নাজমুল হুদা    |    
প্রকাশ : ১১ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
পেশা বাছাইয়ের পাঁচফোড়ন

একটি ছেলে প্রায়ই বাবার সঙ্গে রেললাইনের ধার দিয়ে হাঁটার সময় একজন লোককে দেখত, সে লাঠিতে সবুজ কাপড় বেঁধে ওড়ালে ট্রেন চলে আর লাল কাপড় ওড়ালে ট্রেন থেমে যায়! ছেলেটি তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, এই লোকটি? যার লাঠির ইশারায় ট্রেন থামে আবার চলে? বাবা বললেন সে লাইনম্যান, এটাই তার চাকরি। ছেলেটি মনে মনে ভেবে নিল, এটাই তাহলে সবচেয়ে বড় চাকরি। সবচেয়ে বড় গাড়ি ট্রেন চালানো বা থামানো যার হাতে সেই লোকটি অবশ্য বড় কেউ। ছেলেটি স্বপ্ন দেখতে শুরু করল, বড় হয়ে সে এই চাকরিটা করবে! আরেকদিন রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় সে লক্ষ্য করল স্টেশন নয়, তবুও একজায়গায় ট্রেন থেমে গেছে আর ট্রেনের দরজার সামনে উৎসুক মানুষের জটলা। বাবার কাছে সে সেদিনের সেই ঘটনার কারণ জানতে চায়। বাবা বললেন, এখানে একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নামবেন, তাই ট্রেন থামানো হয়েছে। আর তাকে দেখার জন্যই মানুষের ভিড়! সে সময় ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের জন্য দূরের পথের জন্য ট্রেনই ছিল নির্ভরযোগ্য বাহন। বাবার কথা শুনে ছেলেটি বুঝতে পারে, এটি আরও বড় চাকরি; ইনি লাইনম্যানের চেয়ে বড় কেউ, যাকে নামানোর জন্য যে কোনো জায়গায় ট্রেন থামে, উৎসুক মানুষের ঢল থামে। যে অফিসারের কারণে ট্রেন থামানোর জন্য কোনো স্টেশন বা লাইনম্যানের সংকেতের প্রয়োজন হয় না। ছেলেটি প্রতিজ্ঞা করল, বড় হয়ে সে এরকম কোনো বড় অফিসার হবে। এভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা ঘটনা, অনুঘটক ও অনুপ্রেরণার মাধ্যমে আমাদের স্বপ্ন বিস্তৃত ও বিনির্মিত হতে থাকে। জীবনের লক্ষ্য পুনঃপুনঃ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়। পূর্ণতা প্রাপ্তির এ দীর্ঘপথে খুঁজে নিতে হয় কাঙ্ক্ষিত পেশা।

পরিবার ও পরিবেশ

বেঁচে থাকার তাগিদে পেশা হিসেবে কোনো কাজকে বেছে নিতেই হয়। তাই বলে, সবসময় মা-বাবার ইচ্ছানুযায়ী প্রথাগত পেশা বেছে নিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এর সঙ্গে পেশা-পারিপার্শ্বিকতা, সুযোগের সীমাবদ্ধতা, সামাজিক মযার্দা, প্রাপ্তির পরিমাণ ও আত্মতৃপ্তির কথাও ভাবতে হবে। পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে মা-বাবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব থাকার কথা তো সবারই জানা। অনেকেই এভাবে মা-বাবার ইচ্ছাটাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে যা হতে চান সেটার উল্টোটা হন। এজন্য দেখা যায়, সফল তারকা, খেলোয়াড়, অভিনেতা, রাজনীতিক, কবি-লেখক, শিল্পী, শিল্প উদ্যোক্তা সাক্ষাৎকারে বলে থাকেন ‘ছোটবেলায় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিচারক, উকিল বা পাইলট হতে চেয়েছিলাম। পরের বাক্যেই হয়তো উনি বলে ওঠেন, ভালোই হয়েছে এগুলো হতে পারিনি। কারণ সেদিন সেটা হলে আজ এটা হতে পারতাম না। এখন পরিবারের সদস্যরাও খুশি ও গর্বিত। পেশা পথে পরিবারের ভূমিকা প্রসঙ্গে ভারতীয় কিংবদন্তি ক্রিকেটার শচিন টেন্ডুলকার বলেছিলেন, ‘একটি সুদৃঢ় পরিবার হওয়া প্রয়োজনীয়, যারা সবসময় আপনার সঙ্গে থাকবে ও আপনার পথ নির্দেশ করবে এবং আপনার জন্য হাততালি দেবে।’

নেশা থেকে পেশা

কবি কাহলিল জিবরান লিখেছিলেন ‘ভালোবাসা ছাড়া যে রুটি তৈরি করা হয়, সে রুটি তিক্ত রুটি যা একজন মানুষের ক্ষুধা অর্ধেক মেটাতে পারে’

রুটি-রুজির জন্য আমাদের কোনো না কোনো কাজ করতে হয়। কিন্তু কাজের প্রতি ভালোবাসা ও আন্তরিকতা না থাকলে সে কাজে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না। সেই তিক্ত রুটির মতো ক্যারিয়ারেও বিরাজ করে তিক্ততা, হতাশা। ভালোবাসার কাজে লেগে থাকলে সাফল্য আসবেই। তাই অর্থ আয়ের দোহাই দিয়ে ভালোবাসার কাজ বিসর্জন দেয়ার কোনো মানে হয় না। এ প্রসঙ্গে মার্কিন লেখক আশা টাইসন বলেন, ‘আপনি যা ভালোবাসেন তাই যদি পেশা হিসবে গ্রহণ করেন তবে আপনার আয়ের পথ কখনোই বন্ধ হবে না’

পৃথিবীর সফল ব্যক্তিদের সাফল্যের মূলে রয়েছে এই ভালোলাগার কাজ খুঁজে পাওয়া এবং আন্তরিকভাবে কাজ করে যাওয়া। বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা, আইফোনের জনক স্টিভ জবস বলেছিলেন, ‘তোমাকে অবশ্যই তোমার ভালোবাসার কাজটি খুঁজে পেতে হবে। ঠিক যেমন তোমার ভালোবাসার মানুষকে খুঁজে বেড়াও’।

অসম্ভব বা কঠিন বলে শখের কাজটি বাদ দিয়ে কৃতিম পেশাদার করে কাজের বিনিময়ে বেতন পাবেন, আর কিছু না। তাই পেশা নির্বাচনের নেশা বা ভালোবাসাকে প্রধান্য দিন। বাকি সব এমনিতেই পাবেন। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বের শীর্ষধনী বিল গেঁটস বলেন, ‘যে কাজটি করছেন, তারপ্রতি ভালোবাসা থাকতেই হবে। সফল মানুষেরা একমাত্র ভালোবাসা দিয়েই কঠিন কাজটাকে সহজ করেন’।

ঝোঁকের বশে ঝুঁকি

বিখ্যাত গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সুপার সেলের প্রধান নির্বাহী বলেন, ‘ঝুঁকি না নিলে সফল হওয়া যায় না, আবার ঝুঁকি নিলে ব্যর্থতার স্বাদও পেতে হয়। তুমি যতি একবারও ব্যর্থ না হও তার মানে তুমি ঝুঁকি নিচ্ছ না।’

ঝুঁকি না নেয়ার সাহস থাকায় অনেকেই রুটিন কাজের চাকরি করে নিজের প্রতিভা বিসর্জন দিয়ে পরমুখাপেক্ষী ও পরনির্ভরশীল জীবন-যাপন করছে। পদোন্নতির আশায় অনেক অখাদ্য হজম করে উপরের দিকে চেয়ে থেকে দিন গুনছে। অথচ যারা স্বপ্নে রং মেশাতে জানে, দূরদর্র্শী চিন্তায় দৃশ্যায়ন করতে পারে, দিনশেষে তারা-ই সফল হয়। বর্তমানে তরুণদের মধ্যে অনেকেই নিজের মতো পেশা বেছে নেয়ার সাহস দেখাচ্ছে, তারা সফলও হচ্ছে। কেউ হয়তো বাড়ি-ঘর, অবকাঠামো নির্মাণের জন্য স্থাপত্যবিদ্যায় পড়া শেষ করে হয়ে উঠছেন পেশাদার চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করে লিখছেন রহস্যময় গল্প, উপন্যাস। বহুজাতিক কর্পোরেট পেশা ছেড়ে কেউ হয়ে উঠছেন পেশাদার কমেডিয়ান কিংবা ক্যামেরাম্যান। প্রজাপতির ছবি তোলার নেশায় কেউ ছুটছেন অবিরত। মনের ঝোঁককে প্রাধান্য দেয়ার এই প্রবণতা ইদানীং আরও প্রবল হচ্ছে। অবশ্য অনেকে এটাকে পাগলামি ছাড়া কিছুই বলবে না। বলিউডের কিং খাঁনখ্যাত শক্তিমান অভিনেতা শাহরুখ খাঁন বলেন, ‘সুখী ও সফল জীবনের জন্য নিজের ভিতরের পাগলামীকে আশ্রয় দিন। পাগলামীর চেয়ে বড় ওষুধ আর নেই। বিশ্বের যত সৃজনশীল লোক আছেন, যতলোক বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যারাই আবিষ্কার করেছেন, উদ্ভাবন করেছেন নিজের ভিতরের পাগলামীকে সঙ্গী করে সফল হয়েছেন’।

কাজের ধরন ও ধারণা

কাঙ্ক্ষিত কাজ সম্পর্কে সঠিক ও স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে আপনি বিভ্রান্ত হবেন। কারণ আপনার পেশা নিয়ে আশপাশের মানুষের কৌতূহল ও কুট-কথার অন্ত নেই। এসবের প্রভাব থাকবে আপনার পেশা নির্বাচনে, উৎকর্ষ সাধনে। ধরুন, আপনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং বিভাগে কাজ করেন, ভালো বেতন ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু দেখবেন, সবাই বলতে শুরু করবে এটা তো একটা ঠুনকো চাকরি আজ আছে, কাল নাই! বেতন বেশি হলে কী হবে, কাজটা তো পথে পথে ফেরি করে বেড়ানো; খুব পরিশ্রম। অবার হয়তো আপনি ব্যাংকে চাকরি করলে বলবে এ তো কেরানিগিরি ছাড়া কিছুই নয়। কোট-টাই পরা ভদ্র কেরানি! পুলিশের যত বড় অফিসারই হোন না কেন, একদল লোক বলবে এটা দাঁড়োয়ান বা পাহারাদারের চাকরি। আর দীর্ঘ সাধনা ও পড়াশোনার পর সরকারি কোনো অফিসার হলেন, আগেই বলবে ঘুষ ছাড়া তো সংসার চলবে না। তাই অন্যের কথা শোনা বাদ দিয়ে এবার নিজের কথা শুনুন। কথায় আছে ‘পিছু লোকে কিছু বলে’ সে কথায় কান দিতে নেই।

পেশা পথের প্রস্তুতি

সক্রেটিস বহু আগেই বলে গেছেন, ‘নিজেকে জানো’। কোন পেশা আপনার উপযোগী বা আপনি কোনটার উপযুক্ত তা জানাটা সবচেয়ে বড় শিক্ষা। পবিত্র হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ‘যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সে কাজ সহজ’।

সহজ কাজটি খুঁজে বের করার জন্য প্রয়োজন আগে নিজেকে জানা। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতার একটি চরণ আছে এরকম- ‘নিজেকে প্রশ্ন কর কোন পথে যাবে’।

এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য ঠাণ্ডা মাথায় কিছুক্ষণ ভেবে কিছু বিষয় লেখা শুরু করি আসুন-

আপনি নিজেকে কি হিসেবে দেখতে চান? যেমন হতে পারে কোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহী, প্রধান সম্পাদক, বিভাগীয় প্রধান, গবেষণা প্রধান ইত্যাদি। লিখে ফেলুন। প্রয়োজনে একাধিক পদের প্রস্তাবও রাখতে পারেন।

কাক্সিক্ষত পদে যেতে কত বছর সময় লাগবে? ধরুন ২৫ বছরে সেখানে পৌঁছাবেন। তাহলে পাঁচটি ভাগ করে নিন পাঁচ বছর করে। এবার করে ফেলুন পেশা-পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা।

এই সময়ে কী কী করা লাগবে এবং কীভাবে আপনি তা করবেন সেটি ঠিক করে ফেলুন। যেমন এই সময়ে বাড়তি কোন কোন প্রশিক্ষণ বা ডিগ্রি নেবেন, কি কি বা গবেষণা প্রয়োজন হতে পারে, কাদের কি ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে ইত্যাদি।

এই কাজগুলো করতে নিজের মানসিক, পারিবারিক ও পারিপার্শিক অবস্থা অনুকূলে থাকবে কিনা তা ভবুন। বাবা, মা, স্ত্রী, সন্তান এমনকি প্রতিবেশীরা কীভাবে সম্মতি ও সহায়তা দিতে পারে তা ভেবে রাখুন। বাধাগুলোও চিহ্নিত করে বের করুন।

এবার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পালা। অপ্রয়োজনীয় ও অসম্ভব মনে হওয়া পয়েন্টগুলো মুছে ফেলুন। দেখবেন মনে হবে, মন থেকেও মুছে যাচ্ছে। মনটা হালকা হবে। আত্মবিশ্বাসে ভরে উঠবেন আপনি। তারপর, সাধ ও সাধ্যনুযায়ী সম্ভাব্য কাজ খুঁজে শুরু করে দিন পেশা পথের প্রস্তুতি।

লেখক : পেশাবিষয়ক লেখক ও সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত