭৪)। হজরত রাসূল (সা.) এরশাদ করেছন, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা উভয়কে অথবা দুই জনের যে কোনো একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেল এবং তাদের খেদমত করে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না। সে ধ্বংস হয়ে যাক। (মুসলিম : ৬২৭৯)। সুতরাং প্রবীণদের সঙ্গে সদাচরণ করার জন্য আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন।

লেখক : প্রাবন্ধিক


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত