হামিদ-উজ-জামান    |    
প্রকাশ : ১৫ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
আইএমইডির প্রতিবেদন
একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে অশনি সংকেত
খেলাপি ঋণসহ ১০ ঝুঁকি শনাক্ত

সরকারের বহুল আলোচিত একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প ১০ ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে বৃহত্তর এ প্রকল্প ঘিরে। প্রধান প্রধান ঝুঁকিগুলো হচ্ছে- ঋণখেলাপি বৃদ্ধি, ঋণের সঠিক ব্যবহার না হওয়া, ঋণের সীমাবদ্ধতা, ঋণ পেতে দীর্ঘসূত্রতা, ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তন, ঋণ ফেরত না পাওয়া, স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। এছাড়া নানা দুর্বলতার কারণে প্রকল্পটির লক্ষ্যপূরণ শঙ্কার মুখে রয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় উঠে এসেছে এ চিত্র। জুনে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করেছে সংস্থাটি। প্রকল্পের ঝুঁকির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে। এটি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অগ্রাধিকার প্রকল্প হওয়ায় সরকার পরিবর্তন হলে এর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর আগে সরকার পরিবর্তন হলে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়।

জানতে চাইলে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের পরিচালক আকবার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সরকার পরিবর্তনের ঝুঁকির বিষয়টি ঠিক নয়। এটি চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বাদ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কেননা সরকার পাঁচ বছর পরপর পরিবর্তন হতেই পারে, এটিই স্বাভাবিক। তাই বলে প্রকল্প বাতিল বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমনটা ভাবা ঠিক নয়। তবে ঋণখেলাপির ঝুঁকি অবশ্যই রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) কিছু ত্রুটি আছে। ফলে এতদিন ক্ষুদ্রঋণের বিপরীতে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেটি ঠিক হয়নি। এর ফলে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। এখন ঋণ আদায়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পটি গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- তৃণমূলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সংগঠিতকরণ, তাদের সঞ্চয়ে উৎসাহ দেয়া, সদস্য সঞ্চয়ের বিপরীতে সমপরিমাণ অর্থ বোনাস দেয়া, সদস্যদের প্রশিক্ষণ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় পুঁজি গঠনে সহায়তা এবং আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করাসহ বহুমুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা। এসব উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প’ হাতে নেয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ২০০১ সালে প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে প্রকল্পটি ফের চালু করা হয়। বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলায় ৪৮৫টি উপজেলায় ৪৫০৩টি ইউনিয়নের ৪০ হাজার ৫২৭টি ওয়ার্ডে প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান। ওয়ার্ডগুলোর প্রতিটি গ্রামে ৬০টি গরিব পরিবারের সমন্বয়ে একটি গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গঠনের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২৫ লাখ দরিদ্র পরিবার এ প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সরকার ৩ হাজার ১৩২ কোটি টাকা ব্যয় করছে।

সম্প্রতি প্রকল্পটি নিবিড় পরিবীক্ষণ করে আইএমইডির নিয়োগ করা হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টারের অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের নেতৃত্বে একটি সমীক্ষক দল। এতে প্রকল্পে যেসব ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ঋণখেলাপি বৃদ্ধি, প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কাজে ও কথায় অমিল, স্বেচ্ছাচারিতা, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তন, কর্মীদের স্থায়ীকরণ, সামাজিক বিরূপ প্রভাব, ঋণের মান বজায় না রাখা এবং ঐক্যের অভাব।

তারা শুধু ঝুঁকিই নয়, প্রকল্পে বেশ কিছু সমস্যাও খুঁজে পেয়েছেন। এগুলোর মধ্যে অল্প পরিমাণ ঋণই প্রধান সমস্যা। সদস্যদের এ ঋণ পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বাজেট ঘাটতি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কারণ। এছাড়া ঋণ গ্রহণ, ঋণের কিস্তি, সঞ্চয় জমার মেসেজ সময়মতো মুঠোফোনে না পাওয়াও একটি কারণ। ঋণ আবেদন করা হলে তা যাচাই-বাছাই করতে অনেক সময় লেগে যায়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় ঋণ অনুমোদনে স্বাক্ষর সঠিক সময়ে করেন না।

এছাড়া সেবা প্রদানে সদিচ্ছার অভাবও দেখা যায়। অন্য সমস্যাগুলো হচ্ছে- অপর্যাপ্ত জনবল, ইউনিয়ন পর্যায়ে অফিসের অভাব, অনুন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা, কর্মীদের জন্য অতিরিক্ত সম্মানী ভাতার ব্যবস্থা না থাকা, ঋণের অতিরিক্ত চাহিদা না মেটাতে পারলে সদস্যদের মধ্যে মনোমালিন্য, ঋণখেলাপিদের খারাপ ব্যবহার, কিছু সদস্যের সমিতি ভেঙে চলে যাওয়ার মনোভাব, অফিসের ট্যাব-ফটোকপি মেশিন দীর্ঘদিন অচল থাকা, প্রশিক্ষণের মান অনুন্নত, প্রকল্পের লেনদেন সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে করায় ধীরগতি।

জানতে চাইলে আইএমইডির ভারপ্রাপ্ত সচিব মফিজুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, অবশ্যই এসব দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে প্রকল্প নেয়ার উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে সবাই মিলে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের প্রকল্পের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানিয়েছি। চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ শিগগিরই জানানো হবে।

প্রতিবেদনে জেলাভিত্তিক প্রকল্পের দিক সম্পর্কে প্রকল্পের কর্মী, মাঠ গবেষক ও মুখ্য উত্তরদাতাদের মতামত তুলে ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে জেলায় ঋণের সঠিক ব্যবহার না হওয়া, অল্প পরিমাণ ঋণ, জনবলের ঘাটতি, ঋণের ক্ষেত্রে ধীরগতি, সঞ্চয়ের টাকা ব্যবহারের সুযোগ না থাকা, ঋণের সীমাবদ্ধতা, সচেতনতা ও তদারকির অভাব, টাকা হাতে না পাওয়া (ব্যক্তি সঞ্চয়ের বিপরীতে উৎসাহ বোনাস), ঋণ না পাওয়া, প্রশিক্ষণের অপ্রতুলতা, কর্মীদের স্বচ্ছতা বজায় না রাখা, সদস্যদের গুরুত্ব না দেয়া, উঠান বৈঠকে আসতে না চাওয়া। কর্মীদের টিএ/ডিএ না দেয়া, বাধ্যতামূলক শেয়ার ক্রয়, স্থানীয় এলিটদের প্রভাব, ঋণ ও সঞ্চয়ের মধ্যে সমন্বয় না থাকা, একতার অভাব, ঋণ পরিশোধে অনীহা, সঠিক সদস্য নির্বাচন না করা, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা না নেয়া, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অজ্ঞতাই প্রকল্পের অন্যতম দুর্বল দিক।

প্রতিবেদনের সুপারিশে নিয়মিত নিবিড় পরিবীক্ষণের মাধ্যমে দুর্বল সমিতিগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় এনে নির্দিষ্ট মাত্রায় সবল করার পরই কেবল তাদের ক্ষেত্রে এক্সিট প্ল্যান বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে। কেননা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের আওতায় চলে যাওয়ার পর তারা যেন মুখ থুবড়ে না পড়ে।

সূত্র জানায়, প্রথম পর্যায়ে প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ধরা হলেও পরে দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকল্পে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৬২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। প্রকল্পের শুরু থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ২১৬ কোটি ৪৬ লাখ ৫১ হাজার টাকা।


 


আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত