উবায়দুল্লাহ বাদল    |    
প্রকাশ : ২১ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
ছিটমহল বিনিময়ের পর
বাংলাদেশের আয়তন বেড়েছে ৩৬.১৮ বর্গকিলোমিটার
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় ও অপদখলীয় সমস্যা সমাধানের পর দেশের আয়তন বেড়েছে ৩৬ দশমিক ১৮ বর্গকিলোমিটার। শিগগিরই বর্ধিত এলাকা বাংলাদেশের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ জলভাগের পরিমাণও নতুন করে নির্ধারণের কাজও শুরু হয়েছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে এ জলভাগের সীমানা জরিপের কাজ চূড়ান্ত হবে বলে জানা গেছে। ছিটমহল বিলুপ্ত ও দেশের বিভিন্ন নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ায় স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর নতুন করে বাংলাদেশের নির্ভুল সীমানা ও সঠিক আয়তন নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মামলায় ডিক্রির নতুন এলাকাও বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হবে। রোববার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান আয়তন এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার। গত বছরের ৩০ জুলাই গেজেট জারির মাধ্যমে বিলুপ্ত হয় বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি সংক্রান্ত জটিলতা। এরপর ৩১ জুলাই মধ্যরাত থেকে শুরু হয় বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময়। বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহল (১৭ হাজার ১৬০.৬৩ একর) বাংলাদেশকে ফেরত দেয় ভারত। এছাড়া তারা অপদখলীয় ৬টি ভূমিও (যার আয়তন ২ হাজার ২৬৭.৬৮২ একর) বাংলাদেশকে হস্তান্তর করে। এনিয়ে বাংলাদেশকে মোট ১৯ হাজার ৪২৮ দশমিক ৩১ একর অর্থাৎ ৭৮ দশমিক ৬২ বর্গকিলোমিটার জমি ফেরত দেয় ভারত। অপরদিকে ভারতের মধ্যে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল (৭ হাজার ১১০.০২ একর), অপদখলীয় ১২ ভূমি (যার আয়তন ২ হাজার ৭৭৭.০৩৮ একর) ভারতকে ফিরিয়ে দেয় বাংলাদেশ। ভারতকে ফেরত দেয়া মোট পরিমাণ ১০ হাজার ৪৮৭ দশমিক ২৪ একর অর্থাৎ ৪২ দশমিক ৪৪ বর্গকিলোমিটার। উভয় দেশের ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি বিনিময়ের পর চূড়ান্ত জরিপে বাংলাদেশ ৩৬ দশমিক ১৮ বর্গকিলোমিটার আয়তন বেশি পেয়েছে।
গত ২৭ এপ্রিল বাংলাদেশের নির্র্ভুল সীমানা ও সঠিক আয়তন নির্ণয়ের লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালের সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরের এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি যা বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তার আয়তন কত? এ ভূমি বাংলাদেশের মানচিত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিনা? জবাবে বাংলাদেশ ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ছিটমহল ও অপদখলীয় ভূমি বিনিময়ে বাংলাদেশের ‘নেট গেইন’ হয়েছে ৩৬ দশমিক ১৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা। ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ পেয়েছে মোট ৭৮ দশমিক ৬২ বর্গকিলোমিটার। অপরদিকে বাংলাদেশের কাছ থেকে ভারত পেয়েছে ৪২ দশমিক ৪৪ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ বাংলাদেশ বেশি পেয়েছে ৩৬ দশমিক ১৮ বর্গকিলোমিটার। তবে এই আয়তন এখনও বাংলাদেশের মানচিত্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫টি সেক্টরের ৪টির (পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা) সীমানা নির্ধারণ এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছে সরকার। ভারতের মিজোরাম ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকাটি দুর্গম ও নিরাপত্তাজনিত কারণে এ দায়িত্ব ‘সার্ভে অব বাংলাদেশ’কে দেয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শেখ আবদুল আহাদ সোমবার যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের নির্ভুল সীমানা ও সঠিক আয়তন নির্ণয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে এ সংক্রান্ত কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ বৈঠক গত রোববার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এখন জলসীমানা নির্ধারণের কাজ চলছে। এটি চূড়ান্ত হতে আরও ৫/৬ মাস সময় লাগবে। সব জরিপের কাজ শেষ হওয়ার পরেই দেশের মানচিত্র পুনঃনির্ধারণ হতে পারে।
জরিপ অধিদফতরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ছিটমহল বিলুপ্ত ছাড়াও স্বাধীনতার পর দেশের অধিকাংশ নদ-নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। এমনকি অনেক নদী বিলুপ্তও হয়েছে। পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার মতো নদীতে বড় বড় চর পড়ে তা লোকালয়ে পরিণত হয়েছে। এসব চরে গড়ে উঠেছে মানুষের স্থায়ী বসতি। বড় বড় গাছপালা দেখলে মনেই হয় না, এককালে এ বসতির জায়গাটিতে ছিল খরসে াতা নদী। আবার কোনো কোনো লোকালয় ও জমি নতুন করে নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ জলসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
দেশের অভ্যন্তরীণ জলসীমার বিষয়ে বৈঠকে বলা হয়, দেশের মোট আয়তনের ১৪ ভাগই জল। যার আয়তন ২২ হাজার ১০০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়ের আয়তন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার, যা অভ্যন্তরীণ জলসীমা নামে পরিচিত। জরিপ অধিদফতরের এই জলসীমার সঙ্গে একমত নয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের মতে ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটারই সমুদ্র এলাকার অভ্যন্তরীণ জলসীমা।
এর আগে সমুদ্রসীমা মামলায় নেদারল্যান্ডসের স্থায়ী সালিশি আদালতের রায়ে বঙ্গোপসাগরে ভারতের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা পায় বাংলাদেশ। বাকি ছয় হাজার ১৩৫ বর্গকিলোমিটার পেয়েছে ভারত। ২০১৪ সালের ৭ জুলাই ওই রায় পাওয়া যায়। তারও আগে মিয়ানমারের সঙ্গে রায়ে বাংলাদেশ পায় ৭০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এসবই যোগ হবে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বাংলাদেশের সঙ্গে। চূড়ান্ত জরিপ শেষে বাংলাদেশের ম্যাপের এই জলসীমাও চিহ্নিত থাকবে।
বাংলাদেশের বর্তমান সীমান্ত তৈরি হয়েছিল ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলের পর। বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চল তখন ‘পূর্ব বাংলা’ নামে পরিচিত ছিল। যেটি নবগঠিত দেশ পাকিস্তানের পূর্ব অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পূর্ব বাংলা থেকে পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিবর্তন করা হয়। পাকিস্তানি শাসনের অবসান হলে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রথম মুখোমুখি হয় সীমানা চিহ্নিতকরণ সমস্যার। তিনদিকে ভারতের সীমান্ত থাকায় ১৯৭৪ সালে দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই চুক্তির আলোকেই বাংলাদেশের মানচিত্র চূড়ান্ত হয়।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত