নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম    |    
প্রকাশ : ২১ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
চট্টগ্রামে এবিটির শক্তিশালী ঘাঁটি : গ্রেফতার ১৪
তিনজনের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ
চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) শক্তিশালী ঘাঁটি রয়েছে। এবিটির সদস্যরা বিভিন্ন গ্রুপ উপ-গ্রুপে বিভক্ত হয়ে নগরী ও জেলায় নানা অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া এবিটির সদস্যরা পুলিশকে এ তথ্য দিয়েছে। চট্টগ্রামে এবিটির কর্মকাণ্ডকে শক্তিশালী করতে ধর্মান্তরিত জঙ্গি মুসয়াব ইবনে উমায়ের (পিকলু দাশ) সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে। গত এক মাসে নগরীতে তিন দফা অভিযানে গ্রেফতার করা হয়েছে এবিটির ৯ সদস্যকে। অপরদিকে এ সংগঠনের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে জেলা পুলিশ। এর আগে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ ১১ জুলাই সীতাকুণ্ড থানাধীন বাড়বকুণ্ড বাজার এলাকার একটি মুরগির ফার্ম এলাকায় অভিযান চালিয়ে গোপন বৈঠক থেকে ধর্মান্তরিত মুসয়াব ইবনে উমায়েরসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করে। এ সময় গ্রেফতার অপর তিন সদস্য হল : শিপন ওরফে ফয়সাল (২৫), খোরশেদ আলম (৩১) ও রাসেল মো. ইসলাম (৪১)।
গ্রেফতার তিন সদস্যের কাছ থেকে দেশীয় অস্ত্র, ল্যাপটপ, ট্যাবসহ বেশকিছু জিহাদি বই উদ্ধার করা হয়। ল্যাপটপ থেকে উদ্ধার করা হয় সীতাকুণ্ডে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্যামিকেল কারখানা ও বিদেশীদের ওপর হামলার ছক। তাদের দেয়া তথ্যানুয়ায়ী, ফটিকছড়ির বাবুনগর এলাকা থেকে এ সংগঠনের আরেক সদস্য তৌহিদুল আলম মানিককে পুলিশ গ্রেফতার করে। মানিক গ্রেফতারের দিনেই এবিটির বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে সে বলে, চট্টগ্রামের গহিন পাহাড়ে এবিটি সদস্যদের চোখ বেঁধে নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। চট্টগ্রামে কর্মরত বিদেশীদের ওপর হামলার ছক রয়েছে এ সংগঠনের। এমন তথ্য পেয়ে সতর্ক হয় পুলিশ। এদিকে জঙ্গিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে মনিটরিং সেল গঠন করেছে জেলা পুলিশ। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতভর অভিযান চালিয়ে নগর পুলিশের হাতে গ্রেফতার এবিটির তিন সদস্যের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন জানিয়েছে পুলিশ। আজ রোববার রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে পুলিশ জানায়, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসিম উদ্দিন রাহমানী। তিনি ঢাকায় ব্লগার রাজীব হত্যাকাণ্ডে দণ্ডিত হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন। পুলিশের অভিযানে এ জঙ্গি সংগঠনের বহু নেতাকর্মী গ্রেফতার হওয়ার পর এ দলের সদস্যরা এখন আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ নামে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। চট্টগ্রামে হঠাৎ করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় টেনশনে রয়েছে পুলিশ। চট্টগ্রামকে ঘিরে এ জঙ্গি সংগঠনের বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা রয়েছে বলে মনে করছে পুলিশ।
এ প্রসঙ্গে জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা যুগান্তরকে বলেন, জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ জিরো টলারেন্সে রয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে জঙ্গিবাদের মূল শেকড় উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত ব্যারাকে ফিরবেন না পুলিশের সদস্যরা। এ জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। জেলার প্রতিটি মানুষকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের সম্পর্কে (নম্বর ০১৭৫৭-০০১১১৭ এবং ০৩১-৬৫২৭৬৪) তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার পরামর্শ দেন তিনি।
সিএমপির মিডিয়া শাখা সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাতভর অভিযান চালিয়ে এবিটির তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা হল : ফরহাদ আহমেদ ওরফে রিপন (২৭), ইমরান (২৬) ও আহম্মদ মনির হোসেন ওরফে রুবেল (২১)। তাদের কাছ থেকে ২টি ল্যাপটপ, ৩টি মোবাইল সেট ও ১৩টি জিহাদি উগ্রবাদী বই উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার জঙ্গিরা জানায়, সীতাকুণ্ড পুলিশের হাতে গ্রেফতার ধর্মান্তরিত জঙ্গি মুসায়েব ইবনে উমায়ের এবিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে তাদের প্রলুব্ধ করেছে। এবিটিতে যোগ দেয়ার পর তারা বিভিন্ন সময়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন সিএমপির ডিসি (ডিবি) বন্দর মারুফ হোসেন। তিনি আরও জানান, গ্রেফতার তিন জঙ্গির মধ্যে ফরহাদ আহমেদ ওরফে রিপন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র এবং এনালাইটিক্যাল কেমিস্ট হিসেবে কর্ণফুলীর ইপিজেডের একটি কারখানায় কর্মরত। ইমরান চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থেকে পাওয়ার টেকনোলজি থেকে পাস করেছে। আহম্মদ হোসেন রনি ওরফে রুবেল শ্যামলী আইডিয়াল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে পঞ্চম সেমিস্টারে অধ্যয়নরত। মারুফ হোসেন আরও জানান, ৩১ জুলাই পতেঙ্গা থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় এবিটির ৫ সদস্যকে। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রথমে বৃহস্পতিবার রাতে রিপনকে ডাবলমুরিং থানাধীন নাজিরপোলা এলাকার নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে কর্ণফুলী থানাধীন দক্ষিণ শিকলবাহা নিজ বাসা থেকে ইমরানকে। এবং পটিয়া থানাধীন তেকোটা এলাকার তাজুর মল্লুক চেয়ারম্যান বাড়ির নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় আহম্মদ হোসেন রনিকে। সিএমপি সূত্র জানায়, সিএমপির গোয়েন্দা পুলিশ ৩১ জুলাই রাতে পতেঙ্গা থানাধীন কাঠঘর মুসলিমাবাদস্থ শেরে পতেঙ্গা নামে একটি বাড়ির ৪র্থ তলায় অভিযান পরিচালনা করে এবিটির ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হল : আক্কাছ আলী ওরফে জাহেদুল ইসলাম ওরফে নয়ন (২৩), আতিকুল হাসান ওরফে ইমন (২৬), জামশেদুল আলম ওরফে হৃদয় (২১), রুবেল (২৬) ও মহিউদ্দিন (১৮)। গোপন বৈঠক থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ২টি ল্যাপটপ, ৭টি মোবাইল সেট ও ১১টি উগ্রবাদী জিহাদি বই উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুলিশকে জানায়, এবিটির সক্রিয় সদস্য এবং পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে বেগবান করতে গোপনে অবস্থান করছিল। মুসয়াব ইবনে উমায়েরই এ পাঁচজনসহ অন্যদের জঙ্গি কর্মকাণ্ডে প্রলুব্ধ করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে অন্তর্ভুক্ত করে। তারা একাধিকবার উমায়েরের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছে বলেও পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে।
এর আগে ২৮ জুলাই রাতে বায়েজিদ বোস্তামী থানার কুলগাঁও এলাকার জামশেদ শাহ রোডস্থ রহমানিয়া মঞ্জিলের ৪র্থ তলায় একটি কক্ষে অভিযান পরিচালনা করে এবিটির সক্রিয় সদস্য আবদুল হান্নান ওরফে আবদুল্লাহ ওরফে লাদেনকে (২১) গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার লাদেন দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের ১ম বর্ষের ছাত্র। সে ঠাকুরগাঁও জেলার ঠাকুরগাঁও থানার সরকারপাড়া এলাকার ইনতাজুর রহমানের ছেলে। তার কাছ থেকে ১টি ল্যাপটপ, ২টি মোবাইল সেটসহ ১১টি উগ্রবাদী জিহাদি বই উদ্ধার করা হয়। রমজানের ঈদের পর থেকে লাদেন এবিটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে বেগবান করতে চট্টগ্রামে অবস্থান করছে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে লাদেন। প্রকাশ করে তার বেশ ক’জন সহযোগীর নামও। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে দুই দফা অভিযানে গ্রেফতার করা হয় এ আট সদস্যকে। পুলিশ তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে। লাদেনের ল্যাপটপে পাওয়া যায় সদস্যদের প্রশিক্ষণের ভিডিও ফুটেজ।
এ প্রসঙ্গে সিএমপির ডিসি (ডিবি) বন্দর মারুফ হোসেন জানান, দেশকে অস্থিতিশীল করতে নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম সংগঠিত হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির কাজও চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এবিটির আরও যেসব সদস্য আত্মগোপনে আছে তাদেরও গ্রেফতারে অভিযান চালানো হবে।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত