আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো    |    
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
আওয়ামী কানেকশনসহ নানা অভিযোগ
প্রভাবশালী ৪ নেতার ভূমিকা নিয়ে বিএনপিতে তোলপাড়
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে খোদ চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ৪ প্রভাবশালী নেতার ভূমিকা নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এসব নেতার আওয়ামী কানেকশন, বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা আর ওয়ান-ইলেভেন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত নানা বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ করে আসছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এদের কারণেই বিএনপি দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বারবার আন্দোলন-সংগ্রামে ব্যর্থ হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। অভিযুক্ত নেতারা অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, দলের অভ্যন্তরে থাকা প্রতিপক্ষ এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। কালের পরিক্রমায় তারা বিএনপির পরীক্ষিত সৈনিক।
বিতর্কের শীর্ষে রয়েছেন ওয়ান-ইলেভেনের মাইনাস টু ফর্মুলার অন্যতম কুশীলব হিসেবে অভিযুক্ত কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সভাপতি আলতাফ হোসেন চৌধুরী। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ৮ বছরে ১ দিনের জন্যও গ্রেফতার কিংবা জেলে যেতে হয়নি তাকে। এজন্য তার আওয়ামী কানেকশনকেই বড় করে দেখছেন সবাই। এছাড়া স্থানীয় রাজনীতি প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন আঁতাতের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে বহু পুরনো। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে আত্মীয়তার সূত্রে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা ছাত্রদলের সভাপতি গাজী আশফাকুর রহমান বিপ্লব বলেন, আলতাফের শ্বশুর ভোলার বাসিন্দা বসতউল্লাহ চৌধুরী ছিলেন শেখ মুজিবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই মো. বাবলু বিয়ে করেছেন তার শ্যালিকা ফারহানা রাজুকে। আরেক শ্যালিকা হেনার স্বামী লুৎফর রহমান রূপসী বাংলার এমডি।’
বিপ্লব বলেন, আলতাফ চৌধুরীর শ্যালক নাজিমউদ্দিন চৌধুরী জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব। কিছুদিন আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ছিলেন। মূলত এদের সম্বল করেই নিজেকে সব বিপদ থেকে মুক্ত থাকেন চৌধুরী। পাশাপাশি নানা কূট-কৌশলে ধরে রাখেন দলীয় পদ-পদবি।
সদ্য কারামুক্ত পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক স্নেহাংশু সরকার কুট্টি বলেন, দলে কোনো পদ-পদবি না থাকার পরও মাসের পর মাস জেলে পচে মরতে হয় আমাদের। অথচ জেলা সভাপতি আর কেন্দ্রের ভাইস চেয়ারম্যান হয়েও গায়ে ফুলের টোকাটি পর্যন্ত পড়ে না আলতাফ চৌধুরীর। আন্দোলন-সংগ্রামেও তাকে দেখা যায় না মাঠে।’
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আলতাফ হোসেন চৌধুরী বলেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক তো আর মুছে ফেলা যাবে না। দলের জন্য অনেক কিছু করেছি বলেই আজ আমার এ অবস্থান। তাছাড়া যাদের (আত্মীয়) কথা বলা হচ্ছে তাদের কাছ থেকে কখনও কোনো সুবিধা নেয়ার প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না।
দলের আরেক ভাইস চেয়ারম্যান বেগম সেলিমা রহমান। মহাজোট সরকারের বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেননের আপন বোন তিনি। বাড়ি বরিশালের বাবুগঞ্জে। প্রায় সার্বক্ষণিকভাবে দলীয় চেয়ারপারসনের কাছাকাছি থাকা এ নেত্রীর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। ওয়ান-ইলেভেনের সময় মান্নান ভূঁইয়ার পাশে থাকায় মূলধারার কর্মীদের বিরাগভাজন হন তিনি। নির্বাচনী এলাকায় নিজ দলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে মন্ত্রী ভাইয়ের দাপট ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বাবুগঞ্জ বিএনপির এক নেতা বলেন, ভাইয়ের সঙ্গে কোনো রকম রাজনৈতিক যোগসূত্র নেই বলে সবসময় দাবি করেন সেলিমা। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিএনপি আমলে তিনি যখন প্রতিমন্ত্রী তখন তার এপিএস ছিলেন যে আতিকুর রহমান সেই আতিকুর রহমানই এখন রাশেদ খান মেননের এপিএস। অভ্যন্তরীণ ঘনিষ্ঠতার এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে?
সেলিমা রহমান অবশ্য এসব অভিযোগের বিরোধিতা করে জানান, বিশ্বাসঘাতকতার কোনো ইতিহাস থাকলে দলে এতটা আস্থাভাজন আর এতবড় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকতে পারতেন না।
বিতর্ক কখনই পিছু ছাড়েনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ঝালকাঠী-২ আসনের সাবেক এমপি শাহজাহান ওমরের। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর সঙ্গে গোপন ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে এ নেতার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি ভেঙে আরেকটি নতুন বিএনপি গড়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠে তখন ওমর যাচ্ছেন সেই নতুন বিএনপিতে এমন গুঞ্জনও ছিল। আন্দোলন-সংগ্রামে কখনোই মাঠে না থাকার পাশাপাশি বর্তমান আওয়ামী শাসনামলে একটি মামলার আসামি কিংবা ১ দিনের জন্যও জেলে যেতে হয়নি তাকে।
ঝালকাঠী-২ আসনে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন করা বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সংস্কারে গিয়ে দলের সঙ্গে বেইমানি করাই শুধু নয়, আরও বহু আগে থেকেই বিতর্কিত রাজনীতি করে এসেছেন তিনি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকারীদের একজন কর্নেল দেলোয়ার তার আপন ভগ্নিপতি। মাত্র ক’বছর আগ পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের জন্ম কিংবা মৃত্যুবার্ষিকীর কোনো আয়োজনে যোগ দিতেন না তিনি। দেলোয়ারের স্ত্রী নূরজাহান বর্তমানে আওয়ামী লীগের একজন বেনিফিশিয়ারি। মাঝে একবার খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে ওবায়দুর রহমানের সঙ্গে গিয়েছিলেন ওমর।
রফিকুল অভিযোগ করেন, তার আরেক ভগ্নিপতি আলাউদ্দিন ক্ষমতাসীন দলের দারুণ আস্থাভাজন। এ ব্যক্তির মাধ্যমেই ওমর তার বিপুল অংকের কালো টাকা সাদা করেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে শাহজাহান ওমর বলেন, এসব তো মীমাংসিত বিষয়। বিশ্বস্ততার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি বলেই তো আমাকে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার পদ দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে বির্তকের কোনো সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা পালন করলেও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজের ওপর এখনও ওয়ান-ইলেভেনের প্রেতাত্মা ভর করেছে- এমন অভিযোগ তার নির্বাচনী এলাকা তজুমদ্দিন এবং লালমোহনের নেতাকর্মীদের।
তাদের অভিযোগ, দলীয় গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে লালমোহন ও তজুমদ্দিন বিএনপির যে কমিটি করেছেন তাতে ঠাঁই পেয়েছেন সেসব নেতা যারা ওয়ান-ইলেভেনে তার সঙ্গে থেকে তালা ভেঙে পল্টন অফিস দখল করেছিলেন।
তজুমদ্দিন উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গত ৮ বছরে যখন বড় কোনো মামলার আসামি না হওয়া কিংবা খুব বেশিদিন তাকে জেলে থাকতে হয়নি তখন বোঝার বাকি থাকে না যে তিনি কাদের লোক।
ভোলা জেলা বিএনপি নেতা আক্তারুজ্জামান টিটব বলেন, নির্বাচন কমিশনে এখনও বিএনপির অস্থায়ী মহাসচিব হিসেবে তার নাম রয়েছে। তিনি সেখানে আজ পর্যন্ত কোনো পদত্যাগপত্র কিংবা চিঠি পাঠাননি। ওয়ান-ইলেভেনের সময় যখন ইসি থেকে তাকে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে চিঠি পাঠানো হয় তখন এর প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছিল বিএনপি। জবাবে হাইকোর্টে রিট পর্যন্ত করেন হাফিজ।
টিটব বলেন, মূলধারার বাধার মুখে যে লোক টানা ৬-৭ বছর ধরে নির্বাচনী এলাকায় যেতে পারেন না তাকে আর যাই হোক আমরা নেতা হিসেবে মানি না।
এসব অভিযোগের জবাবে মেজর (অব.) হাফিজ বলেন, ক্ষমতাসীন দলের হামলা-মামলার বিষয়টি কারও অজানা নয়। আমার বিশ্বস্ততার বিষয়ে দলের শীর্ষ নেতারা খুব ভালো করেই জানেন। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে জানমাল বাঁচাতে অনেক কিছু করতে হয়। তার মানে এই নয় যে আমি দলীয় আদর্শ থেকে সরে এসেছি। সবই আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত