• বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
খুতবায় আধুনিকতা জরুরি
ইউসুফ নূর। একজন হাফেজ এবং মাওলানা। কাতার প্রবাসী বাংলাদেশিদের পরিচিত মুখ। কাতার সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয়ে ইমাম পদে নিয়োগ পেয়ে ১৯৯৬ সাল থেকে প্রায় ২২ বছর ধরে সে দেশে আছেন। আপন মেধা ও প্রতিভায় কাতারে নিজেকে অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন সরকারের একাধিক ধর্মীয় পদেও। নোয়াখালী মাইজদীর এ কৃতী সন্তান বর্তমানে কাতারের একজন প্রসিদ্ধ ইমাম ও খতিব। পাশাপাশি কাতার প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান ‘আল নূর কালচারাল সেন্টার’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক। যুগান্তরের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে কথা বলেছেন এহসান সিরাজ

প্রশ্ন : কাতারে নিজেকে কীভাবে মেলে ধরলেন?

ইউসুফ নূর : আমি কাতার যাই একজন সাধারণ ইমাম হিসেবে। যাওয়ার দুই বছর পর সেখানকার কোরআন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাই। তিন বছর পর নিয়োগ পাই খতিব হিসেবে। এ জন্য আমাকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। ছয় বছর পর আমি কাতার সরকারের দাওয়াহ প্রতিষ্ঠান ইসলাম পরিচিতি কেন্দ্র যা কাতার সরকার কর্তৃক অনারব ভাষায় পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক দাওয়াহ সেন্টার সেখানে আমি বাংলাভাষী দায়ি হিসেবে নিয়োগ পাই। বর্তমানে এটি পৃথিবীর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বৃহত্তম দাওয়াহ প্রতিষ্ঠান। এখানে আমি ১৩ বছর ধরে কাজ করছি। এ সেন্টারের অধীনে আমি বিভিন্ন মসজিদে ওয়ায়েজ ও দায়ি হিসেবে দায়িত্বরত।

প্রশ্ন : খতিব হিসেবে আপনার কাছে জানতে চাই খুতবা কী? এর গুরুত্ব কতটুকু?

ইউসুফ নূর : খুতবা এবং জুমার নামাজ ইসলামের একটি বিশেষ পরিচয়বাহী আমল ও নিদর্শন। জুমার দিনের বিশেষ আকর্ষণ হল খুতবা। মুসল্লিদের জন্য খুতবা শোনা ওয়াজিব। এ জন্যই জোহরের ৪ রাকাতকে সংক্ষেপ করে জুমার নামাজ ২ রাকাত করা হয়েছে। যাতে মানুষ গুরুত্ব দিয়ে খুতবা শুনতে পারেন। এখানে আরেকটি বিষয় হল, খুতবা শুনতে এসে যেন লম্বা সময়ের কারণে মানুষের কাজকর্মে ব্যাঘাত না ঘটে। মানুষ যেন বিরক্তিবোধ না করে এজন্য নামাজকে দু’রাকাত করে দেয়া হয়েছে। কারণ আল্লাহর রাসূল (সা.) মানুষের কর্মঘণ্টার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। রাসূল (সা.)-এর হাদিস, ‘একজন মানুষের যে ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরতা আছে এর প্রমাণ হল তার খুতবা। সে নামাজ পড়বে আর খুতবা দেবে গোছানো।’ গোছানো অর্থাৎ অল্প কথায় অনেক কথা বুঝিয়ে দেবেন। যেমন সরকারি প্রজ্ঞাপন খুব বড় হয় না। খুতবা হল মুসলমানদের জন্য ধর্মীয় ফরমানের মতো। ফরমান যত ছোট, গোছাল, আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ হয় সেটির আবেদন তত বেশি হয়।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের খতিবদের খুতবা কেমন মনে হয়?

ইউসুফ নূর : দুঃখের বিষয় হল, দু-একজন খতিবের খুতবা ছাড়া আমাদের দেশের জুমার খুতবাগুলো মুসল্লিদের দৃষ্টিতে তেমন গুরুত্ব রাখে না! এমনকি যারা খুতবা দিচ্ছেন তারাও এর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু উপলব্ধি করতে পারছেন এটাও ভাবার বিষয়। আরবের প্রতিটি দেশেই জুমার খুতবা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়। খতিবরাও এভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। সেখানকার খতিবদের কোনো দিন কিতাব বা কোনো বই থেকে দেখে খুতবা দিতে দেখিনি। এর প্রচলন শুধু আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশেই আছে অন্য কোথাও নেই।

প্রশ্ন : খুতবায় আবেদন না থাকার করণ কী?

ইউসুফ নূর : মূলত খুতবা দেয়ার যোগ্যতার অভাব বা যোগ্যতা থাকলেও খুতবা বানানো একটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার হওয়ায় খতিবরা অলসতার কারণে বানান না। অনেকে এমনও আছেন যারা বলেন, বুজুর্গরা এটা লিখে গেছেন বরকতের জন্য পড়ি! অথচ শরিয়তে এর কোনো ভিত্তি নেই।

প্রশ্ন : খুতবা কি আরবিতেই হওয়া জরুরি?

ইউসুফ নূর : খুতবা আরবিতে হওয়ার ওপরই ফতোয়া। তবে যতটুকু বললে ওয়াজিব আদায় হবে এ পরিমাণই আরবিতে বলা উচিত। এর জন্য সর্বোচ্চ দুই মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়। বাকিটা খতিব তার মাতৃভাষায় বলবেন।

প্রশ্ন : খুতবা কোন বিষয়ে হওয়া প্রয়োজন?

ইউসুফ নূর : খুতবা হওয়া উচিত সমসাময়িক বিষয়াবলির ওপর। যা সমাজের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। যেমন- মাদক, ধূমপান, নারী নির্যাতন, বাল্যবিয়ে, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি দমনসহ নানা বিষয়ে। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা মনে পড়ল, কিছুদিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া গিয়েছিলাম মাদক ও যৌতুকবিরোধী এক সেমিনারে। সেখানে ইসলামের দৃষ্টিতে যৌতুকের ঘৃণ্য ও ভয়াবহতা সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। কথার ফাঁকে এক বৃদ্ধলোক দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, এ কথাগুলোই আমাদের সমাজে আলোচনা হওয়া উচিত। এগুলোই আমাদের দরকার। আমাদের আলেমরা কেন এসব বলেন না!

প্রশ্ন : খুতবা দেয়ার পাশাপাশি আলেমরা আর কী করতে পারেন?

ইউসুফ নূর : আলেমরা হলেন রাসূল (সা.)-এর প্রতিনিধি, নায়েবে নবী। তিনি আলেমদের জন্য দুটি আসন রেখে গেছেন। এক নাম্বার হল খেলাফত, যা এখন নেই, কখনও থাকবে কখনও থাকবে না এটা আলোচনার বিষয় নয়। দ্বিতীয় হল মসজিদের মিম্বর। যে ইমাম বা খতিব মসজিদের মিম্বরে দাঁড়ান তিনিই রাসূলের প্রতিনিধিত্ব করেন। আর আল্লাহর রাসূলের নবী হওয়ার আগে-পরে সবচেয়ে বড় যে গুণ ছিল সেটি হল, তিনি একজন সমাজকর্মী, সমাজসেবক ছিলেন। নবী হওয়ার পর অনেকেই ঈমান আনেনি কিন্তু সামাজিকভাবে তার থেকে উপকৃত হয়েছেন। এর বড় প্রমাণ হল, হিজরতের রাতে হজরত আলি (রা.) কে মানুষের রাখা আমানতের জামিনদার হিসেবে রেখে যাওয়া! একজন ইমাম-খতিবের জন্য সমাজের ছোটখাটো কাজ করা খুবই সহজ। যেমন পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি, স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব নিরসনসহ নানা বিষয়ে কাজ করে সমাজের খেদমত করতে পারেন। কেউ যদি কাজ শুরু করেন তিনি কতটুকু সফল হবেন এটা আল্লাহই ভালো জানেন। তবে এর মাধ্যমে সমাজে তিনি সম্মানিত হবেন এটা নিশ্চিত বলতে পারি।

প্রশ্ন : কাতারের সমাজে আলেমদের অবস্থান কেমন?

ইউসুফ নূর : কাতারে আমি দেখেছি বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে আলেম-ওলামারা সরকার এবং জনগণের পাশে থাকেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সবরকম অনুষ্ঠানে ইমাম খতিবদের আমন্ত্রণ করা হয়। কাতারের জাতীয় সমরাস্ত্র প্রদর্শনীতে অলেমরা স্টেডিয়ামে উপস্থিত থাকেন। এমনকি কাতারের প্রতিটি স্পোর্টস এবং সাধারণ ক্লাবে একজন করে আলেম থাকেন। তাদের দায়িত্ব হল নামাজ পড়ানো এবং নামাজের আগে বা পরে সংক্ষেপে মাদক, নেশা, নারীসহ চরিত্র ধ্বংস করে এমন জিনিস থেকে দূরে থাকার নসিহত করা। তারা ব্যাপকভাবে সামাজিক কাজে অংশ নেন।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের মসজিদগুলোয় নারীদের জন্য নামাজের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই, এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

ইউসুফ নূর : মিসরের একজন শিক্ষাবিদ ড. সাইয়্যেদ আস সাফতি, যিনি বাংলাদেশের দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ছিলেন। তিনি কাতারের এক পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- ‘বাংলাদেশের মেয়েরা সিনেমা হলে যেতে পারে, মার্কেট, শপিংমল, স্কুল-কলেজ, হাটবাজার এমনকি তারা পার্লামেন্টেও গেছেন কিন্তু তাদের শুধু মসজিদ বা দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাওয়ার অধিকার নেই!’ বেচারা দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘আমরা কোনো কোনো মসজিদে মেয়েদের ঢোকার ব্যবস্থা করেছিলাম কিন্তু আলেমরা এমনভাবে বাধা দিয়েছেন যেন আমরা কবিরা গুনাহ করে ফেলেছি। অথচ তারাই মক্কা-মদিনাতে তাদের স্ত্রী, মেয়েদের নিয়ে এক ইমামের পেছনে নামাজ পড়ছেন!’ তিনি প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘মক্কা-মদিনার মসজিদে যেটা জায়েজ বাংলাদেশে কেন নিষেধ হবে।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত