যুগান্তর রিপোর্ট    |    
প্রকাশ : ২০ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
অভিযুক্ত রবিনের পরিচয় জানে না পুলিশ!
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মামলা করবে পরিবার
আফসানা হত্যার বিচার দাবিতে শুক্রবার রাজধানীর বিজয়নগরে ছাত্র ইউনিয়নের মানববন্ধন -যুগান্তর

ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী আফসানা ফেরদৌসের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনার চার দিন পরও অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা হাবীবুর রহমান রবিনের পরিচয় পায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে রবিনের কয়েকজন বন্ধুকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করার দাবি করেছে পুলিশ। এদিকে এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারের দাবিতে শুক্রবার রাজধানীতে মানববন্ধন করেছে ছাত্র ইউনিয়ন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আহম্মেদ শুক্রবার এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রথমে বেওয়ারিশ হিসেবে লাশটি পাওয়া যায়। পরে তার পরিচয় জানা যায়। এটি হত্যা না আত্মহত্যা সেটা পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে রবিন ও আফসানা ওই এলাকায় থাকতেন। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে তাদের আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি। তাদের গ্রেফতারের জন্য আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।’

রবিন মহিলা লীগ নেত্রীর ছেলে এবং প্রভাবশালী হওয়ায় তাকে গ্রেফতার না করতে কোনো চাপ আছে কিনা- জানতে চাইলে মাসুদ আহম্মেদ বলেন, ‘কে কার ছেলে সেটা আমাদের কাছে বড় বিষয় নয়। যারাই অপরাধী তাদের আমরা গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনব। রবিনের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। শুধু জানা গেছে, সে তেজগাঁও কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত।’

গত ১৩ আগস্ট রাতে আফসানার লাশ মিরপুর আল হেলাল হাসপাতালে রেখে যায় দুই যুবক। ওই দুই যুবকের পরিচয় নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। অজ্ঞাত হিসেবে তার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। রাতে আত্মীয়রা খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ ঠাকুরগাঁওয়ে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।

আফসানার রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় কাফরুল থানায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত করছেন এসআই ফজলুল হক। তিনি শুক্রবার যুগান্তরকে জানান, নিহতের পরিবারের কেউ থানায় মামলা করতে আসেনি। অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। সেটা তদন্ত চলছে। পোস্টমর্টেম ও ভিসেরা রিপোর্ট আসার পর হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেলে ওই মামলায় হত্যার ধারা যুক্ত করা হবে।

এদিকে আফসানার লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মামলা করা হবে বলে জানিয়েছে তার পরিবার। তাদের অভিযোগ, তেজগাঁও কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাবীবুর রহমান রবিন ও তার সহযোগীরা আফসানাকে হত্যা করছে।

আফসানার মামা হাসানুজ্জামান মিন্টু বলেন, লাশ দাফন করার পরই বিভিন্ন মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে হুমকি ও বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য বলা হয়। এতে হত্যার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হত্যা মামলা না করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার পর থানায় হত্যা মামলা করা হবে। রিপোর্ট পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারছি না।’

আফসানার মৃতদেহের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপক আবুল খায়ের মো. শফিউজ্জামান জানান, লাশের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে রশিতে ঝুলে মারা গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। লাশের ভিসেরা করার জন্য আলামত ও ডিএনএ টেস্ট করার জন্য নমুনা রাখা হয়েছে।

নিহত আফসানা মানিকদির যে বাসায় ভাড়া থাকতেন ওই ভবনের বাড়ির মালিকের নাম আনসার আলী। শুক্রবার ওই বাসায় গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। ওই ভবনের ভাড়াটিয়া বেণু জানান, স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে প্রায় আড়াই বছর আগে ভাড়াটিয়া হিসেবে উঠেন রবিন ও আফসানা। মাসে ৬ হাজার টাকায় নিচতলার এক রুমের বাসাটি ভাড়া নেন রবিন। ৬ মাস আগে ভবনটির পাশের একটি টিনশেড রুমে মাসে ২ হাজার টাকা ভাড়ায় আফসানাকে তুলে দেন রবিন।

আফসানার কাছে বিয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে বলতেন, সাক্ষী হিসেবে দুই বন্ধুর সামনে তারা আদালতে গিয়ে বিয়ে করেছেন, কাবিন হয়েছে পাঁচ লাখ টাকা। আগে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে ওই বাসায় যেতেন রবিন আর বাসা থেকে বেরিয়ে যেতেন শনিবার। কিন্তু প্রায় ২ মাস তাকে ওই বাসায় দেখা যায়নি। আফসানা ও রবিনের মধ্যে কলহ চলছিল বলে আফসানা জানিয়েছিলেন। তবে কী নিয়ে তা কখনও বলেননি আফসানা।

অপর এক প্রতিবেশী জানান, আফসানার মৃত্যুর আগে বাসায় কোনো হই হুল্লোড় বা দরজা ভাঙার ঘটনা ঘটেনি। এ রকম হলে আমরা অবশ্যই বুঝতে পারতাম। রোববার বিকালে পুলিশ আমাদেরকে আফসানার মৃত্যুর বিষয়ে জানায়। তারা বলেন, আফসানা আত্মহত্যা করতে পারে না। বিষয়টি রহস্যজনক।

আফসানার বড় ভাই ফজলে রাব্বী শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, তদন্তে বৃহস্পতিবার দুপুরে পুলিশ তার মামা মিন্টুকে নিয়ে মানিকদির বাসায় নিয়ে গেছে। তারা কথা বলেছে ওই বাসার কয়েকজনের সঙ্গে। তিনি আরও জানান, রবিনের বাসা কাজীপাড়া এলাকায়। তিনি তেজগাঁও কলেজের ছাত্রলীগের নেতা। এর বেশিকিছু তার জানা নেই। রবিনের সঙ্গে আফসানার বিয়ের বিষয়েও কিছু জানেন না বলে জানান তিনি।

এ ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন রুবেলের সঙ্গে শুক্রবার পর্যন্ত যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সে আত্মগোপনে আছে। তার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র সাংবাদিকদের জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হলে সে সামনে আসবে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতাদের দাবি, রবিন নামে তাদের কোনো নেতা নেই। তবে কলেজে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রবিন সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পরবর্তী সময়ে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী।

ছাত্র ইউনিয়নের মানববন্ধন : এদিকে আফসানা হত্যার প্রতিবাদে শুক্রবার রাজধানীর কাকরাইলে মানববন্ধন করে ছাত্র ইউনিয়নের পল্টন ও রমনা শাখা। এতে ছাত্র ইউনিয়নের মহানগর সভাপতি অনিক রায় বলেন, পোস্টমর্টেমকারী চিকিৎসক সাংবাদিকদের বলেছেন, আফসানার মৃত্যু শ্বাসরোধে হয়েছে। প্রশ্ন হল- কারা তার শ্বাসরোধ করেছে। কাফরুল থানার ওসি কিসের ভিত্তিতে বললেন ঘটনাটি আত্মহত্যা। আফসানা আত্মহত্যা করলে তার লাশ ঘরেই থাকত। কারা তার লাশ হাসপাতালে নিল। প্রতিবাদ সভায় আমাদের কর্মীরা আসার পথে কেন ছাত্রলীগের লোকজন হামলা করল। এসব থেকে পরিষ্কার প্রমাণ হয়- ছাত্রলীগ নেতা হাবীবুর রহমান রবিন এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত। রবিন ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিলেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা জলি তালুকদার, সুমন সেনগুপ্ত, দীপক সেন ও জহর লাল রায়। মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন পল্টন শাখার সভাপতি বিল্লাল হোসেন।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত