কেএম রায়হান কবীর, শরীয়তপুর    |    
প্রকাশ : ২৬ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০:০০ প্রিন্ট
শরীয়তপুরে ১৯ দিনে তিন শিশু শিক্ষার্থীসহ নিখোঁজ ৪
ভয়ে স্কুলে যাচ্ছে না শিশুরা অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন
এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে অপরাধ বাড়তে পারে * পুলিশ বলছে, বিচ্ছিন্ন ঘটনা
শরীয়তপুরে গেল ১৯ দিনে তিন শিশু শিক্ষার্থীসহ নিখোঁজ হয় চারজন। এর মধ্যে দুই শিশুর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকাসহ জেলার অন্যান্য এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আর একের পর এক নিখোঁজ ও লাশ উদ্ধারের ঘটনায় অভিভাবকরাও চরম উদ্বিগ্নে দিন কাটাচ্ছেন। ভয়ে শিশুরা এখন স্কুলে যেতে চাচ্ছে না বলে তারা জানান। বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকরাও বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, বর্তমানে স্কুলে শিক্ষার্থী উপস্থিতি কমে গেছে। এর জন্য তারা সাম্প্রতিক নিখোঁজ ও হত্যার বিষয়গুলোকে দায়ী করেন। শিক্ষক ও অভিভাবক- দুই পক্ষই অভিযোগ করেন, পুলিশের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় শিশু খুনের ঘটনা বেড়েই চলেছে।
মঙ্গলবার পর্যন্ত পুলিশ একটি খুনের আংশিক রহস্য উদ্ঘাটন করলেও বাকি তিনজনের নিখোঁজ এবং খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেও কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন অভিভাবকরা।
নিখোঁজদের পরিবার, স্থানীয় ব্যক্তি ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখীপুর থানাধীন ওহাব ঢালী কান্দিগ্রামের নান্নু খানের ছেলে ডিএমখালী ইউনিয়নের মোল্যাকান্দি নুরানি মাদ্রাসার ছাত্র সিয়াম মাহমুদ আরাফাত ১৯ দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছে। সে ৭ জুলাই বাড়ি থেকে মাদ্রাসায় যায়। এরপর তার কোনো খোঁজ মেলেনি। পরদিন সিয়ামের বাবা সখীপুর থানায় জিডি করেন। তবে এখনও তার ব্যাপারে কোনো রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি। ১৫ জুলাই সখীপুর সরদারকান্দি গ্রামের লেহাজ উদ্দিন শেখের মেয়ে সখীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী লিজা আকতার বাড়ির পার্শ্ববর্তী রাস্তায় সাইকেল চালাতে গিয়ে দিনের বেলায় নিখোঁজ হয়। অনেক খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে পরদিন তার চাচি নাছরিন আকতার সখীপুর থানায় জিডি করেন। তবে পুলিশ তার কোনো সন্ধান করতে ব্যর্থ হয়। ৮ দিন পর স্থানীয় লোকজন বাড়ি থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে ছৈয়ালকান্দি বিলে বুলবুল সরদারের পাটক্ষেতের পাশে ভাসমান অবস্থায় লিজার অর্ধগলিত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর তার পরিবারকে তারা খবর দেন। লিজার চাচি সেখানে গিয়ে জামা-কাপড় দেখে লাশ শনাক্ত করেন। এরপর পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক লিজার মরদেহে কিডনি, লিভারসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ পাননি বলে জানান। পরে অবশ্য এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা জানায়, তারা শুধু লিজাকে হত্যা করেছে। অঙ্গ বের করে নেয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি বলে তারা দাবি করে। ২৩ জুলাই লিজার মা-বাবার সন্দেহ অনুযায়ী প্রতিবেশী ফরিদ শেখ ও লিজার চাচাতো ভাই জাকির শেখকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা খুনের কথা স্বীকার করে। অথচ লিজা নিখোঁজের পর তার মা-বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নানা ধরনের হয়রানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর ওইদিন গভীর রাতে সখীপুর থানায় লিজা খুনের মামলা নেয়া হয়। লিজার খুন ও অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার দেখে এলাকায় ও স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সূত্র আরও জানায়, ২৩ জুলাই শরীয়তপুর সদর উপজেলার উত্তর ভাষানচর গ্রামের ইদ্রিস মাদবরের ছেলে দাদপুর নুতনহাট নোমানিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র ওসমান গনি মাদবর বাড়ি থেকে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে টিফিন কেরিয়ারে ভাত নিয়ে মাদ্রাসায় যায়। সেখানে ভাতের কেরিয়ার রেখে নুতনহাট বাজারে ঘুরতে যায় সে। এরপর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। দুর্বৃত্তরা তাকে চোখ নষ্ট করে ও গলা কেটে হত্যা করে। পরে তারা কীর্তিনাশা নদীর পাড়ে একটি আখক্ষেতে লাশ ফেলে যায়। পরদিন বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে স্থানীয় লোকজন ওসমানের গলাকাটা মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে অভিভাবক ও মাদ্রাসায় খবর দেন। পরে পালং মডেল থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। তবে দুই দিনেও কেউ গ্রেফতার হয়নি। মঙ্গলবার সকালে তার ময়নাতদন্ত শেষে ওসমানের লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। নিহতের বাবা বলেন, ‘আমার নিষ্পাপ শিশুসন্তানকে যারা হত্যা করেছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। যাতে আর কেউ কোনো শিশুকে নিখোঁজ বা খুন করতে সাহস না পায়।’ তবে পালং মডেল থানার উপপরিদশর্ক মো. আশরাফ দাবি করেন, ‘পূর্বশত্রুতার জেরে এ হত্যাকাণ্ড হতে পারে। রহস্য উদ্ঘাটন ও ঘাতকদের গ্রেফতারের জন্য চেষ্টা চলছে।’
এছাড়া ২৩ জুলাই আরেকটি ঘটনা ঘটে। এদিন সকালে নড়িয়া উপজেলার কাপাশপাড়া গ্রামের আয়নাল বেপারির স্ত্রী পারভিন আকতার ৩ সন্তানকে বাড়িতে রেখে উপজেলা সদরে যাওয়ার কথা বলে বের হন। এরপর তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে পারভিনের ভাই ধলু সরদার নড়িয়া থানায় জিডি করেন। তবে পুলিশ এখনও তার সন্ধান করতে পারেনি।
এদিকে নিখোঁজ ও হত্যার শিকার শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়সহ পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে বলে জানান শিক্ষক ও অভিভাবকরা। শিশুরা ভয়ে বিদ্যালয়ে যেতে চাচ্ছে না। তাদের আশঙ্কা, জরুরি ভিত্তিতে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকরী ব্যবস্থা না নিলে শিশুহত্যা-পাচারসহ শিশু অপহরণ বাড়তে পারে।
সখীপুরের এক ছাত্রের অভিভাবক ইকবাল খান বলেন, ‘একের পর এক বিদ্যালয়গামী শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন। আমাদের বাচ্চারা বিদ্যালয়ে যেতে এখন ভয় পায়। এ ব্যাপারে প্রশাসনের কঠোর হওয়া উচিত।’ সৈয়দপুর সদরের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. সোবহান ঢালী বলেন, ‘নিষ্পাপ শিশুদের হত্যার ব্যাপারে আমরা এখন খুবই শঙ্কিত। যারা এসব অপরাধে জড়িত, তাদের ফাঁসি চাই।’ সখীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মেসবাহ উদ্দিন বলেন, ‘লিজার নিখোঁজ ও মরদেহ উদ্ধারে আমাদের এলাকার বিদ্যালয়গুলোয় ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। উপস্থিতিও কমে গেছে। শিশুরা ভয়ে বিদ্যালয়ে আসতে চাচ্ছে না।’ মোহাম্মদিয়া নুরানি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনায় আমরা সবাই উদ্বিগ্ন। ছাত্ররা এখন ভয়ে স্কুলে আসতে চায় না। ফলে উপস্থিতি কমে গেছে।’ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আযাদ বলেন, ‘লিজা খুনের পর আমরা বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছি। যাতে শিশুরা নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করতে পারে। অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এহসান শাহ বলেন, ‘এর আগে সিয়াম নামে শিশুটি বাড়ি থেকে একাধিকবার পালিয়ে যায়। আশা করি, তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে। অন্য খুন বা নিখোঁজগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এ নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তাছাড়া নড়িয়ায় নারী নিখোঁজ, স্বামীর সঙ্গে অভিমান করে লুকিয়ে থাকার ঘটনা হতে পারে।’



আরো পড়ুন
  • শীর্ষ খবর
  • সর্বশেষ খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Design and Developed by

© ২০০০-২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত