কাজী জেবেল    |    
প্রকাশ : ১১ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
মিলেমিশে লুটপাট বিআরটিসিতে
১৭ ডিপোতে ১০ কোটি ৫৫ লাখ টাকার হদিস নেই * প্রায় ৯ কোটি টাকা জমা দিচ্ছেন না ১২ ডিপোর কর্মকর্তারা
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) ১৭টি ডিপোর কর্মকর্তাদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে ১৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১২ ডিপোতে নগদ প্রায় ৯ কোটি টাকা ধরে রাখা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এসব টাকা সংস্থার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে হাতে রেখে নানান ছলছুতোয় এ টাকা ভাগ-বাটোয়ারার চেষ্টা চলছে। এছাড়া ১৭টি ডিপো ১০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা সংস্থার তহবিলে জমাই দেয়া হয়নি। এ টাকা কোথায় কার কাছে রয়েছে সে বিষয়ে ডিপোর ম্যানেজাররা প্রধান কার্যালয়ে কোনো রিপোর্টও করেননি। ওই টাকা আদৌ বিআরটিসির খাতে জমা হবে কী না- তা নিয়ে সংশয়ে আছেন খোদ কর্তৃপক্ষ।

গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরি, সচল গাড়িকে অচল দেখিয়ে অর্থ আদায়, কম দামে নিুমানের পার্টস কিনে বেশি বিল আদায় চলছে পুরোদমে। এছাড়া যাত্রীদের পুরো ভাড়া জমা না দেয়াসহ নানান কায়দায় অনিয়ম চলছে সংস্থাটিতে। সংস্থার কিছু অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী, ইউনিয়ন নেতা ও ঠিকাদার মিলেমিশে এসব টাকা পকেটে তুলছেন। অথচ মাত্র ১৩ কোটি টাকার অভাবে প্রতিষ্ঠানটির দু’শ গাড়ি মেরামত করা যাচ্ছে না। ফলে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন যাত্রীরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে

সংস্থার দুর্নীতির বিষয়ে সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম বলেন, কত টাকা ক্যাশ ইন হ্যান্ড আছে এবং কি পরিমাণ জমা হয়নি তার পরিসংখ্যান আমার জানা নেই। তবে বেশি টাকা জমা না হওয়া অস্বাভাবিক। দীর্ঘদিন ধরে হিসাবের জেরে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গাড়িতে কতজন যাত্রী উঠেছেন, কতজনের ভাড়া আদায় হচ্ছে তা ম্যানেজারদের ওপর নির্ভর করছে। এক্ষেত্রে কিছুটা সিস্টেম লস আছে। অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাকে কেউ ঘুষ দিতে পারে না। তবে অন্য কোনো কর্মকর্তার দুর্নীতির বিষয়ে আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি না।

অভিযোগ রয়েছে, বাস ও ট্রাক ডিপোগুলো ঘিরে সংস্থার বেশ কিছু কর্মকর্তা, কর্মচারী, ঠিকাদার ও ইউনিয়নের নেতাদের নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে ওঠেছে। সংস্থার বাস ও ট্রাকগুলো নিজেদের আখের গোছানোর হাতিয়ার বানিয়েছেন তারা। গাড়ির ইজারা কে পাবে তা নিয়ন্ত্রণ করে ওই সিন্ডিকেট। এর খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ কর্মকর্তা, কর্মচারী ও যাত্রীরা।

জানা গেছে, সারা দেশে সংস্থাটির ১ হাজার ৫৩৮টি গাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে সচল ১ হাজার ৪৯টি। অচল অবস্থায় আছে ৩০০টি গাড়ি। বাকি প্রায় পৌনে দু’শ গাড়ি একেবারে অকেজো হয়ে গেছে। এসব গাড়ি মেরামতে বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় হবে, যা গাড়ি চালিয়ে আয় করা সম্ভব নয়। সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, সারা দেশের ১৯টি বাস ডিপো ও ২টি ট্রাক ডিপোর মাধ্যমে এসব গাড়ি পরিচালনা করা হয়। সংস্থাটি নিজস্ব আয় থেকে পরিচালন ব্যয়সহ বেতন-ভাতা ও অন্যান্য খরচ বহন করে বলে প্রচার চালায়। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কল্যাণপুর ও কুমিল্লা বাস ডিপো ছাড়া বাকিগুলোতে ২-৩ মাসের বেতন বকেয়া পড়ে আছে। জোয়ার সাহারা ডিপোতে সর্বশেষ এপ্রিল মাস পর্যন্ত বেতন দেয়া হয়েছে। অন্য ডিপোগুলোর প্রায় একই চিত্র। ২৪১টি গাড়ি মেরামতের জন্য সম্প্রতি প্রায় ৪৬ কোটি টাকা চেয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে ডিপিপি পাঠিয়েছে বিআরটিসি। এর মধ্যে ৫০টি ভলভো বাস মেরামতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ কোটি টাকা। বাকি ১৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯১টি বাস মেরামত খাতে।

জানা গেছে, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে মাসের পর মাস ধরে সংস্থাটির ১২টি ডিপোর কর্মকর্তাদের কাছে ক্যাশ ইন হ্যান্ড রয়েছে ৮ কোটি ৮৭ লাখ ৮৩ হাজার ৬৩ টাকা। সংস্থার এক চিঠিতে বিপুল টাকা হাতে রাখার বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এভাবে টাকা হাতে রাখার প্রবণতা আত্মসাতের শামিল এবং দণ্ডার্হ্য অপরাধ। ওই চিঠিতে বলা হয়, এসব টাকা জমা না দিয়ে ম্যানেজাররা অন্যত্র বদলি হয়ে গেলে বা দীর্ঘদিন বিল ভাউচার সমন্বয় না করে ধরে রাখলে তা ভুয়া বিল-ভাউচার অন্তর্ভুক্তি বা নানাবিধ অনিয়মের সুযোগ রয়ে যায়। কোনো অজুহাতেই এ বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ হাতে আছে এটা দেখানো গ্রহণযোগ্য নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে আরও দেখা গেছে, কুমিল্লা ডিপোর কাছে সর্বোচ্চ ৩ কোটি ১ লাখ টাকা ক্যাশ ইন হ্যান্ড রয়েছে। এছাড়া মতিঝিল বাস ডিপোর কাছে আছে ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। বরিশাল বাস ডিপোর কাছে ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা, চট্টগ্রাম বাস ডিপোতে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা আছে। এছাড়া ঢাকার উথলী (গাবতলী) বাস ডিপোতে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা আছে বলে উল্লেখ করা হয়। গাজীপুর বাস ডিপোতে ৫৬ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, রংপুর বাস ডিপোতে ৩৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, সিলেট বাস ডিপোতে ৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা, খুলনা বাস ডিপোতে ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা হাতে আছে। ঢাকার মোহাম্মদপুর বাস ডিপোতে ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা, মিরপুর দ্বিতল বাস ডিপোতে ৯৫ হাজার টাকা ও নরসিংদী বাস ডিপোতে ৭৮ হাজার ১১৬ টাকা ক্যাশ ইন হ্যান্ড রয়েছে।

সূত্র জানায়, ১৭টি ডিপোর কাছে বিভিন্ন সময়ে ১০ কোটি ৫৫ লাখ ২৩ হাজার ১০২ টাকা বকেয়া রয়েছে। ওই টাকা কোথায় রয়েছে তার সঠিক হদিস মিলছে না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বগুড়া ডিপোতে ২ কোটি ৩১ লাখ টাকা, সিলেট ডিপোতে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা, মতিঝিল ডিপোতে ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, ঢাকা ট্রাক ডিপোতে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে ৭৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, দ্বিতল বাস ডিপোতে ৯৫ লাখ টাকা, নরসিংদী বাস ডিপোতে ৪৮ লাখ টাকা রয়েছে। অন্য ডিপোগুলো হচ্ছে- বরিশাল, কল্যাণপুর, রংপুর, পাবনা, খুলনা, সোনাপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, উথলী ও গাজীপুর ডিপো। বিপুল পরিমাণ টাকা সংস্থাটির ব্যাংক হিসাবে জমা হয়নি। ফলে অর্থ সংকটে গাড়ি মেরামত করতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি।

কুমিল্লা ডিপোর ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামান তিন কোটি টাকা ক্যাশ ইন হ্যান্ডের বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, ডিপোর শুরু থেকে ওই পরিমাণ টাকা জমেছে। এগুলোর বিল ভাউচার জমা দেয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই ছাড়পত্র পাওয়া যাবে। ৪ লাখ ৬২ হাজার টাকা অ-জমার বিষয়ে তিনি বলেন, যাত্রী কম থাকায় গাড়ি চালিয়েও ঠিকাদাররা ওই টাকা দিতে পারেননি। ওই টাকা পরিশোধের জন্য তাদের চাপের মধ্যে রাখা হয়েছে।

ডিপোর ম্যানেজারদের বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ থাকলেও রহস্যজনক কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না। মাঝে মধ্যে ম্যানেজারদের বদলি করে দায় সারে সংস্থাটি। ঢাকার এক ডিপো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে ২৭ লাখ টাকা দুর্নীতির প্রমাণ মিললেও তিনি বহাল তবিয়তে রয়েছেন। চট্টগ্রাম বাস ডিপোতে অনিয়ম ও জালিয়াতি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ওই ম্যানেজারকে অন্য ডিপোতে বদলি করা হয়। একই অভিযোগ রয়েছে সংস্থাটির আরও কয়েকজন ম্যানেজারের বিরুদ্ধেও।





আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত