মাহবুব হাসান    |    
প্রকাশ : ২০ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী
মনোনয়নবঞ্চিত হতে পারেন মদদদাতা আ’লীগ এমপিরা
পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মদদদাতাদের জন্য অপেক্ষা করছে দুঃসংবাদ। এখন পর্যন্ত বিদ্রোহীদের মদদদাতা এমপিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়া হলেও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। এমনকি প্রার্থী হিসেবে তারা নাও বিবেচিত হতে পারেন। এরই মধ্যে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে শাস্তি দেয়ার বিষয়টি কার্যকর হতে পারে ভিন্ন কৌশলে। যদিও নির্বাচনের পর এখনও দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকগুলোয় এ বিষয়টি এজেন্ডায় ছিল না। অনির্ধারিত আলোচনাতেও ওঠেনি। তবে দলীয় ফোরামে বিষয়টি নিয়ে জোরালো আলোচনা হয়েছে।
এ নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহর কাছে জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিভিন্ন জায়গায় অনেকে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন। এদের পেছনে দলের অনেকে কাজও করেছেন। বিদ্রোহী প্রার্থীদের অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তাদের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে। কিন্তু একটার পর একটা ইস্যু আসতে থাকায় সেটি এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। নিশ্চয় পরে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের আরেক শীর্ষ নেতা যুগান্তরকে বলেন, যারা বিদ্রোহী প্রার্থীদের মদদ দিয়েছেন তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত হতে পারেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে সারা দেশে একযোগে ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ৬৯টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়ে যান। আর চলতি বছরের ২২ মার্চ থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সারা দেশে ছয় ধাপে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত চেয়ারম্যান পদে সারা দেশে আওয়ামী লীগের কমপক্ষে ১ হাজার ৫০০ বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। দল থেকে মনোনয়ন না পেয়ে তারা নির্বাচনে অংশ নেন এবং অনেকে জয়লাভও করেন। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতা বা এমপি তাদের প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সমর্থন দেন। কিন্তু প্রথম থেকেই এ নিয়ে সোচ্চার ছিল আওয়ামী লীগ। বিদ্রোহীদের কাউকে কাউকে স্থানীয়ভাবে বহিষ্কারের পাশাপাশি তাদের মদদদাতাদের চিহ্নিত করে শাস্তির হুশিয়ারিও দেয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
দেশের অধিকাংশ স্থানে মূলত এমপিদের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থন দেয়ার অভিযোগ ওঠে। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কারিবুল হক রাজিনকে বহিষ্কার করে জেলা আওয়ামী লীগ। পাশাপাশি তাকে সমর্থন দেয়ার অভিযোগে শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমপি গোলাম রাব্বানী এবং সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতাউর রহমানকেও বহিষ্কার করা হয়। তাদের চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করার জন্য কেন্দ্রেও সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।
পৌরসভা নির্বাচনে কমপক্ষে ২৮ জন এমপি আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর বিরোধিতা করেন বলে দলের সাংগঠনিক সম্পাদকরা রিপোর্ট দেন। আলোচিত এমপিদের মধ্যে পাবনা-৩ আসনের মকবুল হোসেন দলীয় প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন সাখোকে সমর্থন না করে নেপথ্য থেকে বিদ্রোহী প্রার্থী মীর্জা রেজাউল করিম দুলালকে সমর্থন দেন। গাইবান্ধা-৪ আসনের স্বতন্ত্র এমপি আবুল কালাম আজাদ গোবিন্দগঞ্জে বিদ্রোহী প্রার্থী মুকিতুর রহমান রাফিকে সমর্থন করেন। কুষ্টিয়ার খোকসায় বিদ্রোহী প্রার্থী আল মাসুম মোর্শেদ শান্তর পক্ষাবলম্বনের অভিযোগ ছিল কুষ্টিয়া-৪ আসনের এমপি আবদুর রউফের বিরুদ্ধে। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে বিদ্রোহী প্রার্থী শেখ নুরুন্নবী অপুকে গোপনে সমর্থন দেন জামালপুর-১ আসনের এমপি আবুল কালাম আজাদ। মানিকগঞ্জ সদরে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গাজী কামরুল হুদা সেলিম ছিলেন বিদ্রোহী প্রার্থী। তাকে কৌশলে সমর্থন দেন মানিকগঞ্জ-১ আসনের এমপি এএম নাঈমুর রহমান দুর্জয়। চুয়াডাঙ্গা সদরে বিদ্রোহী প্রার্থী ওবায়দুর রহমান জিপু চৌধুরী চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের এমপি আলী আজগার টগরের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন। বাগেরহাট সদরে বিদ্রোহী প্রার্থী মিনা হাসিবুল হাসান শিপনকে বাগেরহাট-২ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট মীর শওকত আলী বাদশা কৌশলে সমর্থন দেন বলে অভিযোগ ছিল। নীলফামারী-৩ আসনের এমপি অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা জলঢাকায় বিদ্রোহী প্রার্থী বর্তমান মেয়র ইলিয়াস হোসেন বাবলুকে সমর্থন দেন। মৌলভীবাজার-২ আসনের আবদুল মতিন কুলাউড়ায় প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা শফি আলম ইউনুসকে গোপনে সমর্থন দেন।
বরগুনা সদরে বিদ্রোহী প্রার্থী শাহাদাৎ হোসেনকে বরগুনা-১ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ শম্ভু সমর্থন করেন বলে অভিযোগ ছিল। চাঁদপুর-৪ আসনের এমপি ড. শামসুল হক ভূঁইয়া ফরিদগঞ্জে বিদ্রোহী প্রার্থী আবুল খায়ের পাটোয়ারীকে প্রচ্ছন্নভাবে সমর্থন দেন। বগুড়া-৫ আসনের এমপি হাবিবুর রহমান গোপনে ধুনটে বিদ্রোহী প্রার্থী এজিএম বাদশাকে সমর্থন দেন। পাবনা-৫ আসনের এমপি গোলাম ফারুক প্রিন্স পাবনা সদরে বিদ্রোহী প্রার্থী কামিল হোসেনকে মৌন সমর্থন দেন। সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের এমপি হাসিবুর রহমান স্বপন শাহজাদপুরে বিদ্রোহী প্রার্থী ভিপি আবদুর রহিমের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের এমপি গোলাম রাব্বানী শিবগঞ্জের বিদ্রোহী প্রার্থী কারিবুল হক রাজিনকে সমর্থন করায় জেলা আওয়ামী লীগ দু’জনকেই বহিষ্কার করে। দিনাজপুর-৬ আসনের এমপি শিবলী সাদিক বিরামপুরের বিদ্রোহী প্রার্থী লিয়াকত হোসেন টুটুলকে সমর্থন দেন। দিনাজপুরের বীরগঞ্জে বিদ্রোহী প্রার্থী মকসেদ আলী মিয়াকে দিনাজপুর-১ আসনের এমপি মনোরঞ্জন শীল গোপাল সমর্থন দেন। নরসিংদী সদরে বিদ্রোহী প্রার্থী এসএম কাইয়ুম সমর্থন করেছেন নরসিংদী-৫ আসনের এমপি রাজি উদ্দিন আহমেদ রাজু। সুনামগঞ্জের ছাতকে বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল ওয়াহিদ মজনুকে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের এমপি মুহিবুর রহমান মানিক সহায়তা করেন। যশোর সদরে বিদ্রোহী প্রার্থী এসএম কামরুজ্জামান চুন্নু যশোর-৩ আসনের এমপি কাজী নাবিল আহমেদের আশীর্বাদ পান। নড়াইল-১ আসনের এমপি কবিরুল হক মুক্তি বিদ্রোহী প্রার্র্থীকে সমর্থন দেন। চট্টগ্রাম-৬ আসনের এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী তার ছেলে বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল ইসলাম চৌধুরী রানার পাশে ছিলেন।
এদিকে ইউপি নির্বাচনেও অনেক স্থানে এমপি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা বিদ্রোহীদের পক্ষ নেন। এদের মধ্যে কক্সবাজারের আবদুর রহমান বদি, বরগুনা-২ আসনের এমপি শওকত হাচানুর রহমান রিমন, নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের এমপি আয়েশা ফেরদৌসের স্বামী সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী, বাগেরহাটের এমপি ডা. মোজাম্মেল হক, পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম আউয়াল, পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মীর্জা আজম, মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার সংসদ সদস্য নাঈমুর রহমান দুর্জয়, সন্দ্বীপের এমপি মাহফুজুর রহমান মিতা, সিরাজগঞ্জের এমপি হাসিবুর রহমান স্বপন, মাদারিপুরের সাবেক এমপি আবুল হোসেনসহ অনেকের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহী প্রার্থীদের মদদ দেয়ার অভিযোগ ওঠে। এছাড়া স্থানীয় অনেক প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধেও এ অভিযোগ ওঠে।
বিভিন্ন সময়ে এসব সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে হুশিয়ারি দেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমে এক প্রতিক্রিয়ায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে অবস্থান নেয়া সংসদ সদস্যদের আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়া না-ও হতে পারে বলে মন্তব্য করেন।

কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নে জামায়াতের স্বতন্ত্র প্রার্থী নূর আহমেদ আনোয়ারীর পক্ষে এবং ৫টি ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি। সন্দ্বীপের বাউরিয়া ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী জিল্লুর রহমানের পক্ষে গোপনে অবস্থান নেন তার ভাই ও স্থানীয় এমপি মাহফুজুর রহমান মিতা।
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিদ্রোহী প্রার্থী আকন মোহাম্মদ শহীদ, কাকচিড়ায় বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন, রায়হানপুর ইউনিয়নে স্বতন্ত্র প্রার্থী এমদাদুল হক লাভলুর পক্ষে আওয়ামী লীগের স্থানীয় এমপি (বরগুনা-২) শওকত হাচানুর রহমান রিমন অবস্থান নেন।
বরগুনা সদর উপজেলার ৪নং কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আরিফুর রহমান মারুফ মৃধার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল হাকিমের পক্ষে প্রচার চালান জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান নসা।
বাগেরহাটের শরণখোলায় ধানসাগর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মইনুল ইসলাম টিপুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন স্থানীয় এমপি ডা. মোজাম্মেল হক। এছাড়া উপজেলার খোন্তাকাটা ইউনিয়নেও দলীয় প্রার্থী মহিউদ্দিন জাকিরের বিরুদ্ধে তার অনুসারীদের কাজ করার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ উঠে। স্থানীয় নেতা মীর শওকত আলী বাদশার বিরুদ্ধেও সদরের ৬টি ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থীদের গোপন সমর্থন দেয়ার অভিযোগ উঠে।
পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম আউয়াল এমপি। তিনটি উপজেলা নিয়ে তার নির্বাচনী এলাকা। তার পছন্দের প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় বেশ ক’টি ইউপিতে একজন করে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড় করানোর অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে।
উল্লেখ্য, দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করার অভিযোগে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলার ২৪ বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী ও ৭ নেতাকর্মী, এর আগে কক্সবাজারের ১৯ ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১১ বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী, খুলনায় আওয়ামী লীগের ৩৫ চেয়ারম্যান প্রার্থীসহ সারা দেশে বহু নেতাকর্মীকে স্থানীয়ভাবে বহিষ্কার করে আওয়ামী লীগ।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত