• মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০
হাসান আদিব, রাবি    |    
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
প্রাথমিক চিকিৎসাও মেলে না মেডিকেল সেন্টারে
রাজশাহী ৩
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্র -যুগান্তর

ইসিজি, ডিজিটাল এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি, প্যাথোলজি বিভাগ, আইসোলেশন ওয়ার্ড আছে, নেই শুধু এসব ব্যবহারের জন্য স্থায়ী টেকনিশিয়ান আর চিকিৎসা দেয়ার বিশেষজ্ঞ। যে ক’জন চিকিৎসক দিয়ে কোনোমতে কার্যক্রম চলছে, তারাও অনিয়মিত এবং নির্ধারিত সময়ে অফিসে না থেকে বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পদশূন্য আর ছুটিতে রয়েছেন বেশ ক’জন। জরুরি বিভাগেও নেই স্থায়ী চিকিৎসক। সকালের দিকে সামান্য সেবা মিললেও দুপুর গড়াতেই কার্যত বন্ধ হয়ে যায় চিকিৎসা। দিনের বাকি সময়টায় প্রাথমিক চিকিৎসা সেবাও মেলে না। তারপরও যারা চিকিৎসার জন্য যান তাদের অনেককেই চেকআপ ছাড়াই পাঠিয়ে দেয়া হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে।

এই চিত্র দেশের অন্যতম বৃহৎ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের। বার্ষিক নির্দিষ্ট হারে ফি দিয়েও ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা না পেয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা নিতে গিয়ে পদে পদে ভোগান্তির শিকার এসব শিক্ষার্থীর অভিযোগের অন্ত নেই।

খাতা-কলমে ২৪ জন চিকিৎসক মেডিকেল সেন্টারে থাকার কথা থাকলেও দু’জন ছুটিতে, আর তিনটি পদ শূন্য। যে ১৯ জন চিকিৎসক রয়েছেন, তাদের কেউই বিশেষজ্ঞ নন। এছাড়া খণ্ডকালীন কয়েকজন টেকনিশিয়ান রয়েছেন। দিনের প্রথম শিফটে (সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা) থাকেন বেশির ভাগ চিকিৎসক। বাকি দুই শিফটে (দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা, রাত ৮টা থেকে সকাল পর্যন্ত) প্রায়ই চিকিৎসক বা টেকনিশিয়ানের দেখা মেলে না। দ্বিতীয় শিফটের দায়িত্বে থাকা ডা. এএফএ জাহিদ, ডা. নূরমহল বেগমকে প্রায়ই নির্ধারিত সময়ে পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। অফিসার্স সমিতির সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে দেখা মেলে না ডা. মাসিহ্উল আলম হোসেনেরও। নির্ধারিত সময়ে মেডিকেল সেন্টারের পরিবর্তে রাজশাহী মহানগরীসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তিগত চেম্বারে সময় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান বলেন, আমার বন্ধুর কয়েকবার বমি হওয়ায় বুধবার (৩ আগস্ট) রাতে মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাই। চিকিৎসক তাকে কোনো প্রকার চেকআপ ছাড়াই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। একই অভিযোগ করেন উদ্ভিদবিদ্যা, ইতিহাস, মার্কেটিং, সমাজকর্ম বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীও।

সরেজমিন দেখা যায়, বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত দেড় ঘণ্টায় ৪৫ জন রোগী আসে মেডিকেল সেন্টারে। এর মধ্যে ১৭ জনকে কোনো প্রকার চেকআপ ছাড়াই রামেক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ৭ জন জ্বর ও সর্দি-কাশির চিকিৎসা নিতে আসেন। চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বের হয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের দু’জন শিক্ষার্থী জানান, সমস্যার কথা ঠিকমতো শোনার আগেই ওষুধ লেখা শেষ হয়ে যায়। শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ১৭ জন আসেন চিকিৎসা নিতে। এর মধ্যে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়া ৬ জনকে আনা হয়। তাদের সবাইকে সঙ্গে সঙ্গে রামেক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ফুটবল খেলতে গিয়ে পায়ে আঘাত পাওয়া একজনকেও চিকিৎসা ছাড়াই রামেকে পাঠানো হয়। ওই সময় দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক সলিল রঞ্জন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, কর্তৃপক্ষ আমাকে যেভাবে দিকনির্দেশনা দিয়েছে, সেভাবেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি। এখানে যেটুকু সুযোগ-সুবিধা রয়েছে তা দিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছি। তবে সুযোগ-সুবিধা থাকলেও জনশক্তি বৃদ্ধি করা হলে আরও মানসম্পন্ন সেবা দেয়া সম্ভব ছিল।

বিকল টেলিফোন : মেডিকেল সেন্টারে সার্বিক যোগাযোগের জন্য রাখা দুটি টেলিফোনের একটি সাড়ে তিন মাস ধরে নষ্ট। অন্যটি প্রায়ই ইচ্ছে করে ‘ব্যস্ত’ রাখা হয় বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। ফলে আবাসিক হলে থাকা কেউ রাতে গুরুতর অসুস্থ হলেও অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ফোন দিয়ে সাড়া মেলে না।

ছাত্রলীগ নেতাদের মাদক কেনার কাজে ব্যবহার হয় অ্যাম্বুলেন্স : মেডিকেল সেন্টারের তিনটি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে দুটি ছাত্রদের আর একটি ছাত্রীদের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে ছেলেদের জন্য নির্ধারিত অ্যাম্বুলেন্স দুটি রাত সাড়ে ৯টার পর প্রায়ই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ব্যবহার করেন বলে খোদ অ্যাম্বুলেন্সের চালকরা অভিযোগ করেছেন। তারা জানান, যেতে না চাইলে চালকদের হুমকি-ধমকি দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অ্যাম্বুলেন্সের দু’জন চালক শুক্রবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, শের-ই-বাংলা, হবিবুর, মাদারবখশ, বঙ্গবন্ধু হলের ছাত্রলীগের ছেলেরা প্রায়ই ব্যক্তিগত কাজে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে নেয়। রাতে লক্ষ্মীপুরে চা খাওয়ার নামে আজেবাজে জিনিস কিনতে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যায় তারা। হবিবুর ও মাদারবখশ হলের ছেলেরা কয়েক মাস আগে ইয়াবা কিনতে গভীর রাতে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গেলে বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ তা আটকে দেয়। পরে অনেক দেনদরবার করে ছাড়িয়ে আনা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক খালিদ হাসান বিপ্লব বলেন, বর্তমানে যারা দায়িত্বে আছেন তারা আসার পর এমন ঘটনা ঘটেনি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসক ডা. তবিবুর রহমান শেখ বলেন, এটা প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র। এখানে চিকিৎসা কাজে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, স্টাফ ও ওষুধের ঘাটতি রয়েছে। চাইলেও অনেক রোগীকে আমরা চিকিৎসাসেবা দেয়ার ঝুঁকি নিতে পারি না। কর্তৃপক্ষ আমাদের সেভাবে নির্দেশনা দেয়নি, আর সেই সক্ষমতাও নেই।

চিকিৎসকদের দেরিতে আসা ও অফিস সময়ে ব্যক্তিগত চেম্বারে সময় দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু চিকিৎসক দেরিতে অফিসে আসেন, এটা শুনেছি। কঠোর দিকনির্দেশনা দেয়া তা কমে আসছে। তবে অফিস সময়ে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখার বিষয়ে কোনো অভিযোগ এখনও পাইনি। অ্যাম্বুলেন্স ও টেলিফোন সমস্যা সম্পর্কে ডা. তাবিবুর বলেন, অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে অ্যাম্বুলেন্স অপব্যবহার করছে। ফলে প্রয়োজনে শিক্ষার্থীরা অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছে না। বিষয়টি আমরা কঠোর দৃষ্টিতে দেখছি। আর আমাদের এখানে টেলিফোন লাইনেই গলদ আছে। একটু বৃষ্টি হলেই লাইন পাওয়া যায় না। ফলে টেলিফোন সমস্যা হতে পারে, দ্রুত তা ঠিক করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলের সার্বিক তত্ত্বাবধানে গঠিত উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি ও প্রোভিসি অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, বর্তমান প্রশাসন মেডিকেলে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাসহ বেশকিছু চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েছে। ব্যবস্থাপনার অভাবে সেখানে সমস্যা হচ্ছে। বেশ কিছু চিকিৎসক ডিউটি সময়েও শহরে নিজের খোলা চেম্বারে রোগী দেখেন। প্রধান চিকিৎসককে এসব বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দ্রুত সমস্যা লাঘব হবে বলে আশা করছি।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত