মুসতাক আহমদ    |    
প্রকাশ : ২১ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গিবাদ
বিদেশ থেকে আসা অর্থের উৎস-ব্যয় তদন্তে সরকার
জঙ্গিবাদ মোকাবেলা ও সনদ বাণিজ্য বন্ধে দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ডাটাবেজ হচ্ছে। একই উদ্দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশ থেকে আসা অর্থের উৎস ও ব্যয়ের খাত তদন্তে নামছে সরকার। তলব করা হয়েছে স্থায়ী ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তরের তথ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবৈধ ও আউটার ক্যাম্পাসের তালিকাও হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক ও সিন্ডিকেটের সদস্যদের নাম-পরিচয় চাওয়া হয়েছে। এছাড়া দু-একদিনের মধ্যে ৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বসানোর আদেশ জারি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আবদুল মান্নান যুগান্তরকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জঙ্গিবাদের উত্থান ও বিস্তার প্রতিরোধ এবং শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। ইতিমধ্যে ইউজিসি বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও বেশকিছু কাজের নির্দেশনা দিয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
গত ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় অংশ নেয়া জঙ্গিদের বেশিরভাগই বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এর আগে-পরে অন্যান্য সন্ত্রাসী হামলায় জড়িতদের অনেকেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কয়েকদিন আগে আটক চার নারী জঙ্গির তিনজন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সার্বিক তথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সূত্র জানায়, ডাটাবেজ আকারে বিদ্যমান এবং ভবিষ্যতে ভর্তি হওয়া সব ছাত্রছাত্রীর তথ্য থাকবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এই তথ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হবে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (ব্যানবেইস)।
ডাটাবেজ তৈরির বিষয়টি নিশ্চিত করে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) হেলালউদ্দিন বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, শুধু জঙ্গিবাদ ও সনদ বাণিজ্য মোকাবেলা নয়, বিদেশে ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষা নির্বিঘ্ন করতে এই ডাটাবেজ আমরা তৈরি করছি। কেননা, প্রায়ই বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের সত্যতা জানতে চেয়ে চিঠি দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া থেকে আমরা এমন একটি চিঠি পেয়েছি। সরকারিভাবে ডাটাবেজ থাকলে ছাত্রছাত্রীদের ব্যাপারে বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে যে কেউ তা নিরীক্ষা করে নিতে পারবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে মাননীয় মন্ত্রীর কাছ থেকে আমরা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পেয়েছি। সে অনুযায়ী কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সূত্র জানায়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশের নানা উৎস থেকে প্রায়ই অর্থ আসছে। সরকার এই অর্থের উৎস সম্বন্ধে পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। আবার কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে তাও সরকারকে জানানো হয় না। সরকারের নীতিনির্ধারক মহল মনে করেন, এই অর্থ জঙ্গিবাদী তৎপরতায়ও ব্যয় হতে পারে। কেননা, গত কয়েক বছরে এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে অর্থ এসেছে যাদের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (বিওটি) ও সিন্ডিকেটের সদস্যদের ব্যাপারে নানা প্রশ্ন আছে। এমন সন্দেহের পরিপ্রেক্ষিতে বিদেশ থেকে আসা অর্থের উৎস ও ব্যয়ের খাত তদন্তে নামছে সরকার। এ লক্ষ্যে তিন সদস্যের একটি কমিটি হচ্ছে। কমিটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি ও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন করে সদস্য থাকবেন। সূত্র জানায়, এ সংক্রান্ত আদেশ তৈরির কাজ চলছে। আগামী দু’তিন দিনের মধ্যে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি হবে বলে জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে ইউজিসির চেয়ারম্যান বলেন, আন্তর্জাতিক ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব চিটাগাংসহ (আইআইইউসি) বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশ থেকে অর্থ আনে। এ অর্থ এনজিও ব্যুরোর মাধ্যমে আসার কথা। কিন্তু কীভাবে আসে, কোথায় ব্যয় হয় তা আমরা কিছুই জানি না।
সরকারি নির্দেশনা হচ্ছে, আগামী জানুয়ারির মধ্যে স্থাপনের ৭ বছর পূর্ণ হওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্থায়ী ক্যাম্পাসে পুরোপুরি কার্যক্রম শুরু করতে হবে। গত জানুয়ারিতে এক বছর সময় দিয়ে শেষবারের মতো আলটিমেটাম দেয়া হয়। এর আগে তিন দফায় আলটিমেটাম দেয়া হয়। পুরনো ৫৩টির মধ্যে মাত্র ১৪টি স্থায়ী ক্যাম্পাসে গেছে। বাকি ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবারই শেষের দিকে এসে ছাত্রছাত্রীদের দোহাই দিয়ে সময় বাড়িয়ে নিয়েছে। তাই এবার যাতে আলটিমেটাম লংঘন করতে না পারে, সেজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি স্থায়ী ক্যাম্পাসে গমনের গতিবিধি নজরদারি করছে।
এ প্রসঙ্গে হেলাল উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, সর্বশেষ দেয়া আলটিমেটাম অনুযায়ী আগামী জানুয়ারির মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা। এর মধ্যে যারা যেতে পারবে না, তারা আর ছাত্রছাত্রী ভর্তি করতে পারবে না। আমরা চাই না কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এ ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হোক। তাই তাদের সহায়তার জন্য নিবিড় তদারকি করা হচ্ছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবৈধ ও আউটার ক্যাম্পাসের তালিকাও হচ্ছে। বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ইউজিসিতে পাঠানো এক চিঠিতে এ ধরনের ক্যাম্পাসের তালিকা চাওয়া হয়েছে বলে ইউজিসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ইউজিসি সূত্র জানায়, দেশের অন্তত দু’ডজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবৈধ ও আউটার ক্যাম্পাস আছে। এর মধ্যে ৭টির আউটার ক্যাম্পাস আছে। এগুলো হচ্ছে- আইআইইউসি, বিজিসি ট্রাস্ট, সাউদার্ন, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগাং, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ইউআইটিএস), কুইন্স ও আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি। এর মধ্যে প্রথমটি ক্যাম্পাস বন্ধ করেছে বলে জানিয়েছে ইউজিসিকে। শেষের দুটি সরকার বন্ধ ঘোষণা করলেও আদালতের রায় নিয়ে চলছে।
গত ১৮ আগস্ট আউটার ক্যাম্পাস ও সমস্যাপূর্ণ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যসহ একটি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে ইউজিসি। এতে অবৈধ ক্যাম্পাসধারী বিশ্ববিদ্যালয়ের আংশিক তথ্য স্থান পেয়েছে। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকসহ বেশ কয়েকটি ইউনিভার্সিটির অননুমোদিত ক্যাম্পাস আছে। কিন্তু এগুলো সম্পর্কে ইউজিসি অনেকটাই নিশ্চুপ। এ ব্যাপারে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, যদিও তাদের ক্যাম্পাস অনুমোদিত নয়। কিন্তু ক্যাম্পাস-লাগোয়া আলাদা বাড়িতে হওয়ায় আমরা সে সম্পর্কে আপত্তি দেইনি। তবে প্রতিষ্ঠার ১২ বছরের পর এ ধরনের ক্যাম্পাস আমরা আর অ্যালাও করব না।
এদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক (বিওটি সদস্য) ও সিন্ডিকেটের সদস্যদের নাম-পরিচয় চাওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে গত ৪ আগস্ট এসব তথ্য চেয়ে ইউজিসি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি দিয়েছে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দু-একদিনের মধ্যে আরেকটি চিঠি দিচ্ছে ইউজিসিকে। তাতে ২০১৪ সাল থেকে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সিন্ডিকেটে কে বা কারা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের নাম-পরিচয় জানাতে বলা হবে। পাশাপাশি ওই সময়ে কতটি বৈঠক হয়েছে, ওইসব বৈঠকে সরকারি প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন কিনা, অনুপস্থিত থাকলে তার কারণ জানাতে হবে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ৭৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বসানোর ব্যাপারে দু-একদিনের মধ্যে আদেশ জারির প্রক্রিয়া চলছে। সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ও তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মনোনীত করা হয়েছে। এছাড়া কয়েকজন শিক্ষাবিদও আছেন।
উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে ৯৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এর মধ্যে চালু আছে ৮৪টি। বাকি ১০টি অনুমোদন পেলেও চালু হয়নি।



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত