প্রকাশ : ১১ নভেম্বর, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
চাকরির শুরুতেই অবৈধ এগ্রিমেন্ট

কাউকে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত চুক্তি করিয়ে কোনো চাকরিতে থাকতে বাধ্য করা আইনত সম্পূর্ণ অবৈধ। আর আমাদের অনেকেই এই অবৈধ শর্তের কাছে জিম্মি। প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের চুক্তির কারণে অনেক তরুণের ক্যারিয়ার হুমকির সম্মুখীন হয়। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয় ফ্রেসাররা। এ বিষয়ে আইন কি বলে এবং ভিকটিম কিভাবে কোথায় আইনি সহায়তা পাবেন সেরকম বিষয়ে পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা দিয়েছেন অ্যাডভোকেট ও লেবার ল’ ট্রেইনার মোহাম্মদ বাবর চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিয়াজ আহমেদ

নিয়াজ আহমেদ : যেহেতু আমি একজন সিভি রাইটার, তাই অনেকের অনেক সমস্যাই আমাকে শুনতে হয়। সেদিন এক ক্লায়েন্ট আমাকে ফোনে জানাল তাকে কোম্পানিতে জয়েন করার সময় তার মেইন সার্টিফিকেট জমা নেয়া হয়েছে। তাকে দিয়ে ৫ লাখ টাকার ব্ল্যাংক চেকে সই নেয়া হয়েছে। এখন ভালো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে জব চেঞ্জ করতে পারছে না। সব সময় মানসিক দুশ্চিন্তায় আছে। এভাবে জোর করে চাকরি করতে বাধ্য করানোটা কতটা ঠিক?

বাবর চৌধুরী : কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, কোনো কর্মীকে শুধু উক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি পরিসমাপ্তিতে বাধা প্রদানের জন্য বা সংশ্লিষ্ট কর্মীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে বাধ্য করার জন্য স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তি দ্বারা দায় সৃষ্টি করা বা স্বীকারোক্তির (বন্ড) আদায় করে দায় সৃষ্টি করা বা সনদপত্র জমা রেখে সংশ্লিষ্ট কর্মীর চাহিদা অনুসারে ফেরত প্রদানে অস্বীকার করা বা খালি চেক রেখে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে বাধ্য করা অথবা উক্ত যে কোনো কাজ বা স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তির শর্ত দ্বারা কোনো প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ (সম্পৃক্ত) করতে বাধ্য করা সম্পূর্ণ বে-আইনি এবং দন্ডনীয় অপরাধ।

কেননা এ ধরনের কাজ বা চুক্তি দ্বারা জবরদস্তি শ্রমের সৃষ্টি হয়, যে কাজ বা চুক্তি দ্বারা জবরদস্তি শ্রমের সৃষ্টি হয় সে কাজ আইনসম্মত নয় এবং এ ধরনের সৃষ্ট চুক্তি আইনের ভাষায় বাতিল চুক্তি। বাতিল চুক্তি কখনও আদালত বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক কার্যকর করা যায় না বিধায় ওই চুক্তি সংশ্লিষ্ট পক্ষ লংঘন করলে কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না অর্থাৎ এ ধরনের চুক্তি পত্রে লিখিত দায় সৃষ্টি করা হলেও তা দায় হিসেবে পরিগণিত হয় না।

এখানে উল্লেখ্য, যদি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং কোনো কর্মী (নিয়োগ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মকালীন সময়ে) একমত হয়ে যদি উভয় পক্ষ কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করে যে; প্রতিষ্ঠান ওই কর্মীর পেশাগত উন্নয়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অথবা কোনো অতিরিক্ত সুযোগ (যেমন ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য গাড়ি ক্রয় করা) সম্প্রসারণের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করিবে এবং ওই বিনিয়োগের ফলশ্রুতিতে সংশ্লিষ্ট কর্মীর অর্জিত পেশাগত দক্ষতা এবং যোগ্যতা অথবা প্রদত্ত অতিরিক্ত সুযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত কাজ করিবেন যার ফলশ্রুতিতে প্রতিষ্ঠান তার বিনিয়োগকৃত অর্থ ওই কর্মীর দক্ষতাসমৃদ্ধ সেবা (কাজ) গ্রহণের মাধ্যমে ফেরত পাবেন এবং ওই সেবা গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠান লাভবান হবেন।

তিনি যদি চুক্তি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত স্বেচ্ছায় কাজ করিতে ইচ্ছুক না হন তবে তার পেশাগত উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য অথবা সম্প্রসারিত অতিরিক্ত সুযোগের জন্য কোম্পানির বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত প্রদান করিবেন। যেহেতু কোম্পানির বিনিয়োগকৃত অর্থের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মী যে দক্ষতা এবং যোগ্যতা অর্জন করেছেন তা চুক্তি অনুসারে নির্ধারিত সময় কাজ না করে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে গেলে কোনো মতে ওই কর্মীর নিকট থেকে দক্ষতা বা যোগ্যতা আলাদা করে রাখা অথবা তার জন্য অতিরিক্ত সুযোগ সম্প্রসারণে কোম্পানির ব্যয়িত অর্থ তার সেবা গ্রহণের মাধ্যমে ফেরত পাওয়া সম্ভব নয় এবং তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করানোও জবরদস্তি শ্রম হিসেবে পরিগণিত হবে যা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ।

এ ধরনের পেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট কর্মী যদি ওই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে অনিচ্ছুক হন তবে তিনি চুক্তির শর্ত অনুসারে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ (প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকৃত অর্থের জন্য) প্রদান করে ওই প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করতে পারবেন। এ ধরনের চুক্তি আইনসম্মত এবং আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক কার্যকর করা যায়।

নিয়াজ আহমেদ : আপনার মতে কারা এই ধরনের অবৈধ চুক্তি করতে বাধ্য করে?

বাবর চৌধুরী : কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ভিত দুর্বল থাকে এবং তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা দিয়ে প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছায় কাজ করাতে পারে না। ফলে তাদের আশংকা থাকে কর্মীরা অন্য প্রতিষ্ঠানে অধিক সুযোগ সুবিধা পেয়ে চলে যাবে। এ ধরনের যাওয়া রোধ করতে প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে কর্মীদের জিম্মি করে রাখার চেষ্টা করে।

নিয়াজ আহমেদ : এই ধরনের চুক্তি হলে ভিকটিম প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কি কোনো আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবেন?

বাবর চৌধুরী : এ ধরনের চুক্তি আইন অনুসারে অবৈধ, কাজেই এর বিপরীতে কোনো আইনি লড়াইয়ে কোনদিন কোম্পানি জয়ী হতে পারবে না। কারণ চুক্তি সাধারণত যে আইনে কার্যকর করা হয় তা হল সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ২১ ধারা অনুসারে এ ধরনের চুক্তি আদালত দ্বারা কার্যকর করা যায় না।

এখানে উল্লেখ্য যে, প্রথমে নিয়োগপত্রের চুক্তির শর্তসমূহ দেখতে হবে যদি নিয়োগপত্রের চুক্তির শর্ত অনুসারে কাজ করার কথা উল্লেখ থাকে এবং কাজ না করলে পাঁচ লাখ টাকা প্রদানের বিষয় উল্লেখ থাকে তবে এ ধরনের চুক্তি বাতিলযোগ্য চুক্তি এবং আইনগতভাবে কোনদিনই কার্যকর করা যায় না। জবরদস্তি শ্রমের বিষয়টি শ্রম আইন নয়, শ্রম আইনের ভিত্তি যে আইন সেখানে উল্লেখ আছে স্পষ্ট করে। এটি অবৈধ।

কিন্তু চুক্তিপত্রে যদি উল্লেখ থাকে কোম্পানি সংশ্লিষ্ট কর্মীর পেশাগত উন্নয়নে বা অন্য কোনো বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত কারণে কোনো বিনিয়োগ করে এবং ওই বিনিয়োগ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ওই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার শর্তে করা হয় এবং কাজ করার অপারগতায় ওই কর্মী চুক্তি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে উল্লেখ থাকে তবে তা আইনসম্মত এবং বৈধ। এক্ষেত্রে যদি ৫ বছরের মেয়াদকালের মধ্যে ২ বছর পার হয়ে যায় তাহলে ওই হারে পে-ব্যাক করতে হবে।

নিয়াজ আহমেদ : অনেক কোম্পানি বলে, আমাদের পলিসি এভাবেই করা, তাহলে এটা যে অবৈধ সেটার রেফারেন্স কি?

বাবর চৌধুরী : শ্রম আইনের ভিত্তি বলতে আমি বাংলাদেশ সংবিধানের কথা বলছি, বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে দুটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ব্যতিত সকল প্রকার জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ; এবং এই বিধান কোনো ভাবে লংঘিত হইলে তাহা আইন আইনত : দন্ডনীয় অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে।

এছাড়া জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ১৯৫৭ সালে একটি কনভেনশন প্রণয়ন করে। যাহা হল কনভেনশন নং ১০৫: বল প্রয়োগ শ্রমের বিলোপসাধন কনভেনশন, ১৯৫৭। এটি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুসমর্থিত হয়।

তাই বলা যায় ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ওখঙ কনভেনসন অনুসমর্থন এবং উক্ত অনুসমর্থনের আলোকে সংবিধানে তা স্পষ্টকরণ মূলত বাংলাদেশে জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ হয়েছে। পক্ষান্তরে জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধকরণ বিষয়টি সার্বজনিন এবং বাংলাদেশের অভ্যান্তরে কর্মরত সকল কর্মীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

তবে শ্রম আইন যাদের জন্য প্রযোজ্য তাদের ক্ষেত্রে”জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধকরণ নীতিটি ILO করভেনশন এবং সংবিধানে উল্লেখিত সংশ্লিষ্ট ধারা আলোকে প্রায়োগিক প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন কৌশল উল্লেখ আছে।

যেমন শ্রম আইনের ২৭ ধারায় একজন শ্রমিকের যে কোনো সময় প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করার বিষয়টি স্পষ্ট করে বলা আছে, কোনো শ্রমিক প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করতে চাইলে সে উক্ত ধারা অনুসরণ করে পদত্যাগ করে প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করতে পারেন এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ উক্ত শ্রমিকের পদত্যাগ অনুমোদন না করলেও উক্ত শ্রমিক কর্তৃক প্রদত্ত নোটিশের সময় অতিক্রম বা নোটিশের পরিবর্তে মজুরি হস্তান্তর করলে উক্ত শ্রমিকের দায় শেষ এবং মালিক তাকে আর কোনোভাবে রাখতে পারবে না তাকে যেতে দিতে বাধ্য।

নিয়াজ আহমেদ : কারো কাছ থেকে যদি টাকার চেক নেয়া হয় বা সার্টিফিকেট আটকে রাখা হয় সেক্ষেত্রে ভিকটিম কি করতে পারে?

বাবর চৌধুরী : এক্ষেত্রে ভিকটিম তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাকে বাধ্য করে তারিখ বিহিন চেকটি আদায় করেছে তা উল্লেখসহ পুরো ঘটনার বিবরণ দিয়ে থানায় জিডি করতে পারেন, জিডির কপি নিয়ে কোম্পানিতে কাগজপত্র/চেক ফেরত চেয়ে এবং চুক্তিটি বাতিল মর্মে ঘোষণা করে উকিলনোটিশ পাঠাতে পারেন। ব্যাংকে জানিয়ে দিতে পারেন আপনার সংশ্লিষ্ট চেক নম্বরধারী চেকটি আপনার থেকে জোর করে আদায় করা হয়েছে এবং এটির বিরুদ্ধে জিডিসহ উকিল নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। এটি একটি বিরোধীয় চেক এবং কেউ এটি ব্যাংকে দাখিল করলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যেন জব্দ করেন

নিয়াজ আহমেদ : তাহলে কি আমরা এগ্রিমেন্ট করব না?

বাবর চৌধুরী : এগ্রিমেন্ট করবেন, যদি একমাসের নোটিশে জব চেঞ্জ করার কথা বলা থাকে তাহলে সময় মতো সেই নোটিশ দিবেন। কোম্পানি আপনার কিছুু করতে পারবে না। অরিজিনাল কাগজ চাইলে প্রথমে দিতে চাইবেন না। পরে যদি বেশি জোরাজুরি করে, তাহলে দিবেন। দিয়ে সোজা থানায় এসে জিডি করবেন। যে কর্মকর্তা আপনার কাগজ নিয়েছে তার নাম উল্লেখ করে জিডি করবেন। এরপর নিশ্চিন্তে জব করুন। অন্য কোথাও জব হলে, এক মাস বা দুই মাস আগে নোটিশ দিন। কাগজপত্র ফেরত না দিলে, থানায় জানান। উকিল নোটিশ দিন তার পরও কাজ না হলে আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করুন।

নিয়াজ আহমেদ : এই বিষয়ে আইনি সহায়তা কারা দেয়?

বাবর চৌধুরী : বিভিন্ন এনজিও বিনামূল্যে এ ধরনের সমস্যার আইনি সাহায্য দিয়ে থাকে। আপনি মোটেই এসব নিয়ে টেনশান করবেন না। নিশ্চিন্তে ক্যারিয়ার গড়ুন।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত