আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো    |    
প্রকাশ : ২০ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
দক্ষিণে অর্থ সংকটে বিএনপি নেতারা
এবিএম মোশাররফ হোসেন। বিএনপির সদ্য ঘোষিত কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন পটুয়াখালী-৪ আসনে। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ আর ঠিকাদারি ব্যবসা করে ভালোই ছিলেন। নির্বাচনী এলাকায় নেতা-কর্মীদের সহযোগিতার পাশাপাশি চালিয়ে রাখছিলেন দল। মাঝে শেয়ার বাজারে ধসের কারণে হারান মোটা অংকের পূঁজি। পাশাপাশি বিএনপি করার কারনে এখন আর মিলছে না ঠিকাদারি। স্ত্রীর চাকরির সুবাদে পথে বসতে না হলেও অর্থনৈতিক সংকট এখন ঘিরে ধরেছে তাকে। নিজের চলাই যেখানে মুশকিল সেখানে দল চালাবেন কি করে? কেবল এবিএম মোশাররফই নন, পুরো দক্ষিণে বিএনপি নেতারা এমন সংকটে। দল গঠনের পর থেকে এখন পর্যন্ত একটানা এতটা দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকেনি বিএনপি। তাই স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য করাও হয়ে পড়েছে কঠিন। এসবের প্রভাব পড়ছে দলের কর্মীদের ওপর। সবমিলিয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে টিকে থাকা।
নিপাট ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক স্নেহাংশু সরকার কুট্টি। ঠিকাদারি ব্যবসায় পাশাপাশি পটুয়াখালী জেলা শহরের উপকণ্ঠে একটি পেট্রোল পাম্প রয়েছে তার। বর্তমান সরকারের প্রথম দিকে ব্যবসা-বাণিজ্যে খুব একটা ঝামেলা না হলেও ৪/৫ বছর ধরে আছেন মহা বিপদে। পাম্প ব্যবসার পাশাপাশি অন্য ব্যবসাতেও নেমেছে ধস। ফি-বছর ঈদ কোরবানিতে যে মানুষটি তার সাধ্যমতো সহায়তা নিয়ে দাঁড়াতেন নেতা-কর্মীদের পাশে তিনিই এখন এরকম পার্বনে অনেকটাই লুকিয়ে রাখেন নিজেকে। কথা প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, ‘৪/৫ বছর হয়তো পরিস্থিতি সামাল দিয়ে থাকা যায়। কিন্তু এখন তো ১০ বছর চলছে। তার ওপর রয়েছে মামলার ঝামেলা। কেবল নিজের নয়, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নেতা-কর্মীদের মামলার খরচও তো বহন করতে হয় আমাকে। একমাত্র পেট্রোল পাম্পের আয় ছাড়া কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই। মাঝে নাশকতার একটি মিথ্যা মামলায় বহুদিন থাকতে হয়েছে জেলে। সবমিলিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।’
দলের কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক এবং বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, ‘নতুন করে ঠিকাদারি পাওয়া তো দূরের কথা, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বহু পুরনো বিলও দিচ্ছে না বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। প্রথম প্রথম নিজেদের নামে না হলেও অন্যদের লাইসেন্সে কিংবা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের পাওয়া কাজগুলো কিনে ঠিকাদারি করে জীবন ধারণের চেষ্টা করেছি। বর্তমানে সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। দলের ভেতরে প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কথা ভেবে এখন আর আমাদের কাছে কোনো ঠিকাদারি কাজ বিক্রি করছে না আওয়ামী লীগ-যুবলীগের নেতাকর্মী ঠিকাদাররা।
বরিশাল-১ আসনে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন করা বিএনপির আরেক কেন্দ্রীয় নেতা ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবাহান বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম ফোর লেনের’ কাজের যৌথ টেন্ডার দাখিল এবং কাজ পাওয়ার মতো সব সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ার পরও কেবল বিএনপি নেতা হওয়ার কারণে সেই টেন্ডার বাতিল হয়ে যায়। তারপরও আমার মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সবার কাছে পরিচিত না হওয়ার কারণে টুকটাক কাজ-কর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলাম। গেল সরকারবিরোধী আন্দোলনে গ্রেফতার হয়ে জেলে যাওয়ার পর সেটুকুও গেছে। এখন সবাই জানে আমার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম। ফলে এখন আর যেমন কাজ পাচ্ছি না তেমনি আগে করা কাজগুলোর বিল পেতেও নানা সমস্যা হচ্ছে।’
ঝালকাঠি জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মিঞা আহম্মেদ কিবরিয়া বলেন, ‘টানা ৬-৭ মাস পালিয়ে থেকেছি। তারপর মিথ্যা মামলায় জেল খাটা। একদিনের জন্য ঠিকমতো অফিস কিংবা ব্যবসায় মন দিতে পারিনি। তার ওপর রয়েছে বিএনপি নেতার প্রতিষ্ঠান হিসেবে নানা জটিলতা। সবমিলিয়ে ৭-৮ বছর ধরে লোকসান ছাড়া আর কোনো কিছুর সঙ্গে দেখা মিলছে না।’ ঝালকাঠি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম নুপুর বলেন, ‘দল করতে গিয়ে একদিকে যেমন একের পর এক মামলার আসামি হয়েছি তেমনি সেসব মামলা আর দল চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি। জীবন ধারণের প্রয়োজনে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে।’ বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়েদুল হক চান বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য সবই শেষ হয়ে গেছে। ধার-দেনা করে চলার মতো অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছি।’ প্রায় একই কথা বলেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহিন এবং কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা সরফুদ্দিন সান্টু।
মাঠ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা যুগান্তরকে বলেন, ‘বিপদ তো একটা আর দুইটা না। একদিকে হাতে কোনো কাজকর্ম নেই। তার ওপর মামলার ঝক্কি। এখন পেট চালাব নাকি মামলা? বিপদ-আপদে যাদের কাছ থেকে সহযোগিতা পেতাম তাদের অবস্থাও তো দেখছি। তারাই বা আর কতদূর করবে। এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’
তবে বিএনপিতে যে সবাই দুরবস্থায় আছেন তেমন নয়। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে নানা উপায়ে লিয়াজোঁ করে ভালো অবস্থানেও রয়েছেন কেউ কেউ। তেমনই একজন পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বিএনপি নেতা গোলাম মোস্তফা। সহোদর ভাই হাজী শাহ আলম আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় যে কোনো বিপদে তাকে সামনে দাঁড় করান তিনি। শাহ আলমকে সামনে রেখে নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকার এক শ্রেণীর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়মিত মোটা অংকের টাকা দিয়ে নেপথ্যে নিজের পক্ষে রাখার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সদ্য সমাপ্ত ইউপি নির্বাচনে নিজের আরেক ভাই যিনি এখনও রয়েছেন আওয়ামী লীগের পদ-পদবীতে তাকে বিএনপি থেকে এনে দিয়েছেন চেয়ারম্যান নির্বাচনের ধানের শীষ প্রতীক। ক্ষসতাসীন দলকে হাতে রেখে এভাবে টিকে থাকার অভিযোগ রয়েছে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার ফারুক তালুকদার এবং গৌরনদীর বিএনপি নেতা লোকমান খানসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে। অবশ্য এ ধরনের নেতার সংখ্যা হাতেগোনা।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত