• শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০
বাসস    |    
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
জন্মবার্ষিকীর আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা
বেগম মুজিবের দূরদর্শিতাই বাংলার স্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছিল
শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৬তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা -যুগান্তর

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার জীবনের অনেক অজানা তথ্যের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এই মহীয়সী নারীর দূরদর্শিতাই বাংলার স্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছিল। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের তৎকালীন অনেক নেতৃবৃন্দের আপত্তি সত্ত্বেও বেগম মুজিবই তাকে (বঙ্গবন্ধু) আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে পাক সামরিক সরকারের সঙ্গে বৈঠকে বসতে নিষেধ করেছিলেন। পাক সামরিক সরকার তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল বলেই বাংলার স্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছিল। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।

প্রধানমন্ত্রী সোমবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার ৮৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নারী ও শিশু মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও আমার মা বাবাকে সহযোগিতা করতেন। বাবার সার্বক্ষণিক ছায়াসঙ্গী আমার মাকে শত ঘাত-প্রতিঘাতেও ভেঙে পড়তে দেখিনি।

’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে আটকাবস্থা থেকে ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে যায় পাক সামরিক সরকার। ৬ মাস পর্যন্ত তার কোনো হদিস ছিল না। আমরা জানতেও পারিনি তিনি বেঁচে আছেন কিনা। এরপরে কোর্টেই বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখার সুযোগ হয়। তখন পাকিস্তান সরকার আম্মাকে ভয় দেখায়- বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তি না নিলে তিনি বিধবা হবেন।

প্রধানমন্ত্রী সেদিনের স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, আম্মা সোজা বলে দিলেন, কোনো প্যারোলে মুক্তি হবে না। নিঃশর্ত মুক্তি না দিলে কোনো মুক্তি হবে না। তিনি বলেন, আমি মায়ের সিদ্ধান্তের কথা কোর্টে যখন বঙ্গবন্ধুকে জানালাম তখন অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকেও দেখেছি তারা বলেছেন, তুমি কেমন মেয়ে, বাবার মুক্তি চাও না? আম্মাকে বলেছে- ভাবী, আপনি কিন্তু বিধবা হবেন। আমার মা তখন কঠিন স্বরেই বলেছেন, প্যারোলে মুক্তি নিলে মামলার আর ৩৪ জন আসামির কী হবে।... বঙ্গবন্ধু প্যারোলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। গণঅভ্যুত্থানে পাকিস্তান সরকার আব্বাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ একশ’টি ভাষণের অন্যতম বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘... তখন নানা জনে নানা পরামর্শ দিচ্ছে আব্বাকে। আম্মা বললেন, তোমার যা মনে আসে, তাই তুমি বলবে... তুমি রাজনীতি করেছ... কষ্ট সহ্য করেছ... তুমি জানো কী বলতে হবে। কারও কথা শোনার দরকার নেই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু তার জীবনে বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ে বহুবার জেলে গেছেন। জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন। কিন্তু কোনোদিন ‘মা’কে কোনো আক্ষেপ করতে দেখিনি। কোনো হা-হুতাশ ছিল না। তার কাজ তিনি নীরবেই করে গেছেন। স্ত্রী হিসেবে তিনি বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু কোনো অভাব অভিযোগ দেখিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার ‘মা’ বিশ্বাস করতেন যে তার স্বামী (বঙ্গবন্ধু) দেশের জন্য কাজ করছেন। দেশের মানুষের জন্য কাজ করছেন। শেখ হাসিনা বেগম মুজিবের ধৈর্য, সহনশীলতা ও স্বামীর প্রতি কর্তব্যবোধের কথা উল্লেখ করে বলেন, আমার ‘মা’ একাধারে সংসার সামলেছেন, আমাদের লেখাপড়া করিয়েছেন, আবার আদালতে দৌড়াদৌড়ি করে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে সংগঠনের নেতাকর্মীদের জন্য টাকা জোগাড় করে সংগঠনটাও তাকেই সচল রাখতে হয়েছে। ... কিন্তু কোনোরূপ প্রচারের মধ্যে ছিলেন না, অত্যন্ত প্রচারবিমুখ ছিলেন তিনি।

নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান সেলিনা হোসেন, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রেবেকা মোমেন এমপি এবং জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান মমতাজ বেগম বক্তৃতা করেন। নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমা বেগম অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার ‘মা’ নিজের জন্য কখনও কিছু চাননি। অথচ সারাজীবন এই দেশের কল্যাণে, মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। তিনি এ দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। আব্বার সঙ্গে থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন- এ দেশের মানুষ ভালো থাকবে, সুখে-শান্তিতে বাস করবে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাবার পাশে থেকে স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করেছেন। মায়ের আত্মত্যাগ বাবাকে এগিয়ে নিয়েছে বলেই স্বাধীনতা এনে দিতে পেরেছেন তিনি। এ স্বাধীনতার জন্য মায়ের অবদান অবিস্মরণীয়- উল্লেখ করে তিনি বলেন, দলের কাজকর্ম, আন্দোলন-সংগ্রামে নিজের সম্পদ দিয়ে সাহায্য করতেন মা। মা-বাবা কখনও আমাদের অভাব বুঝতে দেননি। কৌশলে সেসব অভাব মেটাতেন, আর আমাদের ভিন্নভাবে বোঝাতেন। মানুষকে কখনও না বলতে পারতেন না। তার কাছে নেই বলে কিছু ছিল না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক ধৈর্য ধরে পরিবার সামলাতেন মা। আব্বা বারবার কারাগারে যাওয়ার ফলে এমনও দিন গেছে যে, বাজার করতে পারেননি। আমাদের বলেননি, আমার টাকা নেই। চাল-ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে আচার দিয়ে বলতেন, চলো আজ আমরা খিচুড়ি খাব।

অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী বেগম মুজিবকে জীবন্ত টেপ রেকর্ডার বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুব অল্প বয়সেই সংসারী হওয়ায় আমার মা আর আমার মধ্যে বয়সের ব্যবধান খুব বেশি ছিল না। আমিই ছিলাম মায়ের সঙ্গী। আমার বাবা-মায়ের মধ্যে বোঝাপড়াটা খুব ভালো ছিল। বাবাকে কোনো পরামর্শ দিতে হলেই আমি চলে যেতাম মা’র মিশন নিয়ে। বাবা ভিড়ের মধ্যেও আমাকে একবার দেখলেই বুঝতে পারতেন ‘জরুরি কোনো মেসেজ আছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গমাতাই বোধ হয় সবচেয়ে আগে জানতেন, এই দেশ একদিন স্বাধীন হবে। এজন্য তিনি কোনোদিন করাচিতে যাননি, যেতেও চাননি। তিনি বলেন, একদিন ভুট্টো আমাদের বাড়িতে এলে ‘মা’ তার সঙ্গে দেখাও করেননি। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে সব সময় পর্দার আড়াল থেকেই কথা বলেছেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘মা বলেছিলেন, ওদের সঙ্গে থাকব না, দেখা করব কেন?’ এভাবেই তিনি স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।

স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের ওপর নেমে আসা পাকিস্তানি শাসকদের জুলুম-নির্যাতনের কথাসহ আগুনঝরা সেই দিনগুলোতে দেশের মানুষের জন্য বঙ্গমাতার ত্যাগের কথাও বর্ণনা করেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও ১৭ ডিসেম্বর তারা ধানমণ্ডির একটি বাড়িতে পাক বাহিনীর বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান। দেশ স্বাধীন হলেও জানি না আব্বা বেঁচে আছেন কিনা? এ সময়টায় আম্মার যে মনোবল আমরা দেখেছি, তা কল্পনা করা যাবে না। স্বামীকে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গেছে, দুই ছেলে মুক্তিযুদ্ধে, তিনি তিন সন্তানসহ গৃহবন্দি। সবার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। অসীম সাহস এবং ধৈর্য নিয়ে মা এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন।

তিনি বলেন, মা সেদিন পাকিস্তানি হাবিলদারদের ডেকে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘হাতিয়ার ডাল দো’ (নিয়াজি সারেন্ডার করেছে, তোমরাও করো)। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সম্ভ্রমহারা নির্যাতিতা নারীদের জন্য আমার মা নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলেন। তাদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও জীবিকার ব্যবস্থা করেন। বহু নারীর বিয়ের ব্যবস্থা করেন। তার নিজের গহনা, আমাদের গহনা পর্যন্ত দিয়েও তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করেন। একবার এক ১৪ বছরের ধর্ষিতা এক বালিকার সঙ্গে দেখা করে আসার পর তার মায়ের কী পরিমাণ কষ্ট হয়েছিল তার উল্লেখ করে মানুষের প্রতি বেগম মুজিবের গভীর মমত্ববোধের একটি চিত্রও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

অতীতের চড়াই-উতরাই জীবন স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আব্বাকে গ্রেফতার করা হল। তিন দিনের নোটিশে আমাদের বাড়ি ছাড়তে হল। মালপত্র নিয়ে আমরা রাস্তায় আশ্রয় নিলাম। মাত্র কিছুদিন আগে আমরা ঢাকায় এসেছি। কিন্তু আম্মা বিচলিত হলেন না, বাসা খুঁজতে আরম্ভ করে দিলেন। জীবনে সরকারি বাসা থেকে সরাসরি রাজপথে এসে পড়ার মতো দুর্বিপাক জীবনে বহুবার এলেও বেগম মুজিব অনমনীয় দৃঢ়তায় তা সামলে নিয়েছেন। আবার সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন। এ সময় পাক সামরিক জান্তার নজর এড়িয়ে বেগম মুজিব বহুদলীয় সভায় যোগ দিয়েছেন। ছাত্রলীগের সঙ্গে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগের পাশাপাশি রাজধানীজুড়েই তার নিজস্ব নেটওয়ার্কে তিনি সব খবরাখবর পেতেন বলেও শেখ হাসিনা জানান।

একটা সময় ৬-দফা না ৮-দফা হবে তা নিয়ে মতবিরোধে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাও ৮-দফার পক্ষে চলে গিয়েছিলেন উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ৬-দফা থেকে একচুল এদিক-ওদিক যাবে না- এইটেই ছিল তার সিদ্ধান্ত। এটা আব্বা বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের নেতারা উঠে-পড়ে লাগলেন। ৮-দফা খুবই ভালো, ৮-দফা মানতে হবে। তখন তার মায়ের ৬-দফার পক্ষে অবস্থানের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, মা বলেছিলেন, শুধু এটুকুই বুঝি ৬-দফাই হচ্ছে বাংলার মানুষের মুক্তির সনদ, এটা উনি (বঙ্গবন্ধু) বলে গেছেন, এইটেই মানি, এর বাইরে কিছু মানি না।

রাজনৈতিকভাবে তিনি কতটা সচেতন ছিলেন, সেটা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মা’র জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে। কিন্তু মাকে কখনও ভেঙে পড়তে দেখিনি। কখনও দেখিনি বাবাকে রাজনীতি ছেড়ে দিতে বলেছেন। কোনো প্রয়োজনেও বাবাকে বিরক্ত করেননি তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই আগস্ট মাসে আমার মা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্ম হয়েছে এবং আমার ভাই শেখ কামালের জন্ম হয়েছে। আবার এ মাসেই ঘাতকরা আমার মা-বাবা, ভাই কামাল, জামাল, রাসেলসহ পরিবারের ১৮ সদস্যকে হত্যা করেছে। দেশবাসীর কাছে ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্য দোয়া প্রার্থনা করে শেখ হাসিনা বলেন, এই দেশের স্বাধীনতা অর্জনে আমার মায়ের ভূমিকা ছিল। এ বিষয়টি সবার জানা দরকার। না হলে আমি একদিন মরে গেলে এই তথ্য তো অজানাই থেকে যাবে।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত